
জীবনের ব্যস্ত পথচলায় হঠাৎ কিছু দিন এসে মনকে অন্যরকম আলোয় ভরিয়ে দেয়। কিছু মুহূর্ত থাকে, যা শুধু দেখা নয়, অনুভব করার। লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (লেইস) প্রকল্পের ৪২ দিনব্যাপী বিষয়ভিত্তিক পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষণার্থীদের শিক্ষা সফর ছিল তেমনই এক আনন্দময় ও হৃদয়ছোঁয়া আয়োজন। গত ১৮ জুন সিলেট সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের উদ্যোগে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি বিষয়ের ১২০ জন প্রশিক্ষণার্থী যাত্রা করেন মৌলভীবাজারের মনোরম রাঙ্গাউটি রিসোর্টের উদ্দেশ্যে। বর্ষার স্নিগ্ধ সকাল, বৃষ্টিভেজা পথ, সহযাত্রীদের প্রাণখোলা হাসি আর সবুজ প্রকৃতির মায়াবী সৌন্দর্য মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। এটি শুধু একটি শিক্ষা সফর ছিল না। এটি ছিল ক্লান্ত মনকে নতুন শক্তিতে জাগিয়ে তোলার এক শান্ত ও সুন্দর প্রস্তুতি। এখানে ছিল হৃদয়ের উষ্ণতা, সহযাত্রীদের আন্তরিকতা আর আনন্দের অবাধ প্রবাহ। প্রতিটি মুহূর্ত ছুঁয়ে গেছে অনুভূতিকে। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা মিশে গিয়েছিল সবার মনে। সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠেছিল এক স্মরণীয়, প্রাণবন্ত ও আনন্দের রঙে আঁকা এক উজ্জ্বল স্মৃতির দিন।
মৌলভীবাজারের মনু নদীর সুইচগেইট সংলগ্ন ইউ-আকৃতির লেকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে রাঙ্গাউটি রিসোর্ট। যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত জলরঙের ছবি। চারদিকে সবুজ বৃক্ষরাজি, নীরব জলরাশি আর শীতল বাতাস। মন মুহূর্তেই ভরে ওঠে প্রশান্তিতে। ভাসমান ঘর, সুইমিং পুল, নৌকা ভ্রমণ আর গেমিং জোন রিসোর্টটিকে দিয়েছে আধুনিক আকর্ষণ। আলো-আঁধারির মনোরম সাজও চোখে লাগে। তবে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে প্রকৃতির শান্ত, নিঃশব্দ সৌন্দর্য। যা হৃদয়ে গেঁথে যায় এক নীরব শান্তির অনুভূতি হয়ে।
বর্ষার সকাল। আকাশজুড়ে ধূসর মেঘের নরম আবরণ। বাতাসে ভেজা মাটির স্নিগ্ধ গন্ধ আর এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ভোর থেকেই সিলেট সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণের উচ্ছ্বাস। প্রশিক্ষণার্থীদের মুখে ছিল আনন্দের দীপ্তি। সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যেই শেষ হয় নাস্তা। তারপর শুরু হয় যাত্রার প্রস্তুতি। সকাল আটটার মধ্যেই সবাই উঠে বসেন শীতল নামের চারটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে। হৃদয়ে তখন নতুন পথের আহ্বান। ঠিক নয়টায় আনন্দভরা গাড়িবহর ছেড়ে দেয় ক্যাম্পাস। শুরু হয় স্মৃতি, সৌন্দর্য আর অনুভূতিতে ভরা এক মায়াময় অভিযাত্রা।
দিনটি ছিল রঙিন ও প্রাণবন্ত আবহে। আকাশে ছিল উচ্ছ্বাসের ছোঁয়া। চারদিকে ছড়িয়ে ছিল আনন্দের মৃদু উচ্ছ্বাস। পুরুষদের আকাশী শার্ট, নীল টাই ও কালো প্যান্টে ছিল শৃঙ্খলার ছাপ। নারীদের বেগুনি জর্জেট ও মনিপুরী শাড়িতে ফুটে উঠেছিল সৌন্দর্যের কোমল রূপ। গলায় পরিচয়পত্র, মাথায় সাদা ক্যাপ মিলিয়ে পুরো পরিবেশ ছিল রঙিন, সুশৃঙ্খল ও প্রাণময়। সবাই যেন একদল স্বপ্নবাহী শিক্ষক একসঙ্গে যাত্রা করছেন জ্ঞান, সৌন্দর্য ও আনন্দের খোঁজে। মুখে হাসি, চোখে উদ্দীপনা আর হৃদয়ে আশার আলো। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে শৃঙ্খলা ও সৌহার্দ্যের উষ্ণ আবেশ। আনন্দের স্পন্দনে মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে হৃদয়ছোঁয়া ও স্মরণীয়। প্রকৃতিও যেন সেদিন তাদের সঙ্গে মিলেমিশে এই পথচলার সৌন্দর্য উপভোগ করছিল।
