
বাংলাদেশ নদী, খাল, বিল ও হাওর-বাঁওড়ের দেশ। এসব জলাশয়ে একসময় প্রচুর দেশি ছোট মাছ পাওয়া যেত। মলা, ঢেলা, পুঁটি, কাচকি, টেংরা, চাঁদা ও শিংসহ নানা প্রজাতির মাছ ছিল আমাদের প্রতিদিনের খাবারের অংশ। এসব মাছ শুধু স্বাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এগুলো পুষ্টিরও মূল্যবান উৎস। বিশেষ করে কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন ছোট মাছ ক্যালসিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।
ক্যালসিয়াম মানবদেহের জন্য অপরিহার্য খনিজ। হাড় ও দাঁতের গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে এর প্রধান ভূমিকা রয়েছে। পেশির সংকোচন, স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং রক্ত জমাট বাঁধার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। শরীরে দীর্ঘদিন ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে হাড়ের ঘনত্ব কমতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর ঘাটতি রিকেটসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তে পারে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি।
দেশি ছোট মাছের বিশেষত্ব হলো এর অনেক প্রজাতি মাথা ও কাঁটাসহ খাওয়া যায়। মাছের কাঁটা ও কঙ্কালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। বড় মাছের কাঁটা সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। ফলে কঙ্কালে থাকা ক্যালসিয়ামের বড় অংশ খাবারের সঙ্গে শরীরে যায় না। ছোট মাছের নরম কাঁটা চিবিয়ে খাওয়া যায়। তাই এ ধরনের মাছ থেকে ক্যালসিয়াম গ্রহণের সুযোগ বেশি।
বাংলাদেশে ছোট মাছের পুষ্টিগুণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ডফিশের গবেষণায় ছোট দেশি মাছের পুষ্টিমান গুরুত্ব পেয়েছে। পুষ্টিবিজ্ঞানী শকুন্তলা থিলস্টেড বাংলাদেশের ছোট মাছের পুষ্টিগুণ নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণা ছোট মাছকে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন ছোট মাছকে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পুষ্টির উৎস হিসেবে দেখা হয়েছে।
মলা মাছ এ ক্ষেত্রে একটি পরিচিত উদাহরণ। গবেষণায় মলা মাছকে ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে মাছের ক্যালসিয়ামের পরিমাণ প্রজাতি, বয়স, মৌসুম ও রান্নার পদ্ধতির ওপর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনো মাছের ক্যালসিয়ামের পরিমাণকে সব সময় একই ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবু সামগ্রিকভাবে কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন ছোট মাছ ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের জন্য ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন বিশেষভাবে বেশি। শৈশব ও কৈশোরে হাড় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ সময় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ হাড়ের স্বাভাবিক বিকাশে সহায়তা করে। খাদ্যতালিকায় ছোট মাছ থাকলে শিশুরা একই সঙ্গে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পেতে পারে। তবে শুধু ছোট মাছ খেলেই শিশুর সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় না। সুষম খাদ্যের সঙ্গে মাছকে যুক্ত করতে হবে।
গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদেরও পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের হাড় ও দাঁতের বিকাশে ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ। স্তন্যদানের সময়ও মায়ের খাদ্যে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম থাকা দরকার। ছোট মাছ এই প্রয়োজন পূরণে সহায়ক হতে পারে। তবে গর্ভাবস্থা বা স্তন্যদানের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী সামগ্রিক খাদ্যতালিকা তৈরি করা ভালো।
বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে যেতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে। পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হাড়ের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ। ছোট মাছ এই খাদ্যাভ্যাসের একটি মূল্যবান অংশ হতে পারে।
ক্যালসিয়াম শোষণের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। পর্যাপ্ত সূর্যালোক, সুষম খাদ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার খেলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। শরীরের সামগ্রিক পুষ্টি ও জীবনযাপনও বিবেচনায় রাখতে হবে।
ছোট মাছের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য। অনেক এলাকায় এসব মাছ স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায়। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও রান্না করলে এটি পরিবারের খাদ্যতালিকায় সহজেই যুক্ত করা যায়। মলা, পুঁটি, কাচকি বা টেংরার মতো মাছ নানা ঘরোয়া পদ্ধতিতে রান্না করা যায়। ফলে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পাশাপাশি দেশীয় খাদ্যসংস্কৃতিও টিকে থাকে।
তবে ছোট মাছের পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে নিরাপদ উৎস থেকে মাছ সংগ্রহ করা জরুরি। দূষিত জলাশয়ের মাছ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নদী, খাল, বিল ও হাওর-বাঁওড়ের পানি দূষণ কমাতে হবে। মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করতে হবে। নির্বিচারে ছোট মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উপায়ে দেশি ছোট মাছের চাষ বাড়ানো প্রয়োজন।
ছোট মাছ তাই শুধু একটি খাবার নয়। এটি আমাদের খাদ্যসংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার অংশ। একটি ছোট মাছের শরীরে লুকিয়ে থাকতে পারে বড় পুষ্টির সম্ভাবনা। বিশেষ করে কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন মাছ ক্যালসিয়ামের সহজলভ্য উৎস হতে পারে। তবে কোনো একক খাবারকে সব রোগের প্রতিষেধক হিসেবে দেখা উচিত নয়। সুষম খাদ্য, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাই সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি।
বাংলাদেশের প্রকৃতি আমাদের যে সম্পদ দিয়েছে, তার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। দেশি ছোট মাছ সংরক্ষণ করতে হবে। এর নিরাপদ উৎপাদন বাড়াতে হবে। পরিবারে এর গ্রহণ বাড়াতে হবে। পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাদ্যের সন্ধানে আমাদের নিজেদের জলজ সম্পদের দিকে নতুন করে তাকাতে হবে। ছোট মাছের থালায় তাই শুধু স্বাদ নয়, আছে পুষ্টি ও ঐতিহ্যের এক গভীর গল্প। এই সম্পদ রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টিনিরাপত্তাকেও শক্তিশালী করা।
লেখক : এমপিএইচ, এমডিএস, এমএড
শিক্ষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
আপনার মতামত লিখুন :