শ্রেণিকক্ষ থেকে বাস্তব জীবনের কার্যকর শিখনে ফিল্ড ট্রিপ : ফয়সল আহমদ বাবুল


sylnews24 প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ৮:০০ পূর্বাহ্ন /
শ্রেণিকক্ষ থেকে বাস্তব জীবনের কার্যকর শিখনে ফিল্ড ট্রিপ : ফয়সল আহমদ বাবুল

শিক্ষার শুরু বই থেকে হতে পারে। শিক্ষার পরিসর বইয়ের পাতার বাইরেও বিস্তৃত। একটি শিশুর চারপাশও হতে পারে তার উন্মুক্ত পাঠশালা। প্রকৃতি হতে পারে শিক্ষার উপকরণ। মানুষের জীবন হতে পারে জ্ঞানের উৎস। সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও হতে পারে শেখার ক্ষেত্র। ইতিহাসের নিদর্শন শিক্ষার্থীর সামনে খুলে দিতে পারে অতীতের দরজা। বিজ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ তৈরি করতে পারে নতুন উপলব্ধি। শ্রেণিকক্ষের বাইরে রয়েছে শেখার এক বিশাল জগৎ। সেই জগতের সঙ্গে শিক্ষার্থীর পরিচয় ঘটানোর একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো ফিল্ড ট্রিপ বা ক্ষেত্রভ্রমণ। ফিল্ড ট্রিপ শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে। এটি আনন্দের সঙ্গে শেখার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। এর মাধ্যমে পাঠ্যবিষয়ের সঙ্গে বাস্তব জীবনের যোগসূত্র তৈরি হয়। শিক্ষার্থী নিজের চোখে দেখে এবং নিজের অভিজ্ঞতায় শেখে। ফলে জ্ঞান হয় আরও গভীর। শেখা হয় আরও আনন্দময়। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানও হয় দীর্ঘস্থায়ী।

একজন শিক্ষার্থী বইয়ে নদীভাঙনের সংজ্ঞা পড়ে একটি ধারণা পায়। কিন্তু নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সে যখন ভাঙনের চিহ্ন দেখে, তখন বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বসতভিটা বিলীন হওয়ার দৃশ্য তাকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তখন নদীভাঙন আর শুধু একটি সংজ্ঞা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে জীবন্ত অভিজ্ঞতা। ফিল্ড ট্রিপের শিক্ষামূল্য এখানেই। এটি শিক্ষার্থীকে জানা থেকে দেখা, দেখা থেকে বোঝা এবং বোঝা থেকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের দিকে এগিয়ে নেয়।

ফিল্ড ট্রিপের ভাবনা আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে সুসংগঠিত রূপ পেলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ শিক্ষাদার্শনিক ঐতিহ্য। অষ্টাদশ শতকের ফরাসি দার্শনিক জাঁ-জ্যাক রুশো প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে প্রকৃতি ও বাস্তব পরিবেশ থেকে শেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর এমিল গ্রন্থে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। পরে জোহান হাইনরিখ পেস্তালোৎসি পর্যবেক্ষণ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিশুকে শেখানোর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।

বিশ শতকে জন ডিউই এই চিন্তাকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেন। তাঁর ‘লার্নিং বাই ডুইং বা কাজের মাধ্যমে শেখার ধারণা শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। ডিউইয়ের মতে, শিক্ষা জীবন থেকে আলাদা কোনো বিষয় নয়। জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই শিক্ষা বিকশিত হয়। শিক্ষার্থী যখন কোনো কাজ করে, পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সমস্যার সমাধান খোঁজে, তখন তার শেখা গভীর হয়। ফিল্ড ট্রিপ সেই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগের একটি কার্যকর ক্ষেত্র।

মারিয়া মন্টেসরি শিশুর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা ও স্বাধীন অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। শিশু নিজের মতো করে দেখতে, ছুঁতে ও পর্যবেক্ষণ করতে করতে শেখে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা তৈরি করে। জঁ পিয়াজের জ্ঞানীয় বিকাশ তত্ত্বেও সক্রিয় মিথস্ক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। শিশু পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিশু জ্ঞান গড়ে তোলে। ডেভিড কোলব এই অভিজ্ঞতাকে একটি শিখনচক্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শুরু হয় শেখার প্রক্রিয়া। এরপর আসে চিন্তা, ধারণা তৈরি ও প্রয়োগ। এভাবেই শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গ শিখনের দিকে এগিয়ে যায়। ফিল্ড ট্রিপ এই পুরো প্রক্রিয়াকে বাস্তব ও কার্যকর করে তোলে।

