শিক্ষা উন্নয়নে সহযোগিতা না শাস্তি…! : ফয়সল আহমদ বাবুল


sylnews24 প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২১, ২০২৬, ৩:৪৫ অপরাহ্ন /
শিক্ষা উন্নয়নে সহযোগিতা না শাস্তি…! : ফয়সল আহমদ বাবুল

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর একটি ঘোষণা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থী ফেল করলে শিক্ষকদের শাস্তির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি কঠোর মনে হয়। অনেকের কাছে এটি দৃঢ় অবস্থানও মনে হয়েছে। তবে বিষয়টি একপাক্ষিক কিনা, সেই প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু শ্রেণিকক্ষের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি সমন্বিত কাঠামো। এখানে রাষ্ট্র, প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সবাই জড়িত।

শিক্ষার মান কমে যাওয়ার জন্য শুধু শিক্ষক দায়ী নন। নীতিনির্ধারণী স্তরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা প্রশাসনের ব্যর্থতা বড় একটি কারণ। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক তদারকি নেই। স্বচ্ছতা নেই। পরিকল্পনার ঘাটতি আছে। দুর্নীতি ও অনিয়মও রয়েছে। এসব কারণে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপরও দায় চাপানো হয় শিক্ষকের ওপর। এতে সমস্যার সমাধান হয় না।

শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মানও একটি বড় প্রশ্ন। তাদের আয় অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম। বাড়িভাড়া বা অন্যান্য সুবিধা খুবই সীমিত। বর্তমান বাজারে এই আয়ে টিকে থাকা কঠিন। ফলে তারা মানসিক চাপে থাকেন। অনেকেই অতিরিক্ত আয়ের পথ খোঁজেন। এতে পাঠদানে মনোযোগ কমে যেতে পারে। অথচ তাদের কাছ থেকে শতভাগ ফলাফল আশা করা হয়। এটি বাস্তবসম্মত নয়।

বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়গুলো কঠিন। এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়তি যত্ন দরকার। গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সুযোগ সব জায়গায় নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত উপকরণ নেই। প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। শিক্ষকরা নিজেরাও সবসময় আপডেট থাকার সুযোগ পান না। এতে শিক্ষার মান প্রভাবিত হয়।

শিক্ষার্থীর ফেল করা একক কোনো কারণে ঘটে না। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় বৈষম্য রয়েছে। গ্রামে অনেক প্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধা কম। ল্যাব নেই। মানসম্মত শিক্ষক কম। কারিকুলাম ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় না। তদারকি দুর্বল। ফলে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে।

প্রযুক্তির অপব্যবহারও একটি বড় কারণ। অনেক শিক্ষার্থী মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যমে আসক্ত। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়। সময় নষ্ট হয়। এতে ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অভিভাবকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন স্কুলে পাঠালেই দায়িত্ব শেষ। তারা সন্তানের পড়াশোনা নিয়মিত দেখেন না। খোঁজ নেন না। এতে শিক্ষার্থীর শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যায়। ফলাফল খারাপ হয়।

শিক্ষকদের ওপর একতরফা চাপ সৃষ্টি করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ভয়ের মধ্যে কাজ করলে সৃজনশীলতা কমে যায়। শিক্ষকরা আত্মবিশ্বাস হারান। শিক্ষার পরিবেশ অস্থির হয়। এতে শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমাধান একটাই। সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনতে হবে। দুর্নীতি কমাতে হবে। তদারকি জোরদার করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে। নীতিনির্ধারণে বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে।

শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো জরুরি। তাদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। এতে তারা কাজের প্রতি আগ্রহী হবেন। মনোযোগ দিয়ে পড়াতে পারবেন। শিক্ষার মান উন্নত হবে। শিক্ষক-অভিভাবক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং প্রয়োজন। শিক্ষার্থীর সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। এতে ফেল করার প্রবণতা কমবে। প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষকদের। আধুনিক পদ্ধতিতে পড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখাতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহী হবে।

শিক্ষার মান উন্নয়ন একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। এখানে এককভাবে কাউকে দায়ী করা ঠিক নয়। সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। সমতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। ভয় নয়, উৎসাহ দরকার। তবেই শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক