নিরাপদ মানুষ চাই : অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি 


sylnews প্রকাশের সময় : জুন ৩০, ২০২১, ১২:৪৪ অপরাহ্ন /
নিরাপদ মানুষ চাই : অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি 

বাঙালির স্বাধীনতা। স্বাধীনতার ৫০ বছর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, মা-বোনের ইজ্জত ও ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা ১৯৭১সালে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও আমরা সত্যিকার অর্থেই কী মানুষ হতে পেরেছি? চারিদিকে নিরাপদ মানুষের খুবই অভাব। 

শুধু বাংলা নয়, সমগ্র পৃথিবীতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক উন্নয়নে নিরাপদ মানুষের কোনো বিকল্প নেই। নিরাপদ মানুষ মানেই আস্থার জায়গা। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জায়গা। অবলম্বনের জায়গা। কিন্তু আমরা কী সত্যিকার অর্থেই মানুষ হয়ে উঠতে পারছি? অথচ পবিত্র কোরআনে আছে ‘মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত ‘ অর্থাৎ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর মধ্যে মানুষই একমাত্র জীব যার বিবেক বুদ্ধি রয়েছে। মানুষই ভালকে ভাল আর খারাপকে খারাপ বুঝতে ও বলতে পারে। মানুষ তার নিজের চিন্তা-চেতনাকে কাজে লাগাতে পারে। মানুষের মধ্যে উপলব্ধি করার ক্ষমতা রয়েছে। মানুষ তার নিজের শ্রম, মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। মরে গিয়েও নিজের নামকে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখে যেতে পারে। ব্যর্থতার বুকে সফলতার চিহ্ন এঁকে দিতে পারে। মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। মহান সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মানুষ অসীম ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু প্রাণীদের মধ্যে এই ক্ষমতা নেই। তারা মানুষের মতো জীবনটাকে উপভোগ করতে পারে না। পারে না নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলোকে পূর্ণ করতে। জন্ম আর মৃত্যুর জন্যই যেন তাদের জীবন। 

বহুমাত্রিক প্রাণী জগতের মধ্যে মানুষের বিবর্তনের বিশাল ইতিহাস ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে। মানুষ ধাপে ধাপে প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ অতিক্রম করে এখন আধুনিক যুগ পার করছে। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানুষের আচার-আচরণের মধ্যে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। প্রশ্ন তৈরি হয় সত্যিকার অর্থে আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি কিনা। পৃথিবীতে প্রাচীন যুগ শুরু হয় সম্ভবত ৬৫০ খ্রীস্টপূর্ব থেকে। এই যুগের স্থায়িত্বকাল ছিল ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এ যুগের মানুষের মাঝে বিভিন্ন রকম আচার-আচরণ লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন যুগের মানুষ ছিল হিংস্র। হাত- পায়ের নখগুলো ছিল পশুর মতো বড় বড়। তারা এসব ব্যবহার করত বিভিন্ন কাজে। যেমন খাবার খেতে ও পশুপাখি কাটতে। তারা অন্য হিংস্র জানোয়ারের থাবা থেকে বাঁচার জন্য গুহায় (গর্তে) বাস করত। তাদের মাঝে ছিল অবাধ যৌনাচার। পোশাকগুলো ছিল ছোট্ট ছোট্ট। মানুষের এই পোশাকগুলো পশুর চামড়া ও গাছের ছাল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হতো। প্রাচীন যুগ শেষে মানুষ মধ্য যুগে পদার্পণ করে। মধ্য যুগ ১২০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয়ে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলে। এযুগে মানুষের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। এযুগের মানুষগুলো শান্তশিষ্ট, হাত-পায়ের নখগুলো ছোট্ট ছোট্ট, বিরোধী পক্ষের(জমিদার) হাত থেকে বাঁচার জন্য তারা যৌথভাবে বসবাস করত। পোশাকগুলো ছিল ঢিলেঢালা ও বড় বড়। এযুগের মানুষের মাঝে সুষ্ঠু, সুন্দর ও বিধি নিয়মের যৌনাচার ছিল। মধ্য যুগের মানুষ নব কিছু সৃষ্টিতে এবং জীবনের প্রয়োজনে তাদের শক্তি ও সাহসিকতা ব্যবহার করত। মানুষে মানুষে চমৎকার সেতুবন্ধন ছিল। মধ্য যুগের গন্ডি পেরিয়ে আধুনিক বা বর্তমান যুগে মানুষের পথ চলা শুরু হয়।

