
একটি শহর শুধু ইট-পাথরের সমষ্টি নয়। একটি শহর মানুষের মনন, রুচি ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। সুউচ্চ অট্টালিকা, প্রশস্ত সড়ক কিংবা দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা একটি শহরকে সুন্দর করে। কিন্তু প্রকৃত সৌন্দর্য গড়ে ওঠে নাগরিকদের আচরণে।
আমাদের সমাজে একটি অসুন্দর অভ্যাস নীরবে বিস্তার লাভ করছে। প্রতিদিনই তার লালচে দাগ পড়ে জনজীবনের বুকে। বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে, বিশেষ করে সিলেটসহ বিভিন্ন শহরে পান-সুপারি ও জর্দার পিক জনপরিসরের সৌন্দর্যকে ক্ষতবিক্ষত করছে। সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় একে বলা হয় “গুয়ার পিক”। অন্যত্র বলা হয় পানের পিক বা পান-সুপারির পিক। ইংরেজিতে এর নাম Betel nut spit।
সদ্য রং করা দেয়াল, রাস্তার ডিভাইডার, ফুটপাত, সিঁড়ি, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা সরকারি স্থাপনা মুহূর্তেই হারায় তাদের সৌন্দর্য। সাদা দেয়ালের বুকে লাল দাগ যেন পরিচ্ছন্নতার মুখে এক বেদনাদায়ক আঁচড়। বাজারের প্রবেশপথ থেকে জনসমাগমস্থল, কোথাও যেন রেহাই নেই। মানুষের অসচেতনতা নীরবে আঘাত হানে সৌন্দর্য, রুচিবোধ ও নাগরিক সংস্কৃতিতে। নাম ভিন্ন হলেও এর প্রভাব একই। এটি শুধু দেয়াল নোংরা করে না, কলঙ্কিত করে সভ্যতার। মানুষের অসচেতনতার এই অভ্যাস জনপরিসরকে কলুষিত করে এবং একটি সভ্য সমাজের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এ অসচেতনতা সৌন্দর্যের ওপর নির্মম আঘাত হানে।
প্রকৃতি সৌন্দর্য ভালোবাসে। মানুষও সৌন্দর্য ভালোবাসে। কিন্তু সেই মানুষই আবার নিজের হাতে সৌন্দর্য নষ্ট করে। এটি এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।
পান-সুপারি খাওয়া আমাদের অঞ্চলের একটি পুরোনো সংস্কৃতি। অনেকের কাছে এটি আতিথেয়তারও অংশ। কিন্তু সংস্কৃতি কখনো অসভ্যতার নাম হতে পারে না। ব্যক্তিগত অভ্যাস যখন জনস্বার্থের ক্ষতি করে, তখন তা সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়।
জনসমক্ষে পিক ফেলা শুধু সৌন্দর্যহানির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্যও। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন। পান, জর্দা, গুল ও সুপারি মুখগহ্বরের নানা রোগের কারণ হতে পারে। মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাছাড়া থুতু ও পিকের মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনসমক্ষে থুতু ফেলা নিরুৎসাহিত করা হয়। অনেক দেশে এ জন্য জরিমানার ব্যবস্থাও রয়েছে। কারণ জনপরিসর সবার। সেখানে একজনের অসচেতনতা অন্যের জন্য অসুবিধা তৈরি করে।
ভারতের বিভিন্ন শহরে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, পান-জর্দার পিক পরিষ্কার করতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। রেলস্টেশন, সরকারি ভবন ও জনসমাগমস্থল পরিষ্কার রাখতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করতে হয়। বাংলাদেশের অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত ব্যয় করতে হয়। এই অর্থ উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা যেত।
