
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মানসম্মত শিক্ষা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে। কিন্তু ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। এ ব্যর্থতার কারণ কী? শুধু কি শিক্ষার্থীদের অপ্রস্তুতি দায়ী? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিখনঘাটতি, শিক্ষকসংকট ও প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা? মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা কি খাপ খাওয়াতে পেরেছে? এসব প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এবারের ফলাফল শুধু পাস-ফেলের হিসাব নয়। এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছে। তাই শিক্ষার মান, পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকার এসডিজি-৪ অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা জরুরি।
২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি দেখা গেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন। অথচ ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। এবার প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পরীক্ষার ফলেও অবনতি ঘটেছে। এ বছর পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ কমেছে ১৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ২৫০ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ২৬৮ জন। ২ হাজার ৭০৯টি প্রতিষ্ঠানের ৪৬০টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫৪ হাজার ৫৪৭ জন শিক্ষার্থী।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং বরিশাল বোর্ডে মাত্র ৪৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ইংরেজিতে মাত্র একটি বোর্ডে পাসের হার ৭০ শতাংশের ওপরে। পাঁচটি বোর্ডে তা ৬০ শতাংশের নিচে। আটটি সাধারণ বোর্ডের ভারিত গড় হিসাবে ইংরেজিতে পাসের হার ৬৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ, আইসিটিতে ৭২ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং হিসাববিজ্ঞানে ৭৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বিপরীতে পদার্থবিজ্ঞানে পাসের হার ৯০ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং বাংলায় ৮৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
এবার ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। গত বছরের তুলনায় এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। অন্যদিকে ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাসের সাফল্য অর্জন করেছে। এই বৈপরীত্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার মান ও সুযোগের বড় ব্যবধান নির্দেশ করে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার চতুর্থ লক্ষ্য বা এসডিজি-৪ হলো ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা। এর ৪.১ নম্বর লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের কার্যকর শিখনফল অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের ২০২৫ সালের স্বেচ্ছামূলক জাতীয় পর্যালোচনা (ভিএনআর) প্রতিবেদনে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার ও লিঙ্গসমতায় অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে। তবে মাধ্যমিকের শেষ পর্যায়ে গণিতে ন্যূনতম দক্ষতা অর্জনকারী শিক্ষার্থীর হার ২০২৩ সালের মূল্যায়নে মাত্র ২৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ হওয়া এসডিজি-৪ অর্জনের ইতিবাচক প্রমাণ নয়। এইচএসসি ফলাফল দিয়ে এসডিজি-৪-এর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব না হলেও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দুর্বলতা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত দেয়। শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো যথেষ্ট নয়, শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করাও জরুরি।
এবারের ফলাফল বিশ্লেষণে উত্তরপত্র মূল্যায়নে প্রশ্নভিত্তিক নমুনা উত্তর ও নির্ধারিত নম্বর বণ্টন নির্দেশিকা বা রুব্রিক্সের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রুব্রিক্স এমন একটি মানদণ্ডভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি, যেখানে উত্তরের প্রয়োজনীয় উপাদান, জ্ঞান ও দক্ষতার স্তর এবং নম্বর প্রদানের নির্দেশনা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। এতে পরীক্ষকদের ব্যক্তিনির্ভরতা কমে এবং মূল্যায়নে সামঞ্জস্য বাড়ে।
দীর্ঘদিন ধরে উত্তরপত্র মূল্যায়নে উদারতা, পরীক্ষকের ব্যক্তিগত বিবেচনা কিংবা ব্যবহারিক পরীক্ষায় যথাযথ দক্ষতা যাচাই ছাড়াই নম্বর প্রদানের প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে মূল্যায়নের ফলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি অধিক স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তবে রুব্রিক্স শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি ও মূল্যায়ন পদ্ধতির দুর্বলতা চিহ্নিত করার একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। এটি শিক্ষার প্রকৃত মান বুঝতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন হলো, শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের মানদণ্ডভিত্তিক মূল্যায়নের উপযোগী করে গড়ে তুলতে না পারলে হঠাৎ কঠোর মূল্যায়নের প্রভাব কতটা প্রত্যাশিত হবে? মূল্যায়নের পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠদান ও শিক্ষার্থীর প্রস্তুতির সামঞ্জস্য না থাকলে ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তেই পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মতে, ইংরেজি, হিসাববিজ্ঞান ও আইসিটি দক্ষতানির্ভর বিষয়। মাধ্যমিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত মানসম্মত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিনের শিখনঘাটতি নিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে আসে। শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ এবং প্রয়োজনীয় ল্যাব ও সরঞ্জামের অভাব বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতাও এ বক্তব্যকে সমর্থন করে। মুখস্থনির্ভর পাঠদান, পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি, অনিয়মিত উপস্থিতি এবং কোচিংনির্ভর শিক্ষাসংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান অর্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। ইংরেজিতে শব্দভান্ডার ও ভাষা ব্যবহারের অনভ্যাস, আইসিটিসহ বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলোর হাতে-কলমে কাজের সুযোগের অভাব এবং হিসাববিজ্ঞানে ধারণাগত দুর্বলতা সমস্যাকে আরও গভীর করেছে।
শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয়, অভিভাবকের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব ও পড়াশোনায় অনাগ্রহও সম্ভাব্য কারণ। তবে এসব কারণের প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে গবেষণা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার দায় নির্ধারণের আগে শিক্ষার সুযোগ, পাঠদানের মান এবং প্রস্তুতির পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল, তা বিবেচনা করতে হবে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি, গণিত ও আইসিটিসহ বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলোর শিখনঘাটতি চিহ্নিত করে বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালু করতে হবে। বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যমান শিক্ষকদের কার্যকর প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত ডিজিটাল ল্যাব এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ধারাবাহিক ও গাঠনিক মূল্যায়ন বা ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্ট চালু রাখতে হবে। শিক্ষকদের রুব্রিক্স প্রণয়ন ও প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারে। বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা, যুক্তি বিশ্লেষণ, নিজের ভাষায় উত্তর লেখা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
এইচএসসি ২০২৬-এর ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। শিক্ষার্থীদের ফলাফলের পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই সবার দায়িত্ব বিবেচনা করা প্রয়োজন। আধুনিক মূল্যায়ন পদ্ধতির পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নে দক্ষ শিক্ষক, মানসম্মত পাঠদান, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ এবং প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষার সাফল্য জিপিএ-৫ ও পাসের হারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। একজন শিক্ষার্থী কতটা বুঝতে পারে, কতটা বিশ্লেষণ করতে পারে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে, সেটিই শিক্ষার প্রকৃত মূল্যায়ন। এসডিজি-৪ অর্জনের পথে বাংলাদেশকে তাই সনদনির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতা ও শিখনফলনির্ভর শিক্ষায় রূপান্তরিত হতে হবে। ফলে সনদের সংখ্যা বাড়বে, পাশাপাশি জ্ঞানের আলোও সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছাবে।
লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
আপনার মতামত লিখুন :