১৮০১ খ্রিস্টাব্দে আধুনিক যুগ শুরু হয়। আধুনিক যুগে এসে মানুষের চিন্তা-চেতনায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। মানুষের ব্যবহারে আমূল পরিবর্তন আসে। এযুগের মানুষ প্রাচীন ও মধ্য যুগ থেকে পুরোপুরি আলাদা। বর্তমানে মানুষ তার শক্তি ও সাহসিকতা ব্যবহার করে অন্যকে ঠকাতে, মানবতা ধ্বংসে এবং অন্যের ক্ষতি সাধনে। প্রাচীন যুগের মতোই ফ্যাশন হিসেবে মানুষ বড় বড় নখ রাখে। কখনো বা পুরুষ নারীর অথবা নারী পুরুষের সতিত্ব ছিনিয়ে নেয়। বর্তমানে মানুষ বাবা-মা, দাদা-দাদী ও পরিবারের ব্যয় থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রাচীন যুগের মতোই গর্তে বা গুহায় বসবাস করে। অবশ্য প্রাচীন যুগে গুহা ছিল পাহাড়ের গর্ত, বর্তমানে তা শহরের ছোট্ট ছোট্ট রুম বা কক্ষ। বর্তমানে মানুষ এককেন্দ্রিক হয়ে গেছে। মানুষের মাঝে হিংস্রতা ব্যাপক আকারে ধারণ করেছে। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে না। মানুষ স্বার্থের জন্য মারামারি ও কাটাকাটিতে লিপ্ত হচ্ছে। মানুষের মাঝে যৌনতা চরমভাবে দেখা দিয়েছে। যুব সমাজ পর্ণোগ্রাফিতে আকৃষ্ট হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে স্কুলগামী মেয়েদের ওপর। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা প্রায়ই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। মাঝে মাঝে দেখা যায় নিজের আপন মানুষের ( চাচা,মামা,খালো, ভাই, সৎ ভাই, সৎ বাবা, পাড়া-প্রতিবেশী, অফিসের বস, টিউটর, ধনীর আদরের দুলাল ও বন্ধু) কাছে মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে। কোনো জায়গায়ই যেন তাদের জন্য নিরাপদ নয়। আজকাল মানুষ লোভের পাল্লায় পড়ে ছেলে বাবা-মাকে, ভাই ভাইকে, ভাই বোনকে, বোন ভাইকে, চাচা ভাতিজাকে, ভাতিজা চাচাকে, বন্ধু বন্ধুকে, কলিগ কলিগকে, প্রেমিক প্রমিকাকে, প্রেমিকা প্রেমিককে মেরে ফেলে। কে যে কার শত্রু বুঝা বড় দায়। আর রাজনীতির কথা বলতে গেলে সেখানে যেন প্রতিযোগিতা চলে কে কাকে ঠকাবে। অফিস- আদালতগুলোতে দুর্নীতির ছোঁয়া । প্রশাসন যেখানে সহযোগিতার হাত বাড়াবে সেখানে প্রায়শই তারা শাসকের ভূমিকা পালন করে। সাধারণ মানুষ যেখানে স্বস্তির জায়গা খুঁজে সেখানে তারা প্রায়ই নির্যাতনের স্বীকার হয়। শিক্ষা হচ্ছে জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষক হচ্ছে শিক্ষাগুরু। আজ সেই শিক্ষকরাই ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে নিরাপদ নয়। প্রায় সময়ই তারা নির্যাতিত ও লাঞ্চিত হচ্ছেন। সংস্কৃতি চর্চা মানুষের মন-মানসিকতাকে পরিশুদ্ধ করে। আর সেখানে আজ অপসংস্কৃতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। মানুষের চিন্তা-চেতনাকে বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। 

