শিক্ষক উৎকর্ষ সাধনে সিলেট সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ : ফয়সল আহমদ বাবুল


sylnews24 প্রকাশের সময় : জুন ২২, ২০২৬, ৬:৩৮ পূর্বাহ্ন /
শিক্ষক উৎকর্ষ সাধনে সিলেট সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ : ফয়সল আহমদ বাবুল

শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করে। একটি জাতির অগ্রগতি নির্ভর করে তার শিক্ষার মানের ওপর। আর সেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ গঠনের দিকনির্দেশক। তাই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক প্রশিক্ষণকে শিক্ষার মানোন্নয়নের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বাস্তব প্রেক্ষাপটে সিলেট সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিক্ষা উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

সিলেট অঞ্চলে একটি সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দীর্ঘদিনের। এ অঞ্চলের শিক্ষার সম্ভাবনা থাকলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি ছিল একটি বড় সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে সরকার ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে দেশের তিনটি স্থানে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়, যার মধ্যে সিলেট অন্যতম। এটি ছিল দেশের শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ শিক্ষক তৈরির পথ সুগম হয় এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপিত হয়।

শিক্ষা উন্নয়নের এই মহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০০১ সালের মার্চ মাসে সিলেট শহরের পূর্ব শাহী ঈদগাহ এলাকায় প্রায় তিন একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। এটি ছিল শিক্ষা উন্নয়নের একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক প্রশিক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই বছরের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই মুহূর্তটি সিলেটের শিক্ষার ইতিহাসে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করে। ধীরে ধীরে স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে। পরবর্তীতে ২০০৫ সালের ২ জুলাই কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। এরপর ১৩ জুলাই ২০০৫ সালে তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে কলেজটির উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে শিক্ষক প্রশিক্ষণের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

বর্তমানে সিলেট সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ শিক্ষকদের শিক্ষার বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এখানে বিভিন্ন একাডেমিক ও পেশাগত কোর্স চালু রয়েছে। এক বছর মেয়াদী বিএড কোর্স শিক্ষক প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম। এছাড়া চার বছর মেয়াদী বিএড (সম্মান) কোর্স শিক্ষার্থীদের পেশাগত ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরিতে এক বছর মেয়াদী এমএড কোর্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেও বিএড (প্রফেশনাল) ও এমএড কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। কর্মজীবী শিক্ষকদের জন্য এসব কোর্স অত্যন্ত কার্যকর। পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষকদের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থায় সমন্বিত ও আধুনিক ধারা তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে লেইস প্রকল্পের আওতায় নবীন ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জন্য ৫৬ দিন এবং ৪২ দিনব্যাপী আবাসিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এসব প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণ কৌশল ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

এই কলেজের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষ, আধুনিক ও পেশাগতভাবে যোগ্য শিক্ষক তৈরি করা। এখানে শিক্ষার্থীদের শিক্ষণ পদ্ধতি, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন কৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা, অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষণ পদ্ধতি এখানে নিয়মিত অনুশীলন করা হয়। ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা বাস্তব শ্রেণিকক্ষে আরও কার্যকরভাবে পাঠদান করতে সক্ষম হন এবং শিক্ষার্থীদের শেখার মান উন্নত করতে ভূমিকা রাখেন।

গবেষণা অনুযায়ী, শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষিত শিক্ষক শিক্ষার্থীর শেখার মান উন্নত করেন। তিনি শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিক্ষণ পরিবেশ তৈরি করেন। ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষার্থীর সাফল্যের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের শিক্ষকই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। শিক্ষকের প্রভাব শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফলে সরাসরি প্রতিফলিত হয়। শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সিলেট সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি শুধু একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়। এটি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি কৌশলগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ মানসম্মত শিক্ষক তৈরিকে শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নীতির আলোকে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক শিক্ষণ কৌশল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাচ সফলভাবে স্নাতক সম্পন্ন করেছে। তারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছে। তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষা ও গবেষণায় অবদান রাখছে। এটি প্রমাণ করে যে এই কলেজ শুধু প্রশিক্ষণ দেয় না, বরং দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করে, যারা দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা এবং পেশাগত উন্নয়নমূলক কার্যক্রম শিক্ষকদের নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করছে, যা শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ফলে শিক্ষার সামগ্রিক মান উন্নত হচ্ছে।

সিলেট সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এটি দক্ষ শিক্ষক তৈরির মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়নে অবদান রাখছে। এর মাধ্যমে গড়ে উঠছে একটি যোগ্য মানবসম্পদ। এই মানবসম্পদ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। শিক্ষা খাতে এর প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রতিষ্ঠানটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণেও ভূমিকা রাখছে। এটি শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়ন করছে এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতে গবেষণা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠান দেশের শিক্ষা উন্নয়নে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে- এটাই সবার প্রত্যাশা।

লেখকঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সদর, সিলেট।