শিক্ষকতা পৃথিবীর অন্যতম সম্মানজনক পেশা। এই পেশা শুধু জীবিকা নয়, একটি মহান দায়িত্ব। কারণ শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না, মানুষও গড়ে তোলেন। একজন শিক্ষকের হাত ধরেই গড়ে ওঠে একটি জাতির ভবিষ্যৎ।
প্রাচীনকাল থেকেই সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অনেক বেশি। দার্শনিক সক্রেটিস শিক্ষাকে মানবজীবনের আলোকবর্তিকা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষাকে মুক্ত চিন্তার পথ হিসেবে দেখেছেন। ড. মারিয়া মন্টেসরি শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। সবাই শিক্ষকের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
কিন্তু শিক্ষকতার বাস্তবতা অনেক কঠিন। বাইরে থেকে কাজটি সহজ মনে হলেও ভেতরের গল্প ভিন্ন। একটি শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন চলে নীরব সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম সবাই দেখতে পায় না। একজন শিক্ষককে একসঙ্গে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। একই কক্ষে থাকে ৫০-৭০ জন শিক্ষার্থী। সবার শেখার গতি এক নয়। সবার আচরণও এক রকম নয়। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ ধীরে বোঝে। কেউ আত্মবিশ্বাসী, আবার কেউ ভীত ও চুপচাপ। তাই একজন শিক্ষককে একই পাঠ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে হয়।
শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী হাওয়ার্ড গার্ডনার বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের শেখার ধরন আলাদা। তাঁর “মাল্টিপল ইনটেলিজেন্সেস থিওরি” বিশ্বজুড়ে আলোচিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাও ভিন্ন ভিন্ন। ফলে শিক্ষককে শুধু বিষয়জ্ঞান জানলেই হয় না, তাঁকে শিক্ষার্থীদের মনও বুঝতে হয়। শিক্ষকের কাজ শুধু বই পড়ানো নয়। অনেক সময় তাঁকে অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করতে হয়। কোনো শিক্ষার্থী পারিবারিক সমস্যায় ভেঙে পড়ে। কেউ মানসিক চাপে কাঁদে। কেউ নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। তখন শিক্ষকই হয়ে ওঠেন তার আশ্রয়।
ইউনেস্কোর ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে শিক্ষকতাকে “আবেগীয়ভাবে চাহিদাপূর্ণ পেশা” বলা হয়েছে। অর্থাৎ এটি অত্যন্ত আবেগনির্ভর ও মানসিক চাপপূর্ণ পেশা। কারণ শিক্ষককে প্রতিদিন অনেক মানসিক চাপ সামলাতে হয়। একজন শিক্ষককে পাঠ পরিকল্পনা করতে হয়, খাতা মূল্যায়ন করতে হয়, শ্রেণি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজ, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগও বজায় রাখতে হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই চাপ আরও বেশি। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। তবুও শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের আচরণেও পরিবর্তন এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে শিক্ষককে আরও সৃজনশীল হতে হচ্ছে। এখন শুধু বইয়ের ভাষায় পড়ালে হয় না। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরে রাখতে উদাহরণ, গল্প, প্রযুক্তি ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় করতে হয়।
তবুও একজন শিক্ষক ছোট ছোট অর্জনেই আনন্দ খুঁজে পান। কোনো দুর্বল শিক্ষার্থী ভালো করলে তিনি খুশি হন। কোনো হতাশ শিক্ষার্থী নতুন স্বপ্ন দেখলে তিনি অনুপ্রাণিত হন। এটাই একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমেরিকান শিক্ষাবিদ উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড বলেছেন, “মহান শিক্ষক সেই ব্যক্তি, যিনি অনুপ্রেরণা জাগান”।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনও শিক্ষক সম্মানের প্রতীক। অনেক শিক্ষার্থী জীবনের প্রথম স্বপ্ন দেখে শিক্ষকের কাছ থেকে। একজন শিক্ষক একটি পরিবারের ভাগ্যও বদলে দিতে পারেন। তাই শিক্ষককে শুধু চাকরিজীবী হিসেবে দেখলে হবে না; তাঁকে সমাজ নির্মাতা হিসেবেও মূল্যায়ন করতে হবে।
শিক্ষকতার প্রকৃত মূল্য বুঝতে হলে শ্রেণিকক্ষের ভেতরের বাস্তবতা জানতে হবে। একজন শিক্ষক প্রতিদিন নীরবে সংগ্রাম করেন। তিনি জ্ঞান দেন, সাহস দেন, স্বপ্ন দেখান। তাই শিক্ষককে বিচার করার আগে তাঁর আত্মত্যাগ ও মানবিক দায়িত্বকে সম্মান জানানো প্রয়োজন। কারণ একজন মহান শিক্ষকই পারেন একটি জাতির ভবিষ্যৎ আলোকিত করতে।
ফয়সল আহমদ বাবুল
এমপিএইচ, এমডিএস, এমএড
লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট
আপনার মতামত লিখুন :