সংবাদপত্র হচ্ছে জাতির বিবেক এবং সাংবাদিকরা হচ্ছে তার প্রাণ। সত্য প্রকাশ যাদের কাজ আজ তারাই সত্য প্রকাশ না করে নিজেকে যুক্ত করেন হলুদ সাংবাদিকতার সাথে। মানুষ যে খাদ্য খেয়ে বাঁচার স্বপ্ন খুঁজে সেটি যেন মানুষের মরণ ফাঁদ। ফরমালিনযুক্ত খাবার খেয়ে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা লাভের আশায় মানুষকে ঠকাচ্ছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষের আগের মতো স্নেহ, মমতা, আন্তরিকতা, ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ যেন লোপ পাচ্ছে। মানুষের মনুষ্যত্ববোধ দিনের পর দিন বিকৃত হচ্ছে। মানুষ মানুষকে মানুষ মনে করে না। বর্তমানে মানুষ কেউ কারো কাছে গিয়ে স্বস্তিবোধ করে না। মানুষের মাঝে সন্দেহ প্রবণতা কাজ করে। মানুষ হা-হুতাশ করে কাকে সে বিশ্বাস করবে। কার কাছে সে নিরাপদ? কে তাকে নিশ্চয়তা দিবে নাকি নিশ্চয়তার ব্যক্তিটিই তাকে ঠকাবে। এ রকম হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। দিনে দিনে নিরাপদ মানুষের অভাব দেখা দিচ্ছে। আধুনিক যুগ কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে? নতুন প্রজন্মের জন্য ভয়ংকর কিছু কী অপেক্ষা করছে?

তবে সৎ ও নিরাপদ ব্যক্তি যে নেই তা নয়। কিন্তু তারা সংখ্যায় কম। কম সংখ্যক দিয়ে অধিক সংখ্যক মানুষকে সাপোর্ট দেয়া কষ্টকর। নিরাপদ সড়ক চাই স্লোগানে সারা বাংলায় আমরা যেভাবে জাগরণ তৈরি করি ঠিক তেমনিভাবে নিরাপদ মানুষ চাই স্লোগানে বাংলার আনাচে-কানাচে জাগরণ তৈরি করা উচিত। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিরাপদ সড়ক হওয়ার আগে মানুষ নিরাপদ হওয়া দরকার। যে ড্রাইভার সড়কে গাড়ি চালায় সে যদি নিরাপদ না হয় তাহলে সড়ক কিভাবে নিরাপদ হবে। সুতরাং প্রত্যেকটি সেক্টরে নিরাপদ মানুষ প্রয়োজন। আস্থার মানুষ প্রয়োজন। তাহলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষ স্বস্তি পাবে। মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে। মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি হবে। মানুষ সবাইকে নিরাপদ ভাবতে শুরু করবে। সামাজিক কলহ থেকে মুক্ত হবে। অন্যের জন্য নিরাপদ মানুষ তৈরি হওয়ার চর্চা ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলায়। ‘ সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই ‘ এটাই যেন বাস্তবে রূপ নেয়। তাহলে মহান সৃষ্টিকর্তার মানুষ সৃষ্টির সার্থকতা থাকবে। নিরাপদ মানুষে পরিপূর্ণ হোক সারা বাংলা। আর ‘ নিরাপদ মানুষ চাই ‘ স্লোগানে মুখরিত হোক গ্রাম-গঞ্জ, শহর-বন্দর, জেলা-উপজেলা, অফিস-আদালত, নামি-দামি হোটেলের গোলটেবিল বৈঠক। তাহলে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। 

১৯৭৩ সালের ৯ জানুয়ারি নাটোরের এক জনসভায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়ার জন্য সোনার মানুষ গড়তে হবে’। তিনি ১৯৭৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী বাংলা একাডেমিতে দেয়া ভাষণে আরও বলেছিলেন, ‘জনগণ বা মানুষ থেকে বিছিন্ন হয়ে কোনো দিন,কোনো মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না’। তিনি প্রায়ই বলতেন,আমি সবকিছু হারাতে পারি কিন্তু বাংলার মানুষের ভালবাসা হারাতে পারি না এবং আমি মানুষের সাথে কখনো বেঈমানী করতে পারি না। মানুষের সাথে বেঈমানী করে পরিপূর্ণ সফলতা লাভ করা যায় না। আর বিশ্ব উন্নয়নের রোল মডেল ও বাংলাদেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের জন্য কাজ করা সত্যিকার অর্থেই পরম শান্তি। তিনি প্রায়ই বলেন, গ্রাম-বাংলার মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান, মানুষের জন্য কাজ করেন এবং তাদের কথা শুনেন। দেখবেন নিজের মাঝে প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পাবেন। 

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসে প্রত্যাশা ‘নিরাপদ মানুষে পরিপূর্ণ হোক বাংলা ‘। তাহলেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে। 

 

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি  (লেখক  ও কলামিস্ট)