বাস চলতে শুরু করতেই আকাশজুড়ে নেমে আসে বর্ষার ধারা। কখনো মৃদু টুপটাপ, কখনো ঝরঝর শব্দে বৃষ্টি নামতে থাকে চারপাশে। জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা যেন পথের সৌন্দর্যকে আরও গভীর করে তুলছিল। দূরের সবুজ পাহাড়, চা-বাগানের সারি, বর্ষাধৌত বৃক্ষরাজি আর বৃষ্টির ছন্দ মিলেমিশে এক অপার্থিব দৃশ্যের জন্ম দেয়। বাসের ভেতরে তখন গান, গল্প, হাসি আর স্মৃতিবন্দি করার ব্যস্ততা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউবা নীরবে উপভোগ করছিলেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। । মনে হচ্ছে তখনই, ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি যেন ধীরে ধীরে বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাচ্ছে।
সকাল দশটার দিকে সিলেট-মৌলভীবাজার সড়কের মুন্সিবাজার এলাকায় বাস থামে। বাইরে তখন টুপটাপ বৃষ্টি ঝরছে। চারপাশ ভেজা প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় ভরে ওঠে। সেই বৃষ্টিভেজা পরিবেশে সহযাত্রী ফেরদৌস, তারেক, হাবিব সহ অনেকের পরিবেশনে হালকা নাস্তার স্বাদ যেন অন্যরকম অনুভূতি এনে দেয়। সহযাত্রীদের হাসি, আড্ডা আর প্রাণখোলা গল্পে মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। পথের ক্লান্তি ধীরে ধীরে আনন্দে রূপ নেয়। বৃষ্টির ছন্দ আর মানুষের উচ্ছ্বাস মিলেমিশে তৈরি করে এক মায়াবী পরিবেশ। প্রায় ২৫ মিনিটের এই বিরতির পর আবার শুরু হয় যাত্রা, নতুন উদ্দীপনা আর আনন্দের আবেশ নিয়ে।

দুপুর ১১টা ২০ মিনিটে গাড়িবহর পৌঁছে যায় রাঙ্গাউটি রিসোর্টে। গাড়ি থামতেই আকাশ হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। মুহূর্তেই নেমে আসে বর্ষণ। সবাই দ্রুত নেমে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটে যান। কেউ কটেজের বারান্দায় আশ্রয় নেন। কেউ ছাতা হাতে দ্রুত রুমে প্রবেশ করেন। চারদিকে তখন শুধু বৃষ্টির ঝরঝর শব্দ আর শীতল ভেজা বাতাসের ছোঁয়া। পুরুষ ও মহিলা প্রশিক্ষণার্থীরা আলাদা কক্ষে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করেন। কেউ কেউ শিক্ষাসফরের টি-শার্ট পরেছিলেন। টি-শার্টটি ছিল বর্ণিল ও দৃষ্টিনন্দন। হালকা জলপাই রঙে ছিল এক কোমল শোভা। যেন প্রকৃতির সরলতার ভেতর লুকিয়ে থাকা এক নীরব সৌন্দর্যের প্রকাশ। বাইরে তখন অবিরাম বর্ষণ। কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবাই নীরবে উপভোগ করছিলেন সেই অপার সৌন্দর্য। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় যেন লুকিয়ে ছিল প্রকৃতির কোমল আহবান। মনে হয় যেন, প্রকৃতি যেন অতিথিদের আপন করে স্বাগত জানাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে গেলে চারদিকে নেমে আসে এক গভীর শান্তি ও নির্মল প্রশান্তি। শুরু হয় আনন্দঘন ঘোরাঘুরি। কেউ লেকের ধারে ধীরে ধীরে হাঁটছেন। কেউ দলবেঁধে ছবি তুলছেন। প্রশিক্ষকদের সঙ্গে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিভাগের প্রশিক্ষণার্থীরা স্মৃতিগুলো ধরে রাখছেন ক্যামেরার ফ্রেমে। কেউ একা নিঃশব্দে ছবি তুলছেন, কেউ কেউ হাসি-আড্ডায় মেতে উঠেছেন। সুইমিংপুলে অনেকে সাঁতার কাটছেন। কোথাও ভেসে আসছে গানের সুর, আবার কেউ নির্জনে বসে প্রকৃতির নীরব ভাষা অনুভব করছেন। দীর্ঘ প্রশিক্ষণের ক্লান্তি ও মানসিক চাপ যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য ছিল মহিলা