তৃষ্ণার্ত বানর, খুঁজছে নিরাপদ পানির উৎস : ফয়সল আহমদ বাবুল


sylnews24 প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ৬:১৯ অপরাহ্ন /
তৃষ্ণার্ত বানর, খুঁজছে নিরাপদ পানির উৎস : ফয়সল আহমদ বাবুল

সিলেট নগরের শাহী ঈদগাহসংলগ্ন গোয়াইটুলায় হযরত চাষনী পীর (রহ.)-এর মাজার। এটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। পাশাপাশি এখানে আছে সবুজ টিলা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। এসব টিলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও ধারণ করে। এগুলো বহু প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়। বিশেষ করে এখানে রেসাস ম্যাকাক বানরের বিচরণ রয়েছে। এ কারণে স্থানীয়ভাবে এলাকাটি ‘বানরের টিলা’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রেসাস ম্যাকাক বানরের বসবাসের তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদন ও গবেষণায় উঠে এসেছে।

মাজারের প্রাঙ্গণে মানুষের ভিড়ের সঙ্গে বানরের চলাচলও চোখে পড়ে। কেউ দোয়া ও জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আসেন। কেউ ঘুরতে আসেন। অনেকের হাতে থাকে কলা বা বিস্কুট। মানুষ খাবার এগিয়ে দেয়। বানরও খাবারের আশায় মানুষের কাছে আসে। দীর্ঘদিনের এই দৃশ্যটি ধর্মীয় পরিবেশ, নগরজীবন ও বন্যপ্রাণীরমধ্যে একটি স্বতন্ত্র সহাবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দৃশ্যটি মায়াময়। মানুষের হাতে খাবার পেয়ে বানরগুলোও যেন আপন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই মায়ার আড়ালে রয়েছে গভীর সংকট। প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস কমে গেলে মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর তাদের নির্ভরতা বাড়ে। অতিরিক্ত বা অস্বাস্থ্যকর খাবার তাদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে পারে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় রেসাস বানর ও মানুষের সহাবস্থানের চিত্র গবেষণায় উঠে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের ধরনও বদলাচ্ছে। নগরায়ণে কমছে সবুজ। গাছপালা ও প্রাকৃতিক জলাধার কমে যাওয়ায় তাদের খাদ্য ও পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। তাই খাবার ও পানির সন্ধানে তারা মানুষের কাছাকাছি আসছে। মানুষের দেওয়া খাবারও তাদের লোকালয়ের কাছাকাছি টেনে আনছে।

শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দিলে তারা লোকালয়ে চলে আসে। বাড়ির কল, পানির ট্যাংক ও পাইপলাইন তখন তাদের সহজলভ্য উৎস হয়ে এতে পানির অপচয় ও দূষণের আশঙ্কা থাকে। কখনো গৃহস্থালির জিনিসপত্রের ক্ষতিও হতে পারে। খাবার ও পানির সন্ধানে মানুষের কাছাকাছি আসায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এতে মানুষ ও বানর উভয়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

লোকালয়ে বানরের আনাগোনা একটি দৃশ্যমান সমস্যা। এর পেছনে থাকতে পারে পরিবেশগত সংকট। তাদের আবাসস্থল কেমন আছে, তা দেখা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক খাবারের জোগানও বিবেচনায় নিতে হবে। পানির উৎসের অবস্থাও জানতে হবে। এসব কারণ চিহ্নিত করা গেলে সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।

বানর টিলার জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফল খাওয়ার সময় তারা বিভিন্ন স্থানে বীজ ছড়িয়ে দেয়। এতে উদ্ভিদের বিস্তার ঘটে। টিলার পরিবেশও এভাবেই নানা প্রাণ ও উদ্ভিদের পারস্পরিক সম্পর্কে সমৃদ্ধ হয়। গাছ, লতা, পাখি, কীটপতঙ্গ ও বানরসহ বিভিন্ন প্রাণী সেখানে পাশাপাশি বসবাস করে। মাটি ও পানির উৎস তাদের জীবনধারণে সহায়তা করে। প্রতিটি উপাদান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই সম্পর্কের ভারসাম্যই টিলার বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখে।তাই কোনো একটি উপাদানের পরিবর্তন পুরো পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।

