জ্বালানি সংকট ও অনলাইন শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা : ফয়সল আহমদ বাবুল


sylnews24 প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১, ২০২৬, ৬:১৩ অপরাহ্ন /
জ্বালানি সংকট ও অনলাইন শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা : ফয়সল আহমদ বাবুল

বর্তমান বিশ্ব জ্বালানি সংকটের সঙ্গে মোকাবিলা করছে। এটি শুধু অর্থনীতি নয়, শিক্ষাব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা শিক্ষাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্লেন্ডেড লার্নিং বা মিশ্র শিক্ষা পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন  সশরীরে ক্লাস করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পুরোপুরি অনলাইনে নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের সামাজিক বিকাশে বাধা দিতে পারে। শুধু সশরীরে ক্লাসও বর্তমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে সবসময় সম্ভব নয়। তাই দুটি পদ্ধতির সমন্বয়ই সুষম সমাধান।

ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে পারে। অনলাইনের মাধ্যমে তারা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ পান। ব্যবহারিক বিষয়গুলো সশরীরে শেখা হয়। তাত্ত্বিক বিষয়গুলো অনলাইনে পড়ানো যায়। এতে শিক্ষার মান বজায় থাকে এবং শেখার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়।

অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই। তারা বাসায় বসেই ক্লাসে অংশ নিতে পারে। এতে সময় ও যাতায়াতের ঝামেলা অনেক কমে। প্রথাগত ক্লাসে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হয়ে নোট নিতে হতো। অনলাইনে সেই চাপ কমে। কারণ অনেক লেকচার রেকর্ড করা থাকে। শিক্ষার্থীরা পরে বারবার দেখে বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে পারে।

পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে অনলাইনে ক্লাসে অংশ নেওয়া যায়। এতে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা দূর হয়। দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পায়। অনলাইন ক্লাসে প্রশ্নোত্তরের সুবিধা থাকে। শিক্ষার্থীরা কমেন্ট বা চ্যাটের মাধ্যমে প্রশ্ন করতে পারে। শিক্ষক সেই অনুযায়ী উত্তর দেন। এতে বিষয় বোঝা সহজ হয়।

তবে কিছু সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা আছে। ভালো ইন্টারনেট সংযোগ সব শিক্ষার্থীর কাছে থাকে না। নেটওয়ার্ক সমস্যা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা ডিভাইসের ত্রুটির কারণে ক্লাস ব্যাহত হয়। এতে শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে। সরাসরি যোগাযোগের অভাব শেখার গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের চোখের যোগাযোগ ও তাৎক্ষণিক প্রশ্নোত্তর অনলাইন ক্লাসে সীমিত। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বিষয় ঠিকভাবে বুঝতে পারে না। অনেকেই প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করে।

মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। বাড়ির পরিবেশে বিভ্রান্তি থাকে। মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা পারিবারিক কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ভেঙে দেয়। কেউ কেউ অনলাইনে থাকলেও অন্য কাজে ব্যস্ত থাকে। স্প্লিট স্ক্রিন ব্যবহার করে একাধিক কাজ করা এখন সাধারণ। মূল্যায়নেও সমস্যা দেখা দেয়। শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাজ বা পরীক্ষার উত্তর বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে পারে। কেউ প্রশ্ন না বুঝলেও উত্তর দেয়। এতে শেখার মান কমে যায় এবং প্রকৃত দক্ষতা ঠিকমতো মূল্যায়ন হয় না।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি একটি বড় সমস্যা। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকাতে হয়। এতে চোখে চাপ, মাথাব্যথা ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়। ছোট শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ক্ষতি বেশি। সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও দেখা দেয়। বন্ধুবান্ধব ও সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশা কমে যায়। দলগত কাজ বা সহপাঠ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ কমে।

শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা আইসিটি ও অনলাইন ক্লাস পরিচালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীর জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

ব্লেন্ডেড লার্নিং হলো ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান। অনলাইনের নমনীয়তা এবং সশরীরের সামাজিক বিকাশ একসঙ্গে সম্ভব। প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ে এটি ভবিষ্যতের শিক্ষার পথ দেখাবে। শিক্ষার মান সহজলভ্য, আনন্দময় এবং সর্বজনীন হবে।

জ্বালানি সংকটকে আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির সুযোগে রূপান্তর করতে পারি। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সশরীরে শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয়ই পারে এই সমস্যাগুলো কমাতে। ব্লেন্ডেড লার্নিং শুধু সমাধান নয়, এটি শিক্ষার ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা হবে সুগঠিত, শিক্ষাব্যবস্থা হবে টেকসই এবং মানবিক। শিক্ষা হবে আরও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক। আমরা যদি বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে বুঝে পরিকল্পনা করি, তবে ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে আধুনিক, সুষম এবং সকলের জন্য সমানভাবে পৌঁছনো যোগ্য।

ফয়সল আহমদ বাবুল
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক