
কালনি নদী। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া এই নদী হাজারো ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। বর্ষায় সে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে পুরো হাওরকে অসীম জলধিতে রূপান্তর করে, আর হেমন্তে শান্ত হয়ে বয়ে চলে এক রূপালি ফিতার মতো। এই কালনির তীরেই গড়ে উঠেছে এক শান্ত জনপদ, যেখানে মানুষের জীবন আর প্রকৃতির ঢেউ মিলেমিশে একাকার।
সেই জনপদে বাস করতেন এক ধীরস্থির বৃদ্ধ সাধক, যাকে সবাই পরম শ্রদ্ধায় ‘বড় মিঞা’ বলে ডাকত। তার চোখে ছিল এক গভীর প্রশান্তি, আর মুখে লেগে থাকত এক মায়াবী হাসি। তিনি কোনো জাদুকর ছিলেন না, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দে ছিল সত্যের অমোঘ তেজ। তিনি মানুষকে এক অদৃশ্য, পরম করুণাময় আল্লাহর কথা বলতেন—যিনি আসমান ও জমিনের মালিক এবং যিনি এই কালনি নদী আর বিস্তীর্ণ হাওরের প্রকৃত স্রষ্টা।
কিন্তু কালনির ওপারের এক প্রতাপশালী জমিদার, যার অহংকার ছিল পাহাড়সম, নিজেকেই ওই অঞ্চলের সর্বেসর্বা ভাবতেন। তিনি চাইতেন সাধারণ মানুষ তাকেই ‘ঈশ্বর’ বলে মান্য করুক। বড় মিঞার এই একত্ববাদের ডাক জমিদারের তৈরি সেই মিথ্যে ক্ষমতার দুর্গে আঘাত করল। সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারল নশ্বর মানুষের ক্ষমতার চেয়ে অবিনশ্বর স্রষ্টার শক্তিই শ্রেষ্ঠ, তখন জমিদারের গদি নড়বড়ে হয়ে উঠল।
জমিদার বড় মিঞাকে তার দরবারে তলব করে ভয় দেখালেন, ধন-সম্পদের লোভ দেখালেন। কিন্তু বড় মিঞা অবিচল। তিনি ধীরকণ্ঠে বললেন, “জমিদার বাবু, আপনার ক্ষমতা এই কালনি নদীর পাড় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমার প্রতিপালকের রাজত্ব আসমান ও জমিন ছাড়িয়ে। তিনি সব দেখছেন, সব শুনছেন।”
জমিদারের প্রতিহিংসার অনল গিয়ে পড়ল গ্রামের সাধারণ মুমিনদের ওপর। তিনি ঘোষণা করলেন, যারা বড় মিঞার পথ ছাড়বে না, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে চরম শাস্তি। কিন্তু এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল—এক কিশোর, যে জমিদারের প্রাসাদে কাজ করত, সে সবার সামনে দাঁড়িয়ে সাহসের সাথে ঘোষণা করল, “আমিও বড় মিঞার প্রতিপালকের ওপর ঈমান আনলাম।”
জমিদার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তিনি কালনি নদীর ঠিক তীরের উঁচু পাড়ে এক বিশাল গর্ত খুঁড়তে বললেন। সেখানে স্তূপ করা হলো ইন্ধন আর কেরোসিন। আকাশছোঁয়া আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে উঠল। কালনির শান্ত পানি সেই আগুনের প্রতিফলনে রক্তের মতো লাল হয়ে উঠল। জমিদার হুকুম দিলেন, “যারা ঈমান ছাড়বে না, তাদের এই ইন্ধনপূর্ণ আগুনে নিক্ষেপ করো।”
সৈন্যরা একে একে মুমিনদের আগুনের কুণ্ডে ফেলে দিতে লাগল। জমিদার পাশে বসে সেই নিষ্ঠুর দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, আগুনের সামনে দাঁড়িয়েও মুমিনদের মুখে কোনো আর্তনাদ নেই, বরং আছে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। এক মা যখন তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়ালেন, তখন সেই শিশুটি অলৌকিকভাবে কথা বলে উঠল— “মা, ধৈর্য ধরুন! আপনি সত্যের ওপর আছেন।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো দলটি হাসিমুখে আগুনের আলিঙ্গন গ্রহণ করল। কালনির বাতাস যেন সেই বীরত্বগাথার সাক্ষ্য দিতে লাগল। পার্থিব আগুন তাদের নশ্বর শরীর দহন করলেও, তাদের আত্মা ছিল জান্নাতের সুশীতল ছায়ায়। পবিত্র কোরআনের সেই অমিয় বাণী যেন সেখানে বাস্তব হয়ে উঠল— “তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু একারণে যে, তারা ঈমান এনেছিল পরাক্রমশালী ও প্রশংসার যোগ্য আল্লাহর ওপর।”
অত্যাচারী শক্তি একদিন কালের গর্ভে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। কিন্তু কালনি নদীর বয়ে চলা আজও থামেনি। রাতের গভীর নীরবতায় কালনির ঢেউ যখন তীরে আছড়ে পড়ে, মনে হয় সে আজও সেই মুমিনদের ‘মহা সাফল্যের’ গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে। আর আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব যাঁর মুঠোয়, সেই মহান আল্লাহ আজও সবকিছু দেখছেন।
লেখক :
হাবিবুর রহমান হাবিব (সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
শাল্লা, সুনামগঞ্জ।
আপনার মতামত লিখুন :