সহযাত্রীদের সঙ্গে আসা ছোট ছোট সোনামনিদের উপস্থিতি। তাদের শিশুসুলভ হাসি আর উচ্ছ্বাসে পুরো পরিবেশ হয়ে উঠেছিল আরও প্রাণবন্ত। কেউ সাইকেল চালিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছে। কেউ ছোট ছোট রাইডে চড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। আবার কেউ বৃষ্টিতে ভিজে দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত। তাদের এই সরল আনন্দ যেন প্রকৃতির সঙ্গে মিশে এক অপূর্ব সৌন্দর্য তৈরি করেছিল। রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়েছিল নিষ্পাপ হাসি, নির্মল উচ্ছ্বাস আর হৃদয়ছোঁয়া মায়াবী আবহ।
দুপুর ১টা ১০ মিনিটে জোহরের নামাজ আদায়ের পর শুরু হয় মধ্যাহ্নভোজ। সাদা ভাত, রুই মাছ ভাজা, চিকেন জাল ফ্রাই, শুঁটকি, ডাল আর ফিরনিসহ বাহারি আয়োজনে খাবারের টেবিল হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। বর্ষার স্নিগ্ধ পরিবেশে সেই খাবারের স্বাদ যেন হৃদয়েও ছড়িয়ে পড়ে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মাঝেও আনন্দ থেমে থাকেনি। কেউ লেকের পাড়ে হেঁটেছেন। কেউ ট্রলারে চড়ে লেক প্রদক্ষিণ করেছেন। তবে আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগেই ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে তিনটায় চা-নাস্তা শেষে সবাই গাড়িতে উঠে বসেন। বিকেল চারটায় শুরু হয় ফেরার যাত্রা। কেউ কেউ পথেই নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে নেমে যান। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে গাড়িবহর পৌঁছে যায় টিটিসি ক্যাম্পাসে, সঙ্গে নিয়ে একদিনের অগণিত রঙিন স্মৃতি।
এই সফরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিজ্ঞানের কোর্স সমন্বয়ক ও কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ খছরু মাহমুদ, ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান রনি এবং প্রভাষক আলী হোসেন। তাঁদের আন্তরিকতা, নেতৃত্ব ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা সফরটিকে আরও প্রাণবন্ত ও সফল করে তোলে। বিজ্ঞান বিষয়ের প্রশিক্ষণার্থী তারেক আহমদ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করেন। বিজ্ঞানের ফেরদৌস আলম, ইংরেজির নজরুল এবং গণিতের সাইফুল নাস্তা ও যানবাহনের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। সকল সহযাত্রীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল।
লেইস প্রকল্পের এই শিক্ষা সফর ছিল অনুভূতি, সৌন্দর্য, জ্ঞান ও আনন্দের এক অপূর্ব মিলন। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল প্রাণবন্ত। প্রতিটি দৃশ্য ছিল হৃদয়ছোঁয়া। এটি কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না। এটি ছিল হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ তৈরির এক স্মরণীয় আয়োজন। সহযাত্রীদের মাঝে গড়ে ওঠে আন্তরিক বন্ধন। তৈরি হয় সৌহার্দ্যের এক মধুর পরিবেশ। বর্ষার বৃষ্টিভেজা সকাল সফরকে করে তুলেছিল আরও মায়াময়। রাঙ্গাউটির সবুজ প্রকৃতি মন ভরিয়ে দেয় প্রশান্তিতে। চারদিকে ছিল উচ্ছ্বাস আর হাসির ধ্বনি। এই সফরের প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে। সময় এগিয়ে যাবে। কিন্তু এই রঙিন অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণার্থীদের হৃদয়ে থেকে যাবে চিরসজীব হয়ে।
লেখকঃ শিক্ষক, কলামিস্ট ও প্রশিক্ষণার্থী- বিজ্ঞান সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সদর, সিলেট।
আপনার মতামত লিখুন :