
একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা, আর সেই মেরুদণ্ডকে সোজা করে রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করেন শিক্ষক। শিক্ষক কেবল তথ্য বা জ্ঞান বিতরণ করেন না, বরং একটি আদর্শ ও মানবিক সমাজ গঠনের বীজ বপন করেন। প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষককে বলা হয় ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। তবে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি রূঢ় সত্য বারবার সামনে আসছে। যেখানে শিক্ষক অপমানিত, সেখানে শিক্ষা মৃত। আর যেখানে শিক্ষা মৃত, সেখানে সভ্যতার কথা বলা নিছক ভণ্ডামি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক সমাজ এক চরম অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছে। এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণ এবং শিক্ষার প্রাণস্পন্দন সমুন্নত রাখতে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী ‘শিক্ষক সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন এখন সময়ের অনিবার্য দাবিতে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান আহরণ বা ডিগ্রি অর্জনের নাম নয়। শিক্ষা হলো মনুষ্যত্ব ও মূল্যবোধের জাগরণ। এই জাগরণের প্রধান কারিগর হলেন শিক্ষক। একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে সম্মানের সাথে দাঁড়ান, তখন তিনি একটি প্রজন্মের মগজে নৈতিকতার বীজ বপন করেন। কিন্তু যখন কোনো সমাজে শিক্ষককে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয় বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়, তখন সেই শিক্ষার নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়ে। ভয় বা অপমানের ছায়ায় প্রকৃত শিক্ষা কখনো বিকশিত হতে পারে না। শিক্ষক যদি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে না পারেন, তবে তার ছাত্ররা কোনোদিন শিরদাঁড়া উঁচু করে বাঁচতে শিখবে না।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষকদের ওপর হামলার চিত্র শিউরে ওঠার মতো। সামান্য অজুহাতে কিংবা নিছক ভুল বোঝাবুঝির জেরে শিক্ষকদের কান ধরে ওঠবস করানো, গলায় জুতার মালা পরানো, এমনকি পিটিয়ে হত্যার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে যে, শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শাসন করলে, প্রভাবশালী অভিভাবক বা স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা দলবল নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে শিক্ষকের ওপর চড়াও হচ্ছেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এসব ঘটনা কেবল ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার গালে এক চরম চপেটাঘাত।
একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের সময় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন তার পক্ষে স্বাভাবিক পাঠদান অসম্ভব হয়ে পড়ে। অপমানিত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষকের কাছ থেকে মানসম্মত শিক্ষা আশা করা বৃথা। এই নিরাপত্তাহীনতা শিক্ষকদের পেশার প্রতি অনীহা তৈরি করছে, যার ফলে মেধাবীরা এখন শিক্ষকতা পেশায় আসতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। শিক্ষক যদি স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে না পারেন বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হন, তবে সেই শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল মেরুদণ্ডহীন প্রজন্মই উপহার দেবে। যখন সমাজ ও রাষ্ট্র শিক্ষকের নিরাপত্তার চেয়ে ক্ষমতার দাপটকে বড় করে দেখে, তখন শিক্ষা একটি জড় বস্তুতে পরিণত হয়। সেখানে সৃজনশীলতা থাকে না, থাকে কেবল যান্ত্রিক মুখস্থবিদ্যা আর সার্টিফিকেট অর্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
বর্তমানে প্রচলিত সাধারণ আইনে শিক্ষকদের পেশাগত বিশেষত্বের কোনো আলাদা স্বীকৃতি নেই। এর ফলে শিক্ষা প্রাঙ্গণে শিক্ষকদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার সঠিক ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষকদের সুরক্ষার জন্য একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। এই আইন কার্যকর হলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দীর্ঘসূত্রিতা নিরসন করা সম্ভব হবে। এটি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করবে। শিক্ষকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের জন্য এতে জামিন অযোগ্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকতে হবে। কেবল সরাসরি হামলা নয়, সামাজিকভাবে হেনস্তা রোধেও এই আইনে বিশেষ সুরক্ষা ধারা থাকা প্রয়োজন। ডিজিটাল মাধ্যমে চরিত্রহনন রোধ করাও এই আইনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এটি শিক্ষকদের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। সর্বোপরি, এই আইন শিক্ষকদের মনে একটি শক্তিশালী আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তা বোধ তৈরি করবে। ফলে তারা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে সৃজনশীল ও নৈতিক পাঠদান চালিয়ে যেতে পারবেন। একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য এমন নির্ভয় পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি।
প্রস্তাবিত শিক্ষক সুরক্ষা আইনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ‘বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা যেতে পারে। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা সরাসরি পুলিশি ব্যবস্থা বা গণপিটুনির পর্যায়ে না নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যাচাই করার বিধান রাখতে হবে। এছাড়া প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইনি সহায়তা সেল এবং জরুরি হটলাইন নম্বর থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা বাড়ানো এবং নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া নিশ্চিত করতে হবে। তবে আইন করে হয়তো অপরাধ দমন করা যায়, কিন্তু সম্মান প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন। পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষকের মর্যাদা বিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, শিক্ষক যখন লাঞ্ছিত হন, তখন রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
সভ্যতা কেবল আকাশচুম্বী অট্টালিকা বা শক্তিশালী অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। সভ্যতার আসল পরিচয় তার মানুষের আচরণ ও সংস্কৃতিতে। শিক্ষা যখন প্রাণহীন হয়ে পড়ে, তখন সমাজ থেকে বিচারবোধ ও ন্যায়পরায়ণতা বিদায় নেয়। যে সমাজ তার জ্ঞানের পথপ্রদর্শককে সম্মান দিতে জানে না, সেই সমাজের মুখে সভ্যতা শব্দটির উচ্চারণ চরম উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। নৈতিক অবক্ষয় গ্রাস করা একটি সমাজ যখন প্রগতির বড়াই করে, তখন তাকে নিছক ভণ্ডামি হিসেবেই গণ্য করা যায়।
শিক্ষক সমাজকে লাঞ্ছিত রেখে কোনো জাতি কখনো বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। শিক্ষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে কেবল জনবল রক্ষা করা নয়, বরং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। ‘শিক্ষক সুরক্ষা আইন’ কেবল শিক্ষকদের দাবি নয়, এটি আজ সমগ্র জাতির বিবেকের দাবি। একটি উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষককে তার প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকলেই শিক্ষা জীবন্ত থাকবে, আর কেবল তখনই আমরা গর্বের সাথে একটি সভ্য পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে পারব। অন্যথায়, আমাদের সকল অর্জনই হবে অন্তঃসারশূন্য এবং সভ্যতা পরিণত হবে কেবল এক কৃত্রিম লোকদেখানো আড়ম্বরে।
ফয়সল আহমদ বাবুল
লেখকঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
আপনার মতামত লিখুন :