
কৃষি মানবসভ্যতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মানুষের খাদ্য কৃষি থেকে আসে। পশুর খাদ্যও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি মানুষের জীবিকার বড় উৎস। শিল্পের অনেক কাঁচামালও কৃষি থেকে পাওয়া যায়। তাই কৃষি শুধু অর্থনৈতিক কাজ নয়। এটি মানুষের জীবন ও সভ্যতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ইসলাম কৃষিকে একটি মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে দেখেছে। কুরআনে বারবার ফসল, ফল, বাগান, পানি, মাটি ও পশুর কথা বলা হয়েছে। এসবের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে বলা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কৃষিকাজে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি জমি আবাদ করতে বলেছেন। বৃক্ষরোপণকে সদকা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। প্রাণীর প্রতি দয়া করতে বলেছেন। পরিবেশ রক্ষারও শিক্ষা দিয়েছেন। মহানবী (সা.) আধুনিক কৃষির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেননি। তিনি কৃষির নৈতিক ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন। জমি আবাদ, বৃক্ষরোপণ, প্রাণিসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনকল্যাণের প্রতি মানুষকে দায়িত্বশীল করেছেন। তাঁর শিক্ষা আজকের টেকসই কৃষি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাণিকল্যাণের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে।
কুরআনে কৃষির জন্য পানির গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সূরা আন-নাহলের ১০ ও ১১ নম্বর আয়াতে বৃষ্টির পানির কথা বলা হয়েছে। এই পানি দিয়ে শস্য ও নানা উদ্ভিদ জন্মায়। জলপাই, খেজুর ও আঙুরের মতো ফলও উৎপন্ন হয়। সূরা আবাসায়ও কৃষির একটি সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে বৃষ্টি, মাটি, শস্য, আঙুর, শাকসবজি, জলপাই, খেজুর ও উদ্যানের কথা বলা হয়েছে। পশুর খাদ্যের কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, কৃষি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। যাতে পানি আছে, মাটি আছে, উদ্ভিদ আছে, মানুষ আছে এবং প্রাণীও আছে। সবাই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। মহানবী (সা.) জমি অনাবাদি রেখে দিতে নিরুৎসাহিত করেছেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, যার জমি আছে সে যেন নিজে তা চাষ করে। অথবা অন্য ভাইকে চাষ করার সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে জমিকে উৎপাদনশীল রাখার শিক্ষা পাওয়া যায়। এ শিক্ষার সামাজিক গুরুত্ব অনেক। জমি পড়ে থাকলে খাদ্য উৎপাদন কমে, কর্মসংস্থান কমে ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও কমে। কিন্তু জমি আবাদ করলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ে, মানুষের জীবিকা তৈরি হয় এবং সমাজ উপকৃত হয়।
মহানবী (সা.) কৃষকের শ্রমকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, মানুষের পাশাপাশি পাখি ও প্রাণী গাছ বা ফসলের ফল ভোগ করলে কৃষকও সদকার সওয়াব লাভ করেন। সেখানে কৃষি ও বৃক্ষরোপণকে কল্যাণকর কাজ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কৃষকের উৎপাদিত খাদ্য শুধু মানুষের উপকার করে না। তা পাখি ও পশুরও উপকার করে। এ শিক্ষা অত্যন্ত মানবিক। কৃষকের শ্রমের মূল্য শুধু বাজারদর দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। কৃষক মানুষের খাদ্য জোগান দেন। তিনি সমাজকে বাঁচিয়ে রাখেন। তাঁর উৎপাদন প্রাণিজগতেরও উপকার করে। আধুনিক বিজ্ঞানও কৃষিকে একটি বহুমাত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখে। কৃষির সঙ্গে মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও প্রাণিজগতের সম্পর্ক রয়েছে। তাই টেকসই কৃষিতে উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাও জরুরি।