মুসলিম জ্ঞানচর্চায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। আধুনিক অর্থে ফিল্ড ট্রিপ শব্দটি তখন প্রচলনের বাইরে ছিল। তবে সফর, পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। মুসলিম সভ্যতায় জ্ঞানার্জনের জন্য ভ্রমণ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। ‘রিহলা’ ঐতিহ্য জ্ঞানপিপাসু মানুষকে দূর-দূরান্তে ভ্রমণে উৎসাহিত করত। ইবনে খালদুন সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা বিশ্লেষণে বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব দিয়েছেন। ইমাম আল-গাজ্জালী প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও গভীর চিন্তার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ইবনে সিনার জ্ঞানচর্চায় পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও পরীক্ষার সমন্বয় ছিল। আল-ফারাবীও যুক্তি ও পর্যবেক্ষণনির্ভর জ্ঞানচর্চাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁদের চিন্তায় আধুনিক ফিল্ড ট্রিপের তাত্ত্বিক ভিত্তির সূত্র পাওয়া যায়। তবে তাঁদের জ্ঞানচর্চায় বাস্তব অভিজ্ঞতার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তাঁরা প্রকৃতি ও সমাজকে কাছ থেকে দেখেছেন, পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন করেছেন। অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করেছেন। বাস্তবতা থেকে জ্ঞান নেওয়ার ওপর তাঁরা জোর দিয়েছেন। এই ভাবনার সঙ্গে ফিল্ড ট্রিপের বেশ মিল রয়েছে। নিজের চোখে দেখে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেখে। তাই তাঁদের জ্ঞানচর্চার সঙ্গে ফিল্ড ট্রিপের মৌলিক ভাবনার একটি সুন্দর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান সমৃদ্ধ করার একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে ফিল্ড ট্রিপের প্রয়োগ অনেক বিস্তৃত। বিজ্ঞান শিক্ষায় এটি বিশেষ কার্যকর। অষ্টম শ্রেণিতে বাস্তুতন্ত্র পড়ানোর পর শিক্ষার্থীদের ইকো-পার্কে নেওয়া যেতে পারে। সেখানে তারা উৎপাদক, খাদক ও বিয়োজক বা পচনকারীকে বাস্তবে দেখতে পারে। খাদ্যশৃঙ্খলের বাস্তব রূপ বুঝতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরেও তারা বিভিন্ন মডেল পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এতে শক্তির রূপান্তর ও বৈজ্ঞানিক নীতির প্রয়োগ তাদের কাছে সহজবোধ্য হয়ে উঠতে পারে।

জীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বোটানিক্যাল গার্ডেন বা হার্বারিয়ামে নিয়ে গেলে উদ্ভিদের বৈচিত্র্য, শ্রেণীবিন্যাস, গঠন ও পরিবেশগত সম্পর্ক সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়। কৃষিশিক্ষার শিক্ষার্থীরা কৃষিখামার, নার্সারি বা কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মাটির গুণাগুণ, জৈব সার, বীজ সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা ও ফসলের রোগবালাই সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

রসায়ন শিক্ষার সঙ্গে পানি শোধনাগার বা শিল্পকারখানার সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে শিক্ষার্থীরা পানি পরিশোধন, রাসায়নিক নিরাপত্তা ও শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তব প্রক্রিয়া দেখতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সাবস্টেশন পরিদর্শনের মাধ্যমে জেনারেটর, ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবহারিক দিক বুঝতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প তাদের নবায়নযোগ্য শক্তি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিতে পারে।

ইতিহাসের পাঠও ফিল্ড ট্রিপে সহজ ও জীবন্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা মহাস্থানগড় বা ময়নামতি পরিদর্শন করতে পারে। তারা জাদুঘরেও যেতে পারে। সেখানে তারা প্রত্নসম্পদ ও পুরোনো স্থাপত্য দেখে। ঐতিহাসিক নিদর্শন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে। ফলে ইতিহাস শুধু পরীক্ষার বিষয় থাকে না। অতীত তাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একইভাবে ভূগোলের শিক্ষার্থীরাও বাস্তব পরিবেশ থেকে শিখতে পারে। তারা নদী, পাহাড় ও হাওর পরিদর্শন করতে পারে। নদীভাঙন এলাকাও পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এতে তারা ভূমিরূপের পরিবর্তন বুঝতে পারে। পরিবেশের পরিবর্তনও সহজে উপলব্ধি করতে পারে।

ফিল্ড ট্রিপকে শিক্ষণীয় করতে হলে যথাযথ পরিকল্পনা জরুরি। আগে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও স্থান নির্ধারণ করতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হবে। ওয়ার্কশিট দেওয়া যেতে পারে। ভ্রমণের সময় দলগতভাবে পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ ও নোট নিতে হবে। ফিরে এসে প্রতিবেদন, পোস্টার, চার্ট বা উপস্থাপনা করানো যায়। এতে অর্জিত জ্ঞান আরও সুসংহত হয়।

ফিল্ড ট্রিপ শিক্ষার্থীকে নিষ্ক্রিয় শ্রোতা থেকে সক্রিয় অনুসন্ধানকারীতে পরিণত করা। সে প্রশ্ন করতে শেখে, প্রমাণ খুঁজতে শেখে, পর্যবেক্ষণ করতে শেখে এবং নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে শেখে। একই সঙ্গে তার দলগত কাজের দক্ষতা বাড়ে। দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলা তৈরি হয়। সামাজিক সচেতনতাও বিকশিত হয়। এভাবে ফিল্ড ট্রিপ শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও জীবনদক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আজকের শিক্ষা পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। তাই ফিল্ড ট্রিপের গুরুত্ব নতুন করে ভাবতে হবে। এটি একটি প্রয়োজনীয় ও অর্থবহ শিক্ষামূলক আয়োজন। পরিকল্পিতভাবে এটি পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নের কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। বই জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়। ফিল্ড ট্রিপ সেই জ্ঞানকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। প্রকৃতি হয়ে ওঠে বিজ্ঞানের পাঠশালা। নদী হয় ভূগোলের জীবন্ত মানচিত্র। জাদুঘর হয় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে বাস্তব শিক্ষার পরীক্ষাগার।

লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা