ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন ২০২৬: সম্ভাবনা বনাম নীতির সংকট : ফয়সল আহমদ বাবুল


sylnews24 প্রকাশের সময় : মে ২০, ২০২৬, ৪:২৬ অপরাহ্ন /
ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন ২০২৬: সম্ভাবনা বনাম নীতির সংকট : ফয়সল আহমদ বাবুল

বাংলার চিকিৎসা ঐতিহ্য বহু পুরোনো। এটি শুধু হাসপাতাল বা আধুনিক যন্ত্রের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শেকড়ের গন্ধ, ভেষজ পাতার নির্যাস, হাকিমের দাওয়াখানা এবং কবিরাজের প্রজন্মান্তরের অভিজ্ঞতা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। গ্রামীণ জনপদে এখনও অনেক মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য এসব পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। কম খরচ, সহজলভ্যতা ও প্রাকৃতিক উপাদান এই চিকিৎসাব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করেছে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর ঘোষিত ঐতিহাসিক ১৯ দফার ১০ নম্বর দফায় সাধারণ মানুষের জন্য ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ছিল। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাঁর শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ বোর্ড অব ইউনানী অ্যান্ড আয়ুর্বেদিক সিস্টেমস অব মেডিসিন। এর মাধ্যমে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণের পথ সুগম হয়। পাশাপাশি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক শিক্ষা ও গবেষণার প্রসার ঘটে এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় এসব চিকিৎসাপদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে দেশীয় ভেষজ চিকিৎসা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন ২০২৬ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দীর্ঘদিনের পুরোনো আইনি কাঠামো পরিবর্তন করে নতুন প্রজন্মের চিকিৎসা শিক্ষা, নিবন্ধন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা এতে স্পষ্ট। কিন্তু আইনটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, এর ভেতরে যেমন সম্ভাবনার আলো রয়েছে, তেমনি কিছু নীতিগত অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে বড় ধরনের জটিলতার কারণও হতে পারে।

নতুন আইনে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষার জন্য পৃথক কাউন্সিল, নিবন্ধনব্যবস্থা, তহবিল গঠন, আর্থিক নিরীক্ষা এবং শিক্ষা প্রশাসনের নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আরও শক্তিশালীভাবে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই খাতের চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের যে প্রাতিষ্ঠানিক সংকট ছিল, নতুন আইন সেটি আংশিকভাবে দূর করার পথ তৈরি করেছে।

তবে আইনের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো স্কোপ অব প্র্যাকটিস বা চিকিৎসকদের কার্যপরিধি। একজন ইউনানী বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক বাস্তবে কোন পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা দিতে পারবেন, কোন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করতে পারবেন কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে আধুনিক চিকিৎসা প্রয়োগের সুযোগ থাকবে কি না, এসব বিষয়ে আইনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ফলে চিকিৎসক, প্রশাসন এবং রোগী, তিন পক্ষের মধ্যেই বিভ্রান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এখানেই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের প্রশ্নটি সামনে আসে। বিএমডিসি মূলত আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার চিকিৎসকদের নিবন্ধন ও পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করে। আধুনিক চিকিৎসা প্রদান ও প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিএমডিসি আইনে নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে। কিন্তু ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন সেই সীমারেখার সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করবে, তা পরিষ্কার নয়।

বাস্তবতা হলো ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক শিক্ষার্থীরা বর্তমানে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, প্যাথলজি, ফার্মাকোলজি ও বায়োকেমিস্ট্রির মতো আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয় অধ্যয়ন করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক বা জরুরি চিকিৎসায় সীমিত আধুনিক ওষুধ প্রয়োগের প্রয়োজনও দেখা দেয়। কিন্তু আইনটি এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা না দেওয়ায় চিকিৎসকেরা আইনি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন। একইসঙ্গে রোগীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ধরনের সমস্যার সমাধানে সমন্বিত স্বাস্থ্যনীতি গ্রহণ করেছে। ভারতের আয়ুষ মন্ত্রণালয় এবং এনসিআইএসএম বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য পৃথক কার্যপরিধি নির্ধারণ করেছে। কোন চিকিৎসক কতটুকু আধুনিক চিকিৎসা প্রয়োগ করতে পারবেন, কোন রোগীকে কখন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে হবে, সে বিষয়েও সেখানে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। ফলে পেশাগত দ্বন্দ্ব তুলনামূলক কম এবং রোগীর নিরাপত্তাও অধিকতর নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশে সেই সমন্বিত নীতির অভাব এই খছড়া আইনটিতে স্পষ্ট। স্বাস্থ্যখাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে। চিকিৎসাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনরক্ষা ও নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, পেশাগত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা নয়।

আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কোনো ভেষজ ওষুধ কার্যকর কি না, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কতটুকু, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সেটি গ্রহণযোগ্য কি না, এসব বিষয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। কিন্তু নতুন আইনে আধুনিক গবেষণাগার, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণার বাধ্যতামূলক কাঠামো স্পষ্ট নয়। ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে এই চিকিৎসাব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো কঠিন হতে পারে।

চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দেশে অনেক বেসরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক কলেজ থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, হাসপাতাল সুবিধা কিংবা মানসম্মত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ নেই। দক্ষ চিকিৎসক তৈরির জন্য শুধু সনদ প্রদান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা। কিন্তু আইনটিতে এই তদারকি কাঠামো আরও শক্তিশালীভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল।

একইসঙ্গে কর্মসংস্থানের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রতিবছর বহু ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক স্নাতক সম্পন্ন করলেও সরকারি স্বাস্থ্যখাতে তাদের জন্য পর্যাপ্ত পদ নেই। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা বিকল্প চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাদের সম্পৃক্ত করার বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা জরুরি। অন্যথায় শিক্ষিত চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ কর্মহীনতার সংকটে পড়বেন।

আইনের আরেকটি সমালোচিত দিক হলো অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ। কাউন্সিলের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ রাখার ফলে এর স্বাধীনতা ও পেশাগত স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একটি পেশাভিত্তিক কাউন্সিলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন।

তবে সব সমালোচনার মধ্যেও একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, এই আইন ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। এটি বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি বড় পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী সংশোধন, সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণ এবং আধুনিক স্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে বাস্তবসম্মত সমন্বয়। কারণ স্বাস্থ্যসেবা কোনো একক চিকিৎসাব্যবস্থার একচ্ছত্র ক্ষেত্র নয়। মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও আস্থাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমন্বিত, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক স্বাস্থ্যনীতিই পারে বাংলাদেশে একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলতে।

লেখকঃ এমপিএইচ, এমডিএস, এমএড, ডিএএমএস, ডিএইচএমএস
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
সভাপতি, বাংলাদেশ আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল এসোসিয়েশন, সিলেট বিভাগীয় শাখা