
একটি জাতির ভাগ্য রচিত হয় শ্রেণিকক্ষে। আর সেই শ্রেণিকক্ষের প্রাণ একজন শিক্ষক। তিনি শুধু পাঠদান করেন না। তিনি মানুষের ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তোলেন। তিনি স্বপ্ন দেখান, তিনি চরিত্র গড়েন এবং তিনি মূল্যবোধের বীজ বপন করেন। তাই যুগে যুগে শিক্ষক সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন, মা-বাবা সন্তানকে জীবন দেন, কিন্তু শিক্ষক শেখান কীভাবে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে হয়। ইসলামের মহান শিক্ষাও একই সত্য ঘোষণা করে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, আমি শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি। এই ঘোষণার মধ্যেই শিক্ষকতার সর্বোচ্চ মর্যাদা নিহিত রয়েছে।
পবিত্র কোরআনের প্রথম নির্দেশ ছিল, পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে। জ্ঞানের এই আহ্বান মানবসভ্যতার ভিত্তি। মুসলিম মনীষী ইমাম আল-গাজ্জালী লিখেছেন, শিক্ষক নবীদের উত্তরাধিকারী। কারণ তাঁরা মানুষের অন্তরে জ্ঞানের আলো জ্বালান। ইবনে সিনা বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষের বুদ্ধি, নৈতিকতা ও চিন্তার বিকাশ ঘটায়। ইবনে খালদুন মনে করতেন, কোনো জাতির উন্নতি বা অবনতি নির্ভর করে তার শিক্ষা ও শিক্ষকের মানের ওপর। তাই শিক্ষককে সম্মান করা মানে সভ্যতাকে সম্মান করা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ সেই শিক্ষকই সবচেয়ে সহজ উপহাসের লক্ষ্যবস্তু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সামান্য ভুলও মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। আঞ্চলিক উচ্চারণ নিয়ে হাসাহাসি হয়। অসতর্ক মুহূর্ত নিয়ে তৈরি হয় ট্রল বা কৌতুক। একটি ট্রল ভিডিও লক্ষ মানুষের বিনোদন হয়ে ওঠে। অথচ সেই ট্রল ভিডিওর আড়ালে চাপা পড়ে যায় একজন শিক্ষকের দীর্ঘ সংগ্রাম। হারিয়ে যায় তাঁর নীরব আত্মত্যাগের ইতিহাস।
শিক্ষকও একজন মানুষ। তাঁরও সীমাবদ্ধতা আছে। ভুল হতে পারে। ভুল থেকে শেখার সুযোগও থাকা উচিত। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ভুল করার স্বাধীনতা না থাকলে সেই স্বাধীনতার কোনো অর্থ নেই। তাই সমালোচনা হোক যুক্তিনির্ভর। হোক দায়িত্বশীল। কিন্তু অপমান, ট্রল কিংবা সামাজিক লাঞ্ছনা কোনো সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না। এতে একজন শিক্ষক যেমন আহত হন, তেমনি আহত হয় শিক্ষা ব্যবস্থার মর্যাদা।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিশাল অংশ পরিচালিত হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এই শিক্ষকরাই প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছেন। কিন্তু তাঁদের বাস্তব জীবন অনেক কঠিন, সীমিত বেতন ও অপ্রতুল ভাতা। বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ, সংসারের নিত্যসংগ্রাম। তারপরও তাঁরা সময়মতো শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হন, মুখে হাসি রাখেন এবং শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেন। নিজের অভাবকে কখনো পাঠদানের অন্তরায় হতে দেন না। এই নীরব ত্যাগ খুব কম মানুষই অনুভব করেন।
ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৯৬৬ সালের রেকমেন্ডেশন কনসার্নিং দ্য স্ট্যাটাস অব টিচার্স-এ শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন, সামাজিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের এসডিজি-৪-ও একই কথা বলেছে। মানসম্মত শিক্ষা চাইলে আগে মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। আর মানসম্মত শিক্ষক গড়ে ওঠেন সম্মান, নিরাপত্তা ও প্রেরণার পরিবেশে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদের ভিত্তি নির্মাণ করেন শিক্ষক। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, শিক্ষা হলো সেই জিনিস, যা বিদ্যালয়ে শেখা বিষয় ভুলে যাওয়ার পরও মানুষের মধ্যে থেকে যায়। সেই স্থায়ী শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের নয়। এটি বিবেকের শিক্ষা, এটি মানবিকতার শিক্ষা, এটি দায়িত্ববোধের শিক্ষা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য দেওয়া নয়, মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানো। ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন বলেছেন, সত্যিকারের শিক্ষক সেই, যিনি শিক্ষার্থীকে নিজে চিন্তা করতে শেখান। ব্রাজিলের শিক্ষাতাত্ত্বিক পাওলো ফ্রেইরে মনে করতেন, শিক্ষা মানুষকে বদলায়, আর মানুষই পৃথিবীকে বদলে দেয়। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন শিক্ষক।
অবশ্য শিক্ষক সমাজেরও দায়িত্ব আছে। জ্ঞানকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। কোথাও ব্যত্যয় ঘটলে তার যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনি সমাধান হওয়া উচিত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপমান করা কখনো সমাধান হতে পারে না। এতে আস্থা নষ্ট হয়। সম্মান ক্ষয়ে যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভুল বার্তা পায়।
একটি প্রবাদ আছে, একজন ভালো শিক্ষক একটি মোমবাতির মতো। তিনি নিজে জ্বলে অন্যকে আলো দেন। বাস্তবেও তাই। একজন শিক্ষক নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে অন্যের স্বপ্ন গড়ে তোলেন। তাঁর সাফল্য নিজের নামে নয়, শিক্ষার্থীর অর্জনে। তাঁর গর্ব নিজের সম্পদে নয়, শিক্ষার্থীর সততা, মানবিকতা ও সাফল্যে।
আজ সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। শিক্ষককে বিনোদনের উপকরণ নয়, জাতির সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। তাঁর মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষককে সম্মান করা মানে জ্ঞানকে সম্মান করা। জ্ঞানকে সম্মান করা মানে সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়া।
আলোর পাঠশালাকে অন্ধকারের কটাক্ষ থেকে রক্ষা করা আজ আমাদের সবার দায়িত্ব। রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে, সমাজের দায়িত্ব আছে এবং প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব আছে। কারণ একজন শিক্ষকই পারেন একটি শিশুর হাত ধরে একটি পরিবারকে বদলে দিতে। একটি পরিবার থেকে একটি সমাজকে। আর একটি সমাজ থেকেই জন্ম নেয় আলোকিত, মানবিক ও সমৃদ্ধ জাতি।
শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
আপনার মতামত লিখুন :