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটননগরী। হযরত শাহজালাল (র:) ও শাহপরান (র:) স্মৃতিধন্য আধ্যাত্মিক অঞ্চল। এ আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, চা-বাগান, পাহাড়, নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এর খ্যাতি দেশজুড়ে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক এখানে আসেন। কিন্তু শহরের অনেক দেয়াল, ডিভাইডার ও জনপরিসরে পান-সুপারির লাল পিকের দাগ চোখে পড়ে। এই দৃশ্য সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একটি পরিচ্ছন্ন শহর যেমন পর্যটকের মন জয় করে, তেমনি নোংরা পরিবেশ নেতিবাচক বার্তা দেয়। লাল পিকের দাগ শুধু দেয়ালকে নয়, একটি শহরের ভাবমূর্তিকেও কলঙ্কিত করে। ফলে সিলেটের মতো সৌন্দর্যমণ্ডিত জনপদের মর্যাদা ও আকর্ষণ অনেকাংশে ম্লান হয়ে
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, জনসম্পদের প্রতি দায়িত্ববোধের অভাব এ সমস্যার অন্যতম কারণ। নিজের ঘরের দেয়ালে কেউ পিক ফেলেন না। কিন্তু রাস্তার দেয়ালকে নিজের সম্পদ মনে করেন না বলেই সেখানে নির্বিকারভাবে পিক ফেলেন। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি।
আমরা প্রায়ই পরিচ্ছন্ন শহর চাই। উন্নত নাগরিক সুবিধা চাই। সুন্দর পরিবেশ চাই। কিন্তু নিজের দায়িত্বের জায়গায় অনেক সময় উদাসীন থাকি। সরকারকে দোষ দেওয়া সহজ। নিজের আচরণ পরিবর্তন করা কঠিন। অথচ পরিবর্তনের শুরুটা হওয়া উচিত নিজের কাছ থেকেই।
কবি জীবনানন্দ দাস বাংলার প্রকৃতিকে দেখেছিলেন রূপসী বাংলার স্বপ্নময় রূপে আর রবি ঠাকুর কল্পনা করেছিলেন আলোকিত, মানবিক ও সৌন্দর্যবোধসম্পন্ন একটি সমাজ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম শর্ত পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ। জনপদের দেয়াল, রাস্তা ও জনপরিসর যখন পান-সুপারির পিকে কলঙ্কিত হয়, তখন ক্ষতবিক্ষত হয় আমাদের সংস্কৃতি ও রুচি। যেন আল মাহমুদের ভাষায়, লাল পিকের দাগে আহত হয় জনপদের সৌন্দর্য। জাতীয় কবি কাজী নজরুল আমাদের আহ্বান জানান অসভ্য অভ্যাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে আর পল্লীকবি জসীমউদ্দিন স্মরণ করিয়ে দেন, দেশের পথঘাটও আমাদের আপন উঠান। তাই মায়ের মাটিকে অপমান নয়, ভালোবাসা ও যত্নে আগলে রাখা আমাদের কর্তব্য।
সচেতনতা সবচেয়ে বড় শক্তি এইসব সমস্যা সমাধানে । পরিবার থেকে শিক্ষা শুরু হতে পারে। বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে পাঠ বাড়ানো যেতে পারে। গণমাধ্যম ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সামাজিক সংগঠনগুলোও জনসচেতনতা গড়ে তুলতে পারে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগও জরুরি।
মনে রাখতে হবে, রাস্তা শুধু সরকারের নয়। দেয়াল শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়। পার্ক শুধু প্রশাসনের নয়। এগুলো আমাদের সবার। এগুলোর সৌন্দর্য রক্ষা করাও আমাদের সবার দায়িত্ব।
একটি ছোট্ট সচেতনতা অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একটি পিক যথাস্থানে ফেললে একটি দেয়াল বাঁচে। একটি দেয়াল বাঁচলে একটি রাস্তা সুন্দর থাকে। একটি রাস্তা সুন্দর থাকলে একটি শহর পরিচ্ছন্ন হয়। আর পরিচ্ছন্ন শহরই সভ্য জাতির পরিচয় বহন করে।
সভ্যতা শুরু হয় ব্যক্তির আচরণ থেকে। তাই আসুন, গুয়ার পিকের সংস্কৃতি নয়, পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি গড়ে তুলি। নিজেদের অভ্যাস বদলাই। জনপরিসরকে সম্মান করি। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করি।
লেখক: এমপিএইচ, এমডিএস, এমএড
এডুকেটর, পাবলিক হেলথ স্পেশালিষ্ট, কলামিস্ট
আপনার মতামত লিখুন :