
একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষাব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শিক্ষা এখন আর শুধু তথ্য প্রদান ও মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সামাজিক ও যোগাযোগ দক্ষতার বিকাশ ঘটানো। তথ্য মনে রাখার চেয়ে বিষয়টি বোঝা এখন বেশি জরুরি। বিভিন্ন ধারণার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করাই আসল দক্ষতা। আর অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাই হলো শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। এ কারণে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, সক্রিয় ও অংশগ্রহণমূলক শিখন-শেখানোর কৌশলের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এই পরিবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থায় কনসেপ্ট ম্যাপিং একটি কার্যকর ও গবেষণাসমর্থিত শিখন-শেখানো কৌশল হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। এটি শিক্ষার্থীর চিন্তাকে সংগঠিত করে। বিভিন্ন ধারণার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে অর্থবহ শিখন ও উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে।
কনসেপ্ট ম্যাপিং হলো কোনো বিষয়ের বিভিন্ন ধারণা ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে চিত্রের মাধ্যমে সংগঠিত ও উপস্থাপনের একটি পদ্ধতি। সাধারণত একটি কেন্দ্রীয় ধারণাকে ভিত্তি করে তার সঙ্গে সম্পর্কিত উপধারণাগুলোকে বিভিন্ন রেখা ও সংযোগকারী শব্দের মাধ্যমে যুক্ত করা হয়। ফলে একটি বিষয়ের সামগ্রিক কাঠামো শিক্ষার্থীর সামনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একটি কার্যকর কনসেপ্ট ম্যাপের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকে। এর মধ্যে রয়েছে কনসেপ্ট বা ধারণা, লিংকিং ওয়ার্ডস বা সংযোগকারী শব্দ, প্রপোজিশন বা অর্থপূর্ণ বক্তব্য, হায়ারার্কি বা স্তরবিন্যাস, ক্রস-লিংক বা আন্তঃসংযোগ এবং এগজ্যাম্পল বা উদাহরণ।
কনসেপ্টের মাধ্যমে মূল বিষয় বা ধারণাকে চিহ্নিত করা হয়। সংযোগকারী শব্দের সাহায্যে এক ধারণার সঙ্গে অন্য ধারণার সম্পর্ক বোঝানো হয়। দুটি বা ততোধিক ধারণাকে অর্থপূর্ণভাবে যুক্ত করলে একটি প্রপোজিশন তৈরি হয়। হায়ারার্কির মাধ্যমে সাধারণ ধারণা থেকে ধীরে ধীরে বিশেষ বা উপধারণাগুলোকে সাজানো হয়। ক্রস-লিংকের মাধ্যমে কনসেপ্ট ম্যাপের বিভিন্ন অংশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরা হয়। বাস্তব উদাহরণ কোনো ধারণাকে আরও সহজ, স্পষ্ট ও বোধগম্য করে তোলে। তাই কনসেপ্ট ম্যাপকে শুধু একটি চিত্র হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা যায় না। এটি মূলত শিক্ষার্থীর চিন্তা, ধারণা ও জ্ঞান কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ও সংগঠিত হয়েছে, তার একটি দৃশ্যমান উপস্থাপন।
কনসেপ্ট ম্যাপিং পদ্ধতির প্রধান প্রবর্তক হলেন জোসেফ ডি. নোভাক। তিনি একজন আমেরিকান শিক্ষাবিদ। ১৯৭০-এর দশকে তিনি এই পদ্ধতির বিকাশ করেন। তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করছিলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল শিশুদের ধারণাগত বিকাশ ও শিখন প্রক্রিয়া। কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে ওঠে ডেভিড পি. আউসুবেল-এর অর্থবহ শিখন তত্ত্ব থেকে। আউসুবেলের মতে, নতুন জ্ঞান পূর্বজ্ঞানকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থীর আগে থেকে কী জানা আছে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নতুন তথ্য পূর্বজ্ঞান-এর সঙ্গে যুক্ত হলে শিখন আরও অর্থবহ হয়। এতে জ্ঞান দীর্ঘদিন মনে থাকে। নোভাক আউসুবেলের এই ধারণাকে শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগের উপযোগী করেন। তিনি বিভিন্ন ধারণার মধ্যে সম্পর্ক দেখানোর একটি দৃশ্যমান পদ্ধতি তৈরি করেন। এই পদ্ধতিই পরে কনসেপ্ট ম্যাপিং নামে পরিচিত হয়। তাই আউসুবেলকে কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তির প্রধান ব্যক্তিত্ব বলা হয় আর জোসেফ ডি. নোভাক-কে কনসেপ্ট ম্যাপিং পদ্ধতির প্রবর্তক বা জনক বলা হয়।
কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষা দার্শনিক ও শিক্ষামনোবিজ্ঞানীর চিন্তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আউসুবেলের অর্থবহ শিখন তত্ত্ব কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাঁর মতে, পূর্বজ্ঞান ও নতুন জ্ঞানের মধ্যে অর্থপূর্ণ সংযোগ তৈরি হলেই প্রকৃত শিখন ঘটে। কনসেপ্ট ম্যাপিং সেই সংযোগকে দৃশ্যমান করে। ফলে শিক্ষার্থী বিচ্ছিন্ন তথ্য মুখস্থ না করে তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে পারে। জোসেফ ডি. নোভাকএই তাত্ত্বিক ধারণাকে ব্যবহারিক রূপ দিয়েছেন। তাঁর মতে, কনসেপ্ট ম্যাপ জ্ঞানকে দৃশ্যমানভাবে উপস্থাপন করে এবং শিক্ষার্থীর চিন্তাকে সংগঠিত করতে সাহায্য করে।
জ্যাঁ পিয়াজের জ্ঞানীয় বিকাশ তত্ত্বের সঙ্গেও কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পিয়াজের মতে, শিশু নিষ্ক্রিয়ভাবে জ্ঞান গ্রহণ করে না। সে নিজের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে জ্ঞান নির্মাণ করে। কনসেপ্ট ম্যাপিং শিক্ষার্থীকে নিজের ধারণাগুলো সাজানোর সুযোগ দেয়। নতুন তথ্যের সঙ্গে পূর্ববর্তী ধারণার সম্পর্ক তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষার্থী নিজের জ্ঞানকে পুনর্গঠন করে। ফলে পিয়াজের গঠনবাদী শিক্ষাদর্শনের একটি কার্যকর প্রয়োগ হিসেবে কনসেপ্ট ম্যাপিংকে দেখা যায়।
লেভ ভাইগটস্কি শিক্ষার ক্ষেত্রে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও সহযোগিতামূলক শিখনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর জোন অব প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট (জেডপিডি) ধারণা অনুযায়ী, শিক্ষক বা অধিক দক্ষ সহপাঠীর সহযোগিতায় একজন শিক্ষার্থী তার বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে উচ্চতর স্তরে পৌঁছাতে পারে। শ্রেণিকক্ষে দলগতভাবে কনসেপ্ট ম্যাপ তৈরি করলে শিক্ষার্থীরা একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করে। নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। অন্যের মতামত শুনে। প্রয়োজন হলে ভুল ধারণা সংশোধন করে। শিক্ষক এখানে সহায়কের ভূমিকা পালন করেন। এভাবে কনসেপ্ট ম্যাপিং ভাইগটস্কির সামাজিক নির্মাণবাদী দর্শনের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে।
জেরোম ব্রুনারের ডিসকভারি লার্নিং বা আবিষ্কারভিত্তিক শিখন তত্ত্বের সঙ্গেও কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের সম্পর্ক রয়েছে। ব্রুনারের মতে, শিক্ষার্থী যখন নিজে অনুসন্ধান করে কোনো ধারণা বা সম্পর্ক আবিষ্কার করে, তখন সেই শিখন অধিক কার্যকর ও স্থায়ী হয়। কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ে শিক্ষক সব উত্তর বলে দেন না। বরং প্রশ্ন করেন এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে উৎসাহিত করেন। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ধারণাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করে। ফলে শিখন একটি অনুসন্ধানী প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
