
পরীক্ষার ফলাফল শুধু কিছু সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে। এর সঙ্গে থাকে পরিবারের আশা এবং শিক্ষকের পরিশ্রম। একই সঙ্গে একটি ফলাফল শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য ও দুর্বলতার কথাও জানায়। তাই এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের দিন শুধু আনন্দ বা হতাশার দিন নয়। এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ফিরে তাকানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ২০২৬ সালের ফলাফল আমাদের সামনে সেই সুযোগ আরও স্পষ্টভাবে এনে দিয়েছে।
এবারের ফলাফলে উল্লাসের চেয়ে আত্মসমালোচনার জায়গাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১১টি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৬৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে পাসের হার কমেছে ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২। অর্থাৎ সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা গত বছরের ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশের তুলনায় ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
পাসের হার কমেছে বলে শুধু প্রশ্নপত্র কঠিন ছিল বা শিক্ষার্থীরা ভালো করতে পারেনি, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। এর পেছনে আরও কিছু কারণ থাকতে পারে। শিক্ষার বিষয়টি তাই গভীরভাবে দেখা প্রয়োজন। এসডিজি ৪-এর লক্ষ্যও শুধু পরীক্ষায় বেশি শিক্ষার্থীকে পাস করানো নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যেন বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৬ সালের ফলাফলের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো, আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে কিছু মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছরের ৯৮৪ থেকে কমে হয়েছে ৬৬৯। একই সময়ে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩১২। এই দুটি সংখ্যা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠান কমে যাওয়া এবং শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়ে যাওয়া দেখায় যে জাতীয় গড় দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার বৈচিত্র্য বোঝা যায় না। কোথাও ফল ভালো, কোথাও মাঝারি, আবার কোথাও পুরো ব্যাচই ব্যর্থ। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, একই রাষ্ট্রের একই শিক্ষাক্রমের অধীনে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগে এত বড় পার্থক্য কেন? এখানেই এসডিজি ৪-এর অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি সামনে আসে।
শিক্ষার মান পরিমাপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো পরীক্ষার ফলাফলকে শিক্ষার সমার্থক মনে করা। একটি শিক্ষার্থী পাস করেছে মানেই সে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছে, এমনটি বলা যায় না। আবার কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি মানেই তার মেধা নেই, তাও সত্য নয়।
এসডিজি ৪.১-এর লক্ষ্য স্পষ্ট। শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর শিখনফল অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের এসডিজি ট্র্যাকারেও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়া ও গণিতে ন্যূনতম দক্ষতা অর্জনকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্ন হওয়া উচিত, একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল, তার পাশাপাশি সে কী শিখল। সে কি একটি সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারে? যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে? নিজের ভাষায় একটি ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারে? গণিতকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে? ইংরেজিতে মৌলিক যোগাযোগ করতে পারে? বিজ্ঞানকে শুধু মুখস্থ না করে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ধারণ করবে।
২০২৬ সালের ফলাফলে বিষয়ভিত্তিক একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্রও সামনে এসেছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সাতটিতে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে। ময়মনসিংহে ইংরেজির পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, সিলেটে ৬৯ দশমিক ১১ শতাংশ এবং বরিশালে ৬৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বিপরীতে কুমিল্লায় ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশ ও ঢাকায় ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করেছে। আটটি বোর্ডেই ইংরেজির ফল বাংলা ও গণিতের তুলনায় দুর্বল ছিল। এটি নিছক একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহার, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এখানে শিক্ষার্থীদের দায়ী করার আগে আমাদের জানতে হবে, তারা পর্যাপ্ত সময়, দক্ষ শিক্ষক, অনুশীলনের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়েছে কি না।
