
প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ: অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপট
ফয়সল আহমদ বাবুল
শিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান নয়। এটি একটি জাতির আত্মচেতনা, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের সূক্ষ্ম ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন শিক্ষক, আর প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক। তাঁদের অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের দক্ষতা নির্ধারণ করে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষার মান ও শৃঙ্খলা। তাই এই পদগুলোর নিয়োগে রাষ্ট্রের নীতিমালা কেবল প্রশাসনিক নিয়ম নয়, বরং শিক্ষার ভবিষ্যৎ রক্ষার এক শক্ত ভিত্তি।
১৯৯৫ সালের ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী মাধ্যমিক প্রধান শিক্ষকের জন্য ১৫ বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। নিম্নমাধ্যমিক প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধানের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ বছরের অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিন এটি শিক্ষাঙ্গনের একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এমপিও নীতিমালায় প্রধান শিক্ষকের অভিজ্ঞতা ১২ বছরে নামানো হয়, সহকারী প্রধান ও নিম্নমাধ্যমিক প্রধানের ক্ষেত্রে তা ১০ বছরে নামানো হয়।
কিন্তু এই পরিবর্তন স্থায়ী হয়নি। ২০১৮ সালের ১২ জুন প্রকাশিত নীতিমালায় আবারও প্রধান শিক্ষকের জন্য ১৫ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত পুনর্বহাল করা হয়। পরবর্তী ২০২১ এবং ২০২৫ সালের নীতিমালাতেও একই কাঠামো বহাল থাকে। প্রায় তিন দশকের ধারাবাহিকতায় প্রধান শিক্ষকের জন্য ১৫ বছর এবং সহকারী প্রধানের জন্য ১০ বছরের অভিজ্ঞতা একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতার পর অভিজ্ঞতার মানদণ্ড পরিবর্তনের সম্ভাব্য আলোচনা শিক্ষকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। কারণ নীতিমালা কেবল প্রশাসনিক দলিল নয়; এটি শিক্ষকদের পেশাগত জীবন ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িত। একজন শিক্ষক বছরের পর বছর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন, অভিজ্ঞতার ভাঁজে ভাঁজে গড়ে তোলেন দক্ষতা ও নেতৃত্বের যোগ্যতা। হঠাৎ মানদণ্ড বদলে গেলে শিক্ষকদের জন্য তা অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৫ সালের নীতিমালার আলোকে এনটিআরসিএ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান ও সহকারী প্রধানের নিয়োগের জন্য আবেদন গ্রহণ করেছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি আবেদন গ্রহণের সময়সীমা শেষ হয়েছে। বহু শিক্ষক বিদ্যমান নীতিমালার ভিত্তিতে আবেদন করেছেন এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছেন। পরীক্ষার আগে নীতিমালা সংশোধনের আলোচনা প্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগের জন্য শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ১৮ বছর করা হবে। এই পরিবর্তনের কারণে প্রায় অর্ধেক আবেদনকারী প্রার্থী যোগ্যতা হারাতে পারেন। আবেদন ফি ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে আবেদন গ্রহণের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। আমরা দুই বিকল্প নিয়ে কাজ করছি—চলমান আবেদনের ভিত্তিতে পরীক্ষা আয়োজন বা নতুনভাবে আবেদন নেওয়া। শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”
নীতিগতভাবে লক্ষ্য হলো সিনিয়র শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলিতে নেতৃত্বের মান নিশ্চিত করা। ১২ বা ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকায় তরুণ শিক্ষকরা বেশি আবেদন করেছেন, কিন্তু সিনিয়ররা জুনিয়রদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সুবিধা করতে পারবেন না, এই ভয় কাজ করছে। ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার শর্তে সিনিয়র শিক্ষকরা প্রতিযোগিতা করতে পারবে, যা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে?
শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য নীতিমালার পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে, তবে তা অবশ্যই সুপরিকল্পিত, সময়োপযোগী এবং শিক্ষকদের পেশাগত স্বপ্ন ও প্রস্তুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষকদের প্রতি ন্যায্যতা বজায় থাকলে শিক্ষাঙ্গনের আস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা দুইই নিশ্চিত হবে। শিক্ষার শক্ত ভিত্তিই গড়ে তুলবে জ্ঞানভিত্তিক, আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক সমাজ।
লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
আপনার মতামত লিখুন :