চাষনী পীরের মাজারের বানরদের খাদ্যসংকটের ইতিহাস বেশ পুরোনো। করোনাকালে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে সময় মাজারে মানুষের উপস্থিতি কমে যায়। মানুষের দেওয়া খাবারের পরিমাণও কমে যায়। ফলে বানরদের খাবারের জোগানে ঘাটতি দেখা দেয়। বিষয়টি তখন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। টিলার গাছপালা কমে যাওয়ার কথাও আলোচনায় আসে। প্রাকৃতিক খাবারের উৎসও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়। এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক খাদ্যব্যবস্থা প্রকৃতির ওপরই নির্ভরশীল। মানুষের দেওয়া খাবার সেই ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। তাই বানর রক্ষায় তাদের প্রাকৃতিক খাদ্য ও আবাসস্থল সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সংরক্ষণের কাজ শুরু হতে পারে টিলার বিদ্যমান আবাসস্থল রক্ষার মাধ্যমে। প্রথমে পুরোনো ও বড় গাছগুলো চিহ্নিত করে সুরক্ষা দিতে হবে। এরপর টিলার উপযোগী দেশীয় ফলদ ও ছায়াদানকারী গাছ পর্যায়ক্রমে লাগানো যেতে পারে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা ও পানি দেওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে বানরের পানির চাহিদা মেটাতে কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে ছোট পানির আধার তৈরি করা যেতে পারে। এসব আধারে নিয়মিত পানি সরবরাহ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এ উদ্যোগগুলো স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও মাজার পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা হলে টিলার প্রাকৃতিক পরিবেশ ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে বানরের লোকালয়ে আসার প্রবণতাও কমানো সম্ভব হবে।

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট কিছুটা কমবে। টিলার প্রাকৃতিক ছড়া ও জলধারাগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহও সচল রাখা জরুরি। জলাধার ভরাট, পানি দূষণ ও অপরিকল্পিত স্থাপনা থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব বিষয়ে যথাযথ নজরদারি থাকলে টিলার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষিত থাকবে। পানি সংরক্ষণ তাই টিলার পরিবেশ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে।

খাদ্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি। দর্শনার্থীদের ইচ্ছেমতো বিস্কুট, লবণ, চিনি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার দেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। এ বিষয়ে মাজার এলাকায় সচেতনতামূলক নির্দেশনা রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে প্রাণিবিজ্ঞানীদের পরামর্শে বানরের জন্য উপযোগী খাদ্য সরবরাহের একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। বাড়ির পানির ট্যাংক ঢেকে রাখা দরকার। কল ও পাইপের সংযোগ নিরাপদ রাখা প্রয়োজন। খাবার ও বর্জ্যও ঢেকে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে লোকালয়ে বানরের আনাগোনা কমবে। পাশাপাশি টিলার প্রাকৃতিক পরিবেশ সমৃদ্ধ করতে হবে। একটি কলা মুহূর্তের ক্ষুধা মেটাতে পারে। কিন্তু একটি ফলদ গাছ বছরের পর বছর খাবার দিতে পারে। একটি নিরাপদ পানির উৎস বানরকে মানুষের বাড়ির ট্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন থেকে দূরে রাখতে পারে। সেখানে নিরাপদ জলাধার গড়ে তুলতে হবে। দেশীয় ফলদ ও ছায়াদানকারী বৃক্ষ বাড়াতে হবে। প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎসও সমৃদ্ধ করতে হবে। নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে হবে। তবেই মানুষ ও বানরের সহাবস্থান আরও সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বানরের টিলার সুরক্ষায় স্থানীয় অংশীজনদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। মাজার কমিটি দর্শনার্থীদের সচেতন করবে। খাবার দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেবে। সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানির ব্যবস্থা করবে। বন বিভাগ বানরের আবাস ও চলাচল পর্যবেক্ষণ করবে। পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশগত ঝুঁকি চিহ্নিত করবে। স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করবে। বাসিন্দারা খাবার-বর্জ্য নিরাপদে রাখবেন। পানির ট্যাংক ও ঘরবাড়ি সুরক্ষিত রাখবেন।

আসুন, সবাই মিলে সবুজ টিলা রক্ষা করি। গাছপালা সংরক্ষণ করি, জলাধার রক্ষা করি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখি। বানরকে তাড়া বা আঘাত না করে সহনশীল ও মানবিক আচরণ করি। মানুষ নিরাপদে থাকুক, বন্যপ্রাণীও আপন আবাসে বেঁচে থাকুক। প্রকৃতি থাকুক প্রাণময় ও সমৃদ্ধ। মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থান হোক শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও টেকসই।

লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সদর, সিলেট।