
একটি শিশু পৃথিবীতে আসে নিষ্পাপ মন নিয়ে। ধীরে ধীরে পরিবারই তাকে মানুষ হয়ে ওঠার পাঠ শেখায়। মা-বাবার হাত ধরেই তার প্রথম শেখা শুরু হয়। পরিবারই তার প্রথম বিদ্যালয়। সেখান থেকেই সে শেখে ভাষা, আচরণ, মূল্যবোধ ও মানবিকতা। সময় বদলেছে। বদলেছে সন্তান প্রতিপালনের ধরনও। একসময় সমাজে কঠোর শাসনকে ভালো মানুষ গড়ার প্রধান উপায় মনে করা হতো।
“মাংস আপনার, হাড় আমার” ধরনের কথাগুলো ছিল সেই সময়ের বাস্তবতার প্রতিধ্বনি। শিক্ষক ও অভিভাবকের কঠোরতাকে তখন দায়িত্ববোধ তৈরির অংশ হিসেবে দেখা হতো। সেই প্রজন্ম শিখেছিল শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও সহনশীলতা। কিন্তু কঠোরতার সেই দেয়ালের আড়ালে অনেক না বলা কষ্টও জমে ছিল। অনেকেই হারিয়েছে নিজের মত প্রকাশের সাহস। কারও মনে জন্ম নিয়েছে ভয়। আবার কেউ হারিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বস্তি।
আজকের পৃথিবীতে আমরা দুই ধরনের চরম বাস্তবতা দেখছি। একদিকে আছে অতিরিক্ত কঠোরতা। সেখানে সন্তানকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। শাসনের নামে চাপ সৃষ্টি করা হয়। অন্যদিকে আছে অতিরিক্ত প্রশ্রয়। সন্তানের সব চাওয়াকে অধিকার হিসেবে ধরা হয়। ভুল করলেও বাধা দেওয়া হয় না। ফলে দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে না। এই দুই চরম অবস্থার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনেক শিশু-কিশোর দিকনির্দেশনাহীন হয়ে পড়ছে। তারা না পাচ্ছে সঠিক শাসন, না পাচ্ছে প্রয়োজনীয় মানবিক দিকনির্দেশনা।
মনোবিজ্ঞানী ডায়ানা বাউমরিন্ড সন্তান প্রতিপালনের চারটি ধরণ ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং বা ভারসাম্যপূর্ণ অভিভাবকত্বকে সবচেয়ে কার্যকর বলা হয়। এই পদ্ধতিতে ভালোবাসা থাকে। থাকে স্পষ্ট নিয়ম ও যুক্তিনির্ভর শাসন। সন্তানের মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল হয়। তারা সামাজিকভাবেও বেশি দক্ষ হয়ে ওঠে। বিপরীতে অতিরিক্ত কঠোর পরিবারে বড় হওয়া শিশুরা অনেক সময় ভীত, আত্মবিশ্বাসহীন কিংবা বিদ্রোহী হয়ে পড়ে। আবার অতিরিক্ত ছাড় পেলে শিশুরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ববোধ শেখে না।
২০২৩ সালে অ্যামেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর এক প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, বারবার অপমান বা চিৎকার শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শারীরিক শাস্তিও শিশুর মস্তিষ্কের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করতে পারে। এতে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ে। আক্রমণাত্মক আচরণের প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে ইতিবাচক যোগাযোগ শিশুর মানসিক স্থিতি উন্নত করে। সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণ তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সীমিত কিন্তু দৃঢ় শাসন শিশুকে দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এই সংকট আরও গভীর। আমাদের সমাজে এখনও অনেকেই মনে করেন, বেশি আদর করলে সন্তান নষ্ট হয়। আবার অনেক পরিবার সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেয় না। ভালোবাসার পরিবর্তে বস্তুগত সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিশুরা প্রযুক্তিনির্ভর এক নিঃসঙ্গ জগতে প্রবেশ করছে। পরিবারে একসঙ্গে বসে গল্প করার সংস্কৃতি কমে যাচ্ছে। বই পড়ার অভ্যাসও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় বাড়ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। এতে শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা সম্পর্কে বলেছিলেন, মানুষকে শুধু তথ্য দিলে মানুষ হয় না, তাকে মানবিক করে তুলতে হয়। এই মানবিকতা প্রথম গড়ে ওঠে পরিবারে। সন্তান তার বাবা-মায়ের আচরণ দেখেই শেখে। সে শেখে কিভাবে কথা বলতে হয়। শেখে কিভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। অন্যকে সম্মান করার শিক্ষাও পরিবার থেকেই আসে। তাই সন্তান গঠনের সবচেয়ে বড় উপকরণ শুধু শাসন নয়। অভিভাবকের নিজস্ব চরিত্র, আচরণ ও মূল্যবোধও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফ ইতিবাচক অভিভাবকত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের মতে, শিশুকে ভয় দেখিয়ে নয়, বোঝানোর মাধ্যমে দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে। সন্তানের ভুল হলে তাকে অপমান করা উচিত নয়। বরং ভুলের কারণ বুঝিয়ে বলতে হবে। একই সঙ্গে তাকে শৃঙ্খলার সীমারেখাও শেখাতে হবে। কারণ সীমাহীন স্বাধীনতা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতিরিক্ত কঠোর পরিবেশও শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বর্তমান সময়ে সন্তান প্রতিপালন আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল সংস্কৃতি শিশুদের মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলছে। দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনধারাও তাদের চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তন করছে। তাই এখন প্রয়োজন সচেতন ও সময়োপযোগী অভিভাবকত্ব। সন্তান কী খাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে বা কী পড়ছে, তা জানার পাশাপাশি তার মানসিক অবস্থাও বোঝা জরুরি। সে কী ভাবছে, কী অনুভব করছে, সেটাও গুরুত্ব দিয়ে জানা প্রয়োজন।
একটি ভালো প্রজন্ম শুধু বিদ্যালয়ে তৈরি হয় না। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে পরিবারের ভেতরে। মা-বাবার ভাষা ও আচরণ শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাদের মূল্যবোধ ও সময় দেওয়ার সংস্কৃতিও শিশুর চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য প্রস্তুত করলেই যথেষ্ট নয়। তাকে মানবিক, দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।
আজ সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু মানবিক মানুষের সংখ্যা কি একইভাবে বাড়ছে? প্রযুক্তিতে উন্নতি হচ্ছে দ্রুতগতিতে। তবে পারিবারিক বন্ধন কি আগের মতো শক্তিশালী থাকছে? এই প্রশ্নগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। পরিবার ও অভিভাবকত্বের ধরন নিয়েও এখন গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।
সন্তান প্রতিপালনে অন্ধ কঠোরতা যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি অযৌক্তিক প্রশ্রয়ও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়। পাশাপাশি মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার চর্চাও জরুরি। কারণ একটি ভালো প্রজন্ম জন্মগতভাবে তৈরি হয় না। সচেতন পরিবার, মানবিক শিক্ষা এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই একটি শিশুকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়।
লেখক: এমপিএইচ, এমডিএস, এমএড
শিক্ষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট
আপনার মতামত লিখুন :