
প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সড়কজুড়ে শুরু হয় মানুষের নিরন্তর ছুটে চলা। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, প্রবীণ, রোগী ও শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করেন। গণপরিবহন সবার। এখানে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই সমান যাত্রী। গণপরিবহন শুধু একটি যানবাহন নয়। এটি নাগরিক জীবনের স্পন্দন। অর্থনীতির চলমান চাকা। সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই এটি একটি যৌথ নাগরিক পরিসর। কিন্তু সেই পরিসরেই প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে শৃঙ্খলা ও আইন। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, সড়ক নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। এখানে আইন, শৃঙ্খলা ও নাগরিক অধিকার রক্ষা সবার দায়িত্ব।
চলন্ত গণপরিবহনে চালক, সহকারী কিংবা কিছু যাত্রীর নির্বিচার ধূমপান এখন যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চলন্ত গাড়িতে জ্বলে ওঠে সিগারেট। মুহূর্তেই বিষাক্ত ধোঁয়া আর দুর্গন্ধ ছেয়ে যায় পুরো পরিবেশ। সেই ধোঁয়া নীরবে আঘাত হানে প্রতিটি নিরীহ যাত্রীর ফুসফুসে। একই সঙ্গে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা। নাগরিক অধিকারও হয়ে উঠছে উপেক্ষিত।
সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধূমপানবিরোধী সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে। অনেক যাত্রী এখন বাস বা ট্রেনে ধূমপান থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশেষ করে লোকাল বাস, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য ছোট গণপরিবহনে এখনও অনেক চালক ও সহকারী নির্বিঘ্নে সিগারেট জ্বালিয়ে গাড়ি চালান। অনেক সময় কিছু যাত্রীও সংকীর্ণ পরিবেশে ধূমপান করেন। এর ফলে ধূমপান না করা নিরীহ যাত্রীরা বাধ্য হয়ে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এক হাতে স্টিয়ারিং আর অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে গাড়ি চালানো কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় নয়, বরং সম্ভাব্য সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ।
বাংলাদেশে গণপরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ এবং পরবর্তী সংশোধনী অনুযায়ী সব ধরনের গণপরিবহন শতভাগ ধূমপানমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষিত। আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির বিধানও রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিছু দূরপাল্লার বাস ও ট্রেনে আইন আংশিকভাবে কার্যকর হলেও অধিকাংশ লোকাল পরিবহনে এর কোনো দৃশ্যমান প্রয়োগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে চালকরাই আইন ভঙ্গ করেন। তদারকির অভাবে অপরাধটি যেন নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আইন যখন প্রয়োগের অভাবে কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন নাগরিকের অধিকারও কেবল কাগজেই বন্দি হয়ে যায়।
পরোক্ষ ধূমপান চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এক নীরব ঘাতক। একজন ধূমপায়ী নিজের জন্য যেমন ক্ষতি ডেকে আনেন, তার চেয়েও বড় ক্ষতি করেন আশপাশের নিরীহ মানুষের। সিগারেটের ধোঁয়ায় হাজারো ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে, যার মধ্যে বহু উপাদান ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। একটি বন্ধ জানালার বাস, লেগুনা বা সিএনজির ভেতর এই বিষাক্ত ধোঁয়া মুহূর্তেই ঘনীভূত হয়ে সবার শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে। যারা কখনো সিগারেট স্পর্শও করেননি, তারাও বাধ্য হয়ে সেই বিষাক্ত বাতাস আর দুগন্ধ গ্রহণ করেন। এটি নিছক অসচেতনতা নয়, বরং অন্যের স্বাস্থ্য ও জীবনের প্রতি প্রকাশ্য অবহেলা।
এই ক্ষতির সবচেয়ে বড় শিকার হয় শিশু, গর্ভবতী নারী এবং প্রবীণ মানুষ। একটি শিশুর ফুসফুস এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয়নি। তাই পরোক্ষ ধূমপান তাদের মধ্যে হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস ও নানা শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে এই বিষাক্ত ধোঁয়া গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে, কম ওজনের শিশু জন্ম, অকাল প্রসব কিংবা গর্ভকালীন জটিলতার আশঙ্কা বাড়ায়। অন্যদিকে প্রবীণ, হৃদরোগী কিংবা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত মানুষদের জন্য এই ধোঁয়া তাৎক্ষণিক শারীরিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। তাই গণপরিবহনে ধূমপান কেবল একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অপরাধ।
চালকের ধূমপান সরাসরি সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। আধুনিক পরিবহনবিজ্ঞান এখন ‘দুর্ঘটনা’ শব্দের পরিবর্তে ‘রোডক্র্যাশ’ শব্দটি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়। কারণ অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য। একজন চালক যখন সিগারেট ধরাতে লাইটার ব্যবহার করেন, ছাই ঝাড়েন কিংবা ধোঁয়ার কারণে চোখ সরিয়ে নেন, তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও তার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। মাত্র দুই সেকেন্ডের এই অসাবধানতায় একটি দ্রুতগতির গাড়ি কয়েক দশ মিটার পথ কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় অতিক্রম করে। এমন একটি মুহূর্তই একটি পরিবারের হাসি কেড়ে নিয়ে আজীবনের কান্নায় পরিণত করতে পারে। তাই স্টিয়ারিং হাতে সিগারেট শুধু একটি অভ্যাস নয়, এটি একটি বিপজ্জনক ঝুঁকি।
সমস্যার আরেকটি বেদনাদায়ক দিক হলো সামাজিক আচরণের অবক্ষয়। কোনো সচেতন যাত্রী যখন বিনয়ের সঙ্গে ধূমপান বন্ধ করার অনুরোধ করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে ধূমপায়ীর কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা নয়, বরং রূঢ়তা, তর্ক কিংবা অপমানজনক আচরণই ফিরে আসে। কখনও চালক ক্ষুব্ধ হয়ে যান, কখনও সহকারী অশোভন ভাষা ব্যবহার করেন। কখনও প্রতিবাদকারী যাত্রীকে ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও ঘটে। এই মানসিকতা আমাদের সামাজিক সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের ঘাটতিকেই প্রকাশ করে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, পরিবহন শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, প্রতিটি গণপরিবহনে দৃশ্যমান ধূমপানবিরোধী সতর্কবার্তা, অভিযোগ গ্রহণের সহজ ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। যাত্রীদেরও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভদ্র কিন্তু দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেওয়া এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত আসক্তি সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার বৈধতা পায় না। একটি জ্বলন্ত সিগারেট যেমন অসংখ্য মানুষের ফুসফুসে বিষ ছড়িয়ে দেয়, তেমনি চালকের হাতে সেই সিগারেট কখনো কখনো বহু প্রাণহানির কারণও হতে পারে। তাই গণপরিবহনকে সত্যিকার অর্থে ধূমপানমুক্ত করা মানে শুধু একটি আইন বাস্তবায়ন নয়, এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষা, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবিক নাগরিক সমাজ গঠনের এক অপরিহার্য অঙ্গীকার। আইন, প্রশাসন, পরিবহন মালিক, চালক এবং সচেতন নাগরিক, সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল উদ্যোগই পারে বিষাক্ত নিঃশ্বাসমুক্ত, নিরাপদ ও সভ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে।
লেখকঃ শিক্ষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট
আপনার মতামত লিখুন :