
অবসরেও স্বস্তি নেই, চরম দুর্ভোগে শিক্ষক সমাজ
ফয়সল আহমদ বাবুল
শিক্ষা একটি জাতির আলোকবর্তিকা। আর সেই আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা। তাদের জ্ঞান, শ্রম, ত্যাগ ও নিষ্ঠার উপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে একটি শিক্ষিত সমাজ ও সচেতন জাতি। কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক সত্য হলো- যারা সারাজীবন অন্যের জীবনে আলো জ্বালান, কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারাই অনেক সময় অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে দেশের প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী তাদের ন্যায্য কল্যাণ ও অবসর ভাতা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। ৪ বছর বা তারও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তারা সেই প্রাপ্য অর্থ হাতে পাচ্ছেন না। ফলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক বিলম্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন এক গভীর মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের মাসিক বেতন থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ কর্তন করা হয়। প্রথমদিকে এই কর্তনের হার ছিল ৬ শতাংশ, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এই অর্থ জমা রাখা হয় কল্যাণ তহবিল ও অবসর তহবিলে, যাতে কর্মজীবন শেষে শিক্ষক-কর্মচারীরা অন্তত কিছুটা আর্থিক নিরাপত্তা লাভ করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন চিত্র হলো- নিজেদের কষ্টার্জিত বেতন থেকে কেটে রাখা সেই অর্থই অবসরের পরে সময়মতো তাদের হাতে পৌঁছায় না। ফলে অবসরের পর তাদের অনেকেই অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হন।
তথ্য অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ও অবসর ভাতা পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ৪ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিলম্ব নয়, এটি অসংখ্য মানুষের জীবনে গভীর কষ্ট ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবসরের পর নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় এই ভাতার অর্থই হয়ে ওঠে অনেকের জন্য একমাত্র ভরসা। কিন্তু অর্থ না পাওয়ায় কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না, কেউ আবার সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমন ঘটনাও রয়েছে কেউ কেউ জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তাদের প্রাপ্য অর্থ হাতে পাননি। একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের জন্য এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মতে, এই সমস্যার পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থের ঘাটতি এবং দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা। আবেদন যাচাই-বাছাই, অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া এতটাই দীর্ঘ যে অনেক সময় ফাইল বছরের পর বছর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আটকে থাকে। ফলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা বিলম্বিত হয়। অথচ এই অর্থ কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটি তাদের নিজের উপার্জিত বেতনের অংশ, যা নিয়মিতভাবে কর্তন করে তহবিলে জমা রাখা হয়েছে।
সমাজে শিক্ষককে সাধারণত সম্মানিত পেশাজীবী হিসেবে দেখা হয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে তাদের অবদান অপরিসীম। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান দেন না, তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও মানবিকতা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই তাদের অবসরের পর এই ধরনের অনিশ্চয়তা ও আর্থিক কষ্টের মধ্যে রাখা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। যারা সারাজীবন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন, তাদের জীবনের শেষ অধ্যায়ে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের নৈতিক দায়িত্ব।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরকারের কাছে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণের মাধ্যমে এই দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটানো সম্ভব। প্রয়োজনে বিশেষ তহবিল গঠন করে বকেয়া অর্থ দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নও জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ ও অবসর ভাতা প্রদান কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি তাদের মর্যাদা, সম্মান ও ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন। প্রায় এক লাখ দশ হাজার মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত তাদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করা হলে তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত কষ্ট লাঘব করবে না, বরং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা ও সম্মান আরও দৃঢ় করবে। কারণ শিক্ষকের সম্মান রক্ষা মানেই জাতির ভবিষ্যৎকে সম্মানিত করা। এই উপলব্ধি থেকেই আমাদের নীতি ও সিদ্ধান্ত পরিচালিত হওয়া উচিত।
লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক ইমেইলঃ [email protected]
আপনার মতামত লিখুন :