ফলচাষ ইসলামী কৃষিচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুরআনে খেজুর ও আঙুরের বাগানের কথা এসেছে। সূরা আল-মুমিনূনের ১৯ নম্বর আয়াতে খেজুর ও আঙুরের বাগানের কথা বলা হয়েছে। এসব বাগানে মানুষের জন্য প্রচুর ফল উৎপন্ন হয়। মদিনার কৃষিজীবনে খেজুরবাগানের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। মহানবী (সা.) খেজুরগাছ ও বাগানের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর যুগে খেজুর ছিল খাদ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলদ গাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি দীর্ঘদিন উৎপাদন দেয়। একটি গাছ বহু বছর ধরে ফল দিতে পারে। এর ছায়া পাওয়া যায়। পাখি আশ্রয় পায়। মাটিতেও জৈব পদার্থ যোগ হয়। আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানও ফলদ বৃক্ষকে টেকসই কৃষির গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করে। ফলের বাগান মানুষের পুষ্টি বাড়ায়। কৃষকের আয় বাড়ায়। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। পরিবেশের ভারসাম্যেও ভূমিকা রাখে।
কুরআনে ফুলচাষের আধুনিক বাণিজ্যিক পদ্ধতি সরাসরি বলা হয়নি। তবে বিভিন্ন উদ্ভিদের বৈচিত্র্যের কথা বলা হয়েছে। শস্য, ঘাস, ফল, বাগান ও বৃক্ষের কথা কুরআনে এসেছে। ফুল শুধু সৌন্দর্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। কৃষির জন্যও এর গুরুত্ব আছে। ফুলের মাধ্যমে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী আকৃষ্ট হয়। তারা পরাগায়নে সাহায্য করে। ফলে অনেক ফল, সবজি ও বীজ উৎপন্ন হয়। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী, অনেক খাদ্যশস্য ও উদ্ভিদের উৎপাদনে পরাগায়নকারী প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মৌমাছি এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফুল, মৌমাছি, ফল ও ফসল একটি বড় জীবব্যবস্থার অংশ। এ কারণে কৃষিতে উদ্ভিদ বৈচিত্র্য রক্ষা জরুরি। শুধু একটি ফসলের ওপর নির্ভর করলে ঝুঁকি বাড়ে। বিভিন্ন ফসল ও উদ্ভিদ থাকলে কৃষি ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হয়।
বৃক্ষরোপণের বিষয়ে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিহ মুসলিমে এসেছে, কোনো মুসলিম গাছ লাগালে গাছের ফল মানুষ বা প্রাণী খেলে রোপণকারীর জন্য সদকা হয়। এই শিক্ষা বৃক্ষরোপণকে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একটি গাছ আজ লাগানো হলো। কিন্তু এর সুফল বহু বছর পাওয়া যায়। মানুষ ফল পায়, পাখি খাদ্য পায়, প্রাণী আশ্রয় পায় ও মানুষ ছায়া পায়। মহানবী (সা.) মদিনাকে পবিত্র এলাকা ঘোষণা করেছিলেন। সেখানে গাছ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞাও ছিল। এর মাধ্যমে বৃক্ষ ও পরিবেশ সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক বিজ্ঞানও গাছের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। গাছ মাটির ক্ষয় কমাতে সাহায্য করে, মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে, পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় তৈরি করে। কৃষিবনায়ন বা অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি আধুনিক কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এতে একই ব্যবস্থায় গাছ, ফসল ও কখনো পশু পালন করা হয়। এতে কৃষকের আয় বাড়তে পারে। পরিবেশের ওপর চাপও কমতে পারে।
কুরআনে গবাদিপশুর কথা বহুবার এসেছে। পশু মানুষের খাদ্য দেয়, দুধ দেয়, চামড়া ও পশম দেয় এবং পরিবহনে সাহায্য করে। কৃষিকাজেও পশু ব্যবহৃত হয়েছে। মহানবী (সা.) পশুর প্রতি দয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন। এক বর্ণনায় একটি দুর্বল উট দেখে তিনি তার মালিককে সতর্ক করেন। তিনি প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে বলেন। অন্য বর্ণনাতেও পশুর প্রতি অতিরিক্ত বোঝা চাপানো ও কষ্ট দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পশুর খাদ্য, বিশ্রাম ও যত্নের গুরুত্ব বোঝা যায়। আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞানও একই ধরনের বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। সুস্থ পশুর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য দরকারন, পরিষ্কার পানি দরকার, নিরাপদ পরিবেশ দরকার, বিশ্রাম দরকার এবং রোগ হলে চিকিৎসা দরকার। পাখির প্রতিও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক। কোনো প্রাণীকে খাবার বা পানি দেওয়া সওয়াবের কাজ হিসেবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এতে প্রাণীর প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।
কৃষির জন্য পানি অপরিহার্য। কুরআনে বৃষ্টিকে আল্লাহর বড় নিয়ামত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশ করে, উদ্ভিদ জন্মায়, শস্য উৎপন্ন হয় এবং মানুষ ও প্রাণী খাদ্য পায়। আধুনিক কৃষিতে পানির ব্যবহার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত সেচ পানির অপচয় করে। আবার পানির অভাবে ফলন কমে যায়। তাই পানি সঠিকভাবে ব্যবহার করা জরুরি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। সেচে পানি সাশ্রয় করা যেতে পারে। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার ব্যবস্থা করা যায়। এসব পদ্ধতি টেকসই কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী কৃষিচিন্তায় অনাবাদি জমি আবাদ করার গুরুত্ব রয়েছে। মুআত্তা ইমাম মালিকে মহানবী (সা.)-এর নামে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি অনাবাদি জমি পুনরুজ্জীবিত করে সে তার অধিকার পেতে পারে। এখানে জমিকে উৎপাদনশীল সম্পদ হিসেবে দেখার শিক্ষা রয়েছে। অনাবাদি জমি আবাদ করলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ে। মানুষের কর্মসংস্থান হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ে। তবে বর্তমান সময়ে জমির মালিকানা ও ব্যবহার অবশ্যই রাষ্ট্রীয় আইন মেনে করতে হবে। পরিবেশগত বিধিও মানতে হবে।
আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান এখন সমন্বিত কৃষির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। মাটি, পানি, গাছ, প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার-এর মতে, অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। গাছ মাটির ক্ষয় কমাতে পারে। পানি সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে। জীববৈচিত্র্য বাড়াতে পারে। কৃষকের আয়ও বৈচিত্র্যময় করতে পারে। এই ধারণার সঙ্গে ইসলামী কৃষিচিন্তার মিল রয়েছে। ইসলাম বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিয়েছে। প্রাণীর প্রতি দয়া করতে বলেছে। জমি আবাদে উৎসাহ দিয়েছে। পানি ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিক্ষা দিয়েছে। তবে ধর্মীয় বক্তব্যকে বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কুরআন ও হাদিস কৃষিকে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করে কৃষির একটি আদর্শ ভিত্তি তৈরি করেছে। আধুনিক বিজ্ঞান সেই ভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেক কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করেছে। ইসলামে বৃক্ষরোপণ কল্যাণকর। বিজ্ঞান দেখিয়েছে, গাছ মাটি ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে প্রাণীর প্রতি দয়া করতে বলা হয়েছে। বিজ্ঞান দেখিয়েছে, প্রাণীর কল্যাণ তার স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত।
কৃষিতে মহানবী (সা.)-এর অবদান ছিল বহুমাত্রিক। তিনি জমি আবাদে উৎসাহ দিয়েছেন। বীজ বপন ও বৃক্ষরোপণকে সদকার মর্যাদা দিয়েছেন। ফলদ বাগানের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। প্রাণীর প্রতি দয়া করতে বলেছেন। পরিবেশ ও বৃক্ষ সংরক্ষণের নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। কুরআন মানুষকে শস্য, ফল, পানি, উদ্ভিদ ও প্রাণীর দিকে তাকাতে বলেছে। সুন্নাহ এসব বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ শিখিয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান দেখিয়েছে, টেকসই কৃষির জন্য মাটি, পানি, গাছ, প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তাই মহানবী (সা.)-এর কৃষিদর্শন শুধু অতীতের জন্য নয়। বর্তমান পৃথিবীর জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তন বাড়ছে, মাটির উর্বরতা কমছে, পানির সংকট বাড়ছে, জীববৈচিত্র্য কমছে এবং খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়ছে। এ অবস্থায় ইসলামের কৃষিচিন্তা আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়। জমি আবাদ করতে হবে। গাছ লাগাতে হবে। পানি অপচয় করা যাবে না। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর হওয়া যাবে না। খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। উৎপাদনের সুফল মানুষের পাশাপাশি জীবজগতেরও কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। এই নৈতিকতা ও আধুনিক বিজ্ঞান একসঙ্গে কাজ করলে কৃষি আরও মানবিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হতে পারে।
লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা
সদর, সিলেট।
আপনার মতামত লিখুন :