জন ডিউই শিক্ষায় বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর লার্নিং বাই ডুইং বা কাজের মাধ্যমে শেখা ধারণার মূল বক্তব্য হলো, কাজের মাধ্যমে শেখা অধিক কার্যকর। কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ধারণা নির্বাচন করে। তারা ধারণাগুলো সাজায়, সম্পর্ক তৈরি করে, আলোচনা করে এবং শ্রেণিতে উপস্থাপন করে। ফলে তারা শিখনের সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হয়। এটি ডিউইর অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বেনজামিন ব্লুমের ট্যাক্সোনমি অব এডুকেশনাল অবজেক্টিভস -এর সঙ্গেও কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্লুমের শ্রেণিবিন্যাসে শুধু তথ্য মনে রাখাকে শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য ধরা হয়নি। বোঝা, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং সৃষ্টিশীলতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি কনসেপ্ট ম্যাপ তৈরি করতে শিক্ষার্থীকে ধারণা শনাক্ত করতে হয়। তাকে ধারণাগুলো শ্রেণিবিন্যাস করতে হয়। বিভিন্ন সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে হয়। প্রয়োজনে নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। ফলে কনসেপ্ট ম্যাপিং উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও কনসেপ্ট ম্যাপিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক একটি অধ্যায়ের কনসেপ্ট ম্যাপ তৈরি করলে পুরো পাঠের কাঠামো সহজে বুঝতে পারেন। কোন ধারণাটি আগে শেখাতে হবে এবং কোন ধারণাটি পরে শেখাতে হবে, তা নির্ধারণ করা সহজ হয়। পাঠ পরিকল্পনা আরও সুসংগঠিত হয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণে কনসেপ্ট ম্যাপ তৈরি করলে প্রশিক্ষণার্থীগণ বিষয়বস্তু গভীরভাবে বুঝতে পারে্ন।তাঁরা ধারণার সম্পর্ক শনাক্ত করেন। মূল বিষয়গুলো সাজাতে শেখেন। ফলে বিষয়জ্ঞান বাড়ে। পাঠ পরিকল্পনা ও শিক্ষণ কৌশল নির্ধারণের দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে এটি অ্যাকটিভ লার্নিং (সক্রিয় শিখন), কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্ট (ধারাবাহিক মূল্যায়ন) এবং রিফ্লেকটিভ টিচিং (প্রতিফলনমূলক শিক্ষণ) এর কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
শ্রেণিকক্ষে কনসেপ্ট ম্যাপিং প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রথমে পাঠের কেন্দ্রীয় ধারণা নির্ধারণ করবেন। তিনি বোর্ডে বা পর্দায় সেই ধারণাটি লিখবেন। এরপর প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পূর্বজ্ঞান সক্রিয় করবেন। শিক্ষার্থীরা নিজেদের জানা তথ্য ও ধারণা প্রকাশ করবে। শিক্ষক সেগুলো সংগ্রহ করে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করবেন। এরপর শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে একটি কনসেপ্ট ম্যাপ তৈরির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি দল নিজেদের ম্যাপ তৈরি করবে এবং শ্রেণির সামনে উপস্থাপন করবে। শিক্ষক সরাসরি সবকিছু বলে না দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন, ইঙ্গিত ও সহায়তা দেবেন। শেষে শিক্ষার্থীদের তৈরি ম্যাপের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যাবে। এতে শিখন ও মূল্যায়ন একই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে।