২০২৬ সালের ফলাফলের একটি উজ্জ্বল দিক হলো মেয়েদের সাফল্য। সামগ্রিকভাবে ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ মেয়েরা পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে ৮ দশমিক ৮২ শতাংশীয় পয়েন্ট এগিয়ে। জিপিএ-৫ অর্জনেও মেয়েরা এগিয়ে। ছাত্রীদের মধ্যে ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, যেখানে ছাত্রদের সংখ্যা ৫২ হাজার ৭৮০। এটি বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু এর আরেকটি দিকও রয়েছে। ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ নিয়ে এখন গবেষণা দরকার। বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহের পরিবর্তন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন কিংবা কৈশোরকালীন আচরণগত পরিবর্তন এর পেছনে কতটা ভূমিকা রাখছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নারীর সাফল্যে আমরা যেমন আনন্দিত হব, তেমনি ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণও অনুসন্ধান করব। কারণ এসডিজি ৪-এর লক্ষ্য প্রতিযোগিতা নয়, সমতা।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশেষভাবে উদ্বেগের। ২০২৬ সালে এই বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২২ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৮২ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৬ দশমিক শূন্য ৬, ২০২৪ সালে ৭৩ দশমিক শূন্য ৫ এবং ২০২৫ সালে ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, সেখানে এবার তা নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, বোর্ড কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ইংরেজি ও গণিতে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে এবং মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ব্যর্থতা বেশি। সিলেটের এই ফলাফলকে শুধু একটি বোর্ডের ফল হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি আঞ্চলিক বৈষম্য, শিক্ষকের মান, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, অভিভাবকীয় সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি শিখনঘাটতি নিয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
একই মেধা ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ফল তৈরি করতে পারে। শহরের একটি শিক্ষার্থী যেখানে দক্ষ শিক্ষক, কোচিং, ইন্টারনেট, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি ও নানা ধরনের শিক্ষাসহায়তা পায়, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীর কাছে হয়তো একটি পাঠ্যবই এবং একজন শিক্ষকই প্রধান অবলম্বন। এই পার্থক্যকে আমরা অনেক সময় মেধার পার্থক্য বলে ভুল করি। জাতিসংঘের এসডিজি ৪-এর বৈশ্বিক অগ্রগতি প্রতিবেদনও দেখিয়েছে যে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান ও সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে গভীর বৈষম্য রয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ও অবকাঠামোগত ব্যবধান কমানো জরুরি। তাই প্রত্যন্ত বিদ্যালয়ে শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না। সেখানে দক্ষ শিক্ষক রাখতে হবে, ইন্টারনেট দিতে হবে, বিজ্ঞানাগার কার্যকর করতে হবে, পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
২০২৬ সালের ফলাফলে মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষার ফলও আমাদের নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ। এই ফলাফল দেখিয়ে দেয়, কোনো একটি ধারাকে আলাদা করে বিচার না করে পুরো মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে। এসডিজি ৪.৩ ও ৪.৪ কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও কর্মমুখী দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাই কারিগরি শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে বিচার না করে শ্রমবাজারের সঙ্গে এর সংযোগ কতটা কার্যকর, তা দেখতে হবে। একইভাবে মাদরাসা শিক্ষায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি, তথ্যপ্রযুক্তি ও জীবনমুখী দক্ষতার সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
শিক্ষার মান উন্নয়নের যেকোনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষককে রাখতে হবে। প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়, প্রযুক্তি একজন দক্ষ শিক্ষকের কাজকে আরও কার্যকর করতে পারে। এসডিজি ৪.সি-এর লক্ষ্যও প্রশিক্ষিত ও যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষণেও দক্ষ শিক্ষক ও পর্যাপ্ত শিক্ষা-সুবিধাকে মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই শুধু শিক্ষক নিয়োগ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, সহকর্মীভিত্তিক শেখা এবং প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ শিক্ষণপদ্ধতির সুযোগ দিতে হবে।
আমাদের সমাজে জিপিএ-৫ অনেক সময় শিক্ষার চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। অথচ ২০২৬ সালের ফলাফল আমাদের মনে করিয়ে দিল, জিপিএ-৫ কমে গেলেই শিক্ষা শেষ হয়ে যায় না, আবার জিপিএ-৫ বেড়ে গেলেই শিক্ষার মান বেড়ে যায় না। একজন শিক্ষার্থী হয়তো জিপিএ-৫ পায়নি, কিন্তু সে হয়তো অসাধারণ সৃজনশীল, ভালো সংগঠক, দক্ষ কারিগর বা ভবিষ্যতের উদ্যোক্তা। অন্যদিকে একজন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী বাস্তব সমস্যার সমাধানে দুর্বল হতে পারে। তাই ফলাফলকে সম্মান করতে হবে, কিন্তু ফলাফলকে মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় বানানো যাবে না।
২০২৬ সালের ফলাফল থেকে কয়েকটি সুস্পষ্ট শিক্ষা নেওয়া যায়।প্রথমত, জাতীয় পর্যায়ে শুধু পাসের হার নয়, শিখনফলভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক সহায়ক শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, দুর্বল ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কারণভিত্তিক বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। চতুর্থত, গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় দক্ষ শিক্ষক ধরে রাখতে বিশেষ প্রণোদনা প্রয়োজন। পঞ্চমত, মেয়েদের সাফল্যের পাশাপাশি ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ নিয়ে গবেষণা করতে হবে। ষষ্ঠত, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়নের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সপ্তমত, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে বিশ্লেষণ, প্রয়োগ, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সবশেষে, শিক্ষার বাজেট শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নয়, শিক্ষক উন্নয়ন, শিক্ষার্থীর সহায়তা, ডিজিটাল সুবিধা, গবেষণা ও শিখনঘাটতি পূরণেও বিনিয়োগ করতে হবে।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফলাফল আমাদের সামনে আনন্দের চেয়ে বড় একটি দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ পাসের হারকে ব্যর্থতা বলে বাতিল করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি এটিকে স্বাভাবিক ফল হিসেবেও মেনে নেওয়া যাবে না। কারণ এই সংখ্যার পেছনে রয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার বাস্তবতা। আবার মেয়েদের অগ্রগতি, কিছু প্রতিষ্ঠানের ভালো ফল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্ভাবনাও আমাদের আশাবাদী করে। শিক্ষার আসল সাফল্য তখনই, যখন একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধকতা কিংবা প্রতিষ্ঠানের অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে না। প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থী এবং রাজধানীর শিক্ষার্থী একই মানের শেখার সুযোগ পাবে। মাদরাসার শিক্ষার্থী, সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থী ও কারিগরি শিক্ষার্থী প্রত্যেকে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এসডিজি ৪ আমাদের সেই পথই দেখায়। শিক্ষা হবে সবার জন্য, মান হবে সবার জন্য এবং সুযোগও হবে সবার জন্য।
তাই ২০২৬ সালের ফলাফলকে শুধু ফলাফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি সতর্কবার্তা, একটি আয়না এবং একই সঙ্গে একটি সুযোগ। এখন প্রয়োজন সংখ্যার সাফল্যের চেয়ে শিখনের সাফল্যকে বড় করে দেখা। জিপিএ-৫-এর উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি শিখনঘাটতির নীরব কান্নাও শুনতে হবে। কারণ একটি দেশের প্রকৃত মেধা শুধু পরীক্ষার ফলাফলে প্রকাশ পায় না। মানুষের চিন্তা, দক্ষতা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধের মধ্যেও তার মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। সেই শিক্ষাব্যবস্থাই আমাদের প্রয়োজন, যেখানে কোনো শিশু পিছিয়ে থাকবে না এবং কোনো মেধা সুযোগের অভাবে হারিয়ে যাবে না। তখনই এসএসসির একটি ফলাফল শুধু পরীক্ষার ফল থাকবে না, হয়ে উঠবে একটি সমতাভিত্তিক, দক্ষ ও মানবিক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সনদ।
লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
আপনার মতামত লিখুন :