বিষয়ভেদেও কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। বিজ্ঞান বিষয়ে সালোক-সংশ্লেষণ শেখানোর সময় সূর্যালোক, পানি, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফিল, গ্লুকোজ ও অক্সিজেনের সম্পর্ক দেখানো যায়। গণিতে বাস্তব সংখ্যা, মূলদ সংখ্যা ও অমূলদ সংখ্যার সম্পর্ক দেখানো যায়। বাংলায় সমাসের বিভিন্ন প্রকার ও উদাহরণ সাজানো যায়। ইসলাম শিক্ষায় ঈমান, ইবাদত ও নৈতিকতার বিভিন্ন ধারণার সম্পর্ক তুলে ধরা যায়। সামাজিক বিজ্ঞানে রাষ্ট্র, নাগরিক, অধিকার, দায়িত্ব ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক দেখানো যায়। ইংরেজিতে পার্টস অব স্পিচ (পদভেদ), ভোক্যাবুলারি (শব্দভান্ডার) এবং রিডিং কমপ্রিহেনশন (পাঠ অনুধাবন) -এর বিভিন্ন ধারণা সংগঠিত করা যায়। ফলে এটি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এটি শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান সক্রিয় করে। এটি অর্থবহ শিখনকে উৎসাহিত করে। ধারণাগুলোর আন্তঃসম্পর্ক স্পষ্ট করে। বিশ্লেষণী ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটায়। সৃজনশীলতা বাড়ায়। সমস্যা সমাধানের দক্ষতা উন্নত করে। দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে শিখন সংরক্ষণে সহায়তা করে। পাঠের সারসংক্ষেপ তৈরি করা সহজ হয়। ভুল ধারণা শনাক্ত করা যায়। দলগত কাজের মাধ্যমে যোগাযোগ ও সহযোগিতার দক্ষতা বাড়ে। শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে এটি ধারাবাহিক মূল্যায়নের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
তবে কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে এটি প্রথমদিকে কঠিন মনে হতে পারে। একটি ভালো কনসেপ্ট ম্যাপ তৈরি করতে সময় লাগে। বড় শ্রেণিকক্ষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সমানভাবে সম্পৃক্ত করা কঠিন হতে পারে। সব শিক্ষকও শুরুতেই এই কৌশল ব্যবহারে দক্ষ নাও হতে পারেন। তাই শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত অনুশীলন এবং ধীরে ধীরে জটিলতার মাত্রা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রথমে সহজ বিষয় নিয়ে কাজ করলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েই পদ্ধতিটির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। প্রয়োজনে চার্ট, বোর্ড এবং ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের দক্ষতাভিত্তিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রেক্ষাপটেও কনসেপ্ট ম্যাপিংয়ের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এটি শিখনফল অর্জন, সক্রিয় অংশগ্রহণ, সহযোগিতামূলক শিখন এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের সঙ্গে সহজেই সমন্বয় করা যায়। শিক্ষক যদি শুধু বক্তৃতা না দিয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা তৈরি ও সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ দেন, তাহলে শ্রেণিকক্ষ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীরা নিজের শেখার দায়িত্ব নিতে শিখবে। শিক্ষকও শিক্ষার্থীর চিন্তার ধরন ও ভুল ধারণা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন।
কনসেপ্ট ম্যাপিং শিক্ষার্থীর চিন্তাকে দৃশ্যমান করে। এটি শেখার গভীরতা প্রকাশ করে। এতে শিক্ষার্থীর চিন্তার ধরন বোঝা যায়। সে কোন ধারণাকে গুরুত্ব দিয়েছে, তা দেখা যায়। ধারণাগুলোর মধ্যে সম্পর্কও স্পষ্ট হয়। ফলে শেখার প্রক্রিয়া সহজে মূল্যায়ন করা যায়। তাই এটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে কনসেপ্ট ম্যাপিং শ্রেণিকক্ষকে আরও সক্রিয়, সহযোগিতামূলক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করে তুলতে পারে। এটি মুখস্থনির্ভর শিখনকে ধীরে ধীরে বোঝাপড়া, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগভিত্তিক শিখনে রূপ দিতে পারে। বর্তমান দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার যুগে তাই কনসেপ্ট ম্যাপিং একটি সম্ভাবনাময় ও কার্যকর শিখন-শেখানো কৌশল।
লেখকঃ
সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সদর, সিলেট।
আপনার মতামত লিখুন :