একজন কর্মবীর মুহিত

একজন কর্মবীর মুহিত
     —— কায়েস চৌধুরী

আবুল মাল আব্দুল মুহিত শুধু একটি নাম নয়, এটি একটি জৈবিক প্রতিষ্ঠান।যার প্রতিটি কোষ সততা, সাহস, জ্ঞান, সমৃদ্ধিও নির্লোভ ব্যাক্তিত্ব ও অসামান্য অধ্যাবসায় দ্বারা পরিস্ফুটিত স্বাধীন বাংলায় আজ পর্যন্ত যত জ্ঞানী গুণীর জন্ম হয়েছে আবুল মাল আব্দুল মুহিত তাদের মধ্যে একজন। আবুল মাল আব্দুল মুহিতের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন বৃটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেটে (শ্রীহট্ট) একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতার নাম আবু আহমেদ আব্দুল হাফিজ। তিনি ছিলেন আসামের মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক। একই সাথে ১৯৪৭ সালে রেফারেন্ডামের কনভেনার ছিলেন তিনি। মুহিতের রাজনীতির প্রথম ধাপ ছিল ভাষা আন্দোলনের মাধমে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে মুহিতের সাহসী ভূমিকা ছিল। যার কারনে মুহিতকে পাকিস্থানী শাসক দ্বারা কারাবরণ করতে হয়েছিল একাধিকবার। আবুল মাল আব্দুল মুহিত সিলেট গর্ভমেন্ট পাইলট হাইস্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে মেট্রিকুলেশন এক্সাম পাশ করেন। তিনি ১৯৫১ সালে সর্বোচ্চ মার্ক পেয়ে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট ফাষ্ট ক্লাস ফার্স্ট হন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফাষ্ট হন ইংলিশ লিটারেচারে। ১৯৫৫ সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এম এ কমপ্লিট করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৮ সালে চাকুরীরত অবস্থায় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে বিশেষায়িত ডিগ্রী লাভ করেন সর্বোচ্চ নাম্বার নিয়ে। ১৯৬৪ সালে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনের উপরে মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন পৃথিবী বিখ্যাত হার্ভাড ইউনিভার্সিটি থেকে। মুহিত তৎকালীন পাকিস্থান শাসন আমলে ১৯৬০-১৯৬৯ পর্যন্ত পাকিস্থান সিভিল সার্ভিস এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির জি.এস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জনাব মুহিত ১৯৬৬ সালে পাকিস্থানের সরকার কর্তৃক ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে মুহিতকে তমঘা-ই-খিদমত পদকে ভূষিত করা হয়। ১৯৮৪ এবং ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে আবদুল মুহিত প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং ফেলো হিসেবে ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্থান এম্বেসির ইকোনমিক কনসোলার হিসেবে ওয়াশিংটনে যোগদান করেন। পাকিস্থান সরকারের সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য থাকার পরও কতটুকু শিক্ষা, মেধা, যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব এবং সৎ থাকলে একজন মানুষ এই বৈষম্যের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন তা জনাব মুহিতই জলন্ত উদাহরণ। পাকিস্থান সরকারের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্থানের মধ্যকার বৈষম্য নিয়ে একটি স্ট্যাটিস্টিক রিপোর্ট তৈরি করেন যা তৎকালীন সরকারের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। এই রিপোর্টটি পাকিস্থান ন্যাশনাল কংগ্রেসে উত্থাপিত হয়েছিল এবং যা ছিল প্রথম কোন একটি রিপোর্ট যেটা দিয়ে পাকিস্থানি শাসকদের চোখে আঙুল দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার শোষিত নিপীড়িত মানুষের সকল বৈষম্যেরচিত্র। এই রির্পোট দ্বারা তিনি প্রমাণ করেছিলেন এই বেঙ্গল টাইগার কতটা কতটা সাহসী এবং বেপরোয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে ডিপ্লোমেট হিসেবে তিনি ছিলেন ফার্স্ট বেঙ্গল টাইগার যিনি পাকিস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন ওয়াশিংটনে। এবং তিনি প্রমান করেছিলেন যে, তিনি বাংলার দামাল ছেলে। তিনি চাকুরী জীবনে প্রথমে পাকিস্থানের প্ল্যানিং কমিটির ডেপুটি সেক্রেটারি এবং পরবর্তীতে চীফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুহিতকে চিনতে ভুল করেননি। যুদ্ধ পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু উনাকে যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশের সেক্রেটারী অব প্ল্যানিং-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করেন। পরবর্তীতে তিনি ই আরডি ও পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের সচিব হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এমন এক হতভাগা দেশে আমাদের জন্ম, যে দেশে বাজেটের আগে রাজপথ গরম হয় মিছিলে মিছিলে। গরীব মারার বাজেট মানিনা মানবনা। সেই হতভাগাদের দেশে একজন র্অথমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন কুসুমআর্স্তীণ, মসৃণ পথ নয়। সিলেট তথা সারাদেশের গর্ব আবুল মাল আব্দুল মুহিত ২০০৯ সাল থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। যিনি অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশ দেখেছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা জিডিপিতে কন্সটেন্টলি ৭ এর উপরে সূচক। সকল অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। সেই সাথে দেশ ও জাতি পেয়েছে মধ্যম আয়ের দেশের সম্মান। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, দেশ পদ্মাসেতুর মতো বিশাল প্রকল্প নিজ দেশের অর্থায়নে করে, যে দেশ মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট পাঠায় সে দেশকে পেছনে টানার শক্তি কারো নেই। সদা সত্যবাদী মুহিত কখনো কোন অপশক্তির কাছে মাথা নত করেননি। মাথানত করেননি কখনো অগণতান্ত্রিক অপশক্তির কাছে। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের সময়ে ক্ষমতা নির্লোভ এই মানুষটি সরকারের উচ্চপদস্থ পদ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। স্বেচ্ছায় নিয়েছিলেন অবসর। দেশপ্রেমিক সহজ সরল এই মানুষটি আবার দেশে আসেন ২০০১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ডাকে। পরর্বতীতে ভিশন টুয়েন্টি-টুয়েন্টি ওয়ানের স্বপ্নদ্রষ্টা এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পর্যন্ত পালন করেছেন অর্থমন্ত্রীর মতো গুরু দায়িত্ব। আবুল মাল আব্দুল মুহিত যে শুধু সত্য কথা বলেন তা নয়, সত্য কথা যে কতটুকু সাহসীকতার সাথে বলতে হয় তা প্রমাণ করেছেন বারবার। চাটুকা সমৃদ্ধ আশপাশের কিছু রাজনীতিবিদদের দেখে সত্য কথা সময়মতো বলা যে কতটা কঠিন তা কখনো বুঝতে দেননি আমাদেরকে। ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’ এই উপমাটি যে কত কঠিন বাস্তবতা তা তিনি প্রমাণ করেছেন তার কথা ও কার্যকলাপের মাধ্যমে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে। রাবিশ এবং ভোগাস এই ইংরেজি শব্দদ্বয় বাংলা একাডেমিতে যদি প্রতিষ্ঠার জন্য বলা হয় তাহলে তার দাবীদার বলতে হবে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে। যদিও রাবিশ শব্দটি শুনতে বেশ কর্কশ মনে হয়, তবুও এই শব্দটি যখন এই নির্লোভ সৎ ও সাহসী মানুষটির মুখে শোনা যায় তখন বেশ মধুরই লাগে। সকল অন্যায়কারীদের মাথানত হতে দেখলে আমাদের অর্থমন্ত্রীর রাবিশ শব্দটি যে কত ভয়ংকর, নিউক্লিয়ার ও ওয়েপন হিসেবে কাজ করে তা ভাবতে অবাক লাগে। দেশপ্রেমিক প্রচারবিমূখ এই মানুষটি নিজের বাড়িটি বিক্রি করে একটি বিদ্যালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেক আগেই। সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী থাকার পরও তিনি সার্কিট হাউসে না থেকে কমিউনিটি সেন্টারের পিতৃনিবাসে থাকতেন। শিশুসুলভ এই মানুষটি সংবাদ এবং সাংবাদিকদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে সদা সত্য ও স্পষ্টভাষী মানুষটি বারবার থাকেন সংবাদের শিরোনাম হয়ে। ভিতরে কথা লুকিয়ে রাখার মতো মানুষ তিনি নন। দেশ ও জাতির স্বার্থে যখন যা বলার প্রয়োজন হয়েছে তখনই তা প্রকাশ করেছেন। সদ্য আলোচিত কোটা সংস্কারের জন্য প্রথম দায়িত্ববান কোন মন্ত্রী সময়োপযোগী স্টেটমেন্ট দিয়েছেন তা আমাদের সিলেটবাসীর জন্য গর্বের বিষয়। জনাব মুহিত শুধু কোন রাজনৈতিক দলের মন্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন ষোল কোটি মানুষের মন্ত্রী। তাই অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে সিলেটের স্থানীয় উন্নয়নে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বিরোধীদলের হওয়া সত্বেও সর্বদা সকল সুযোগ সুবিধাসহ আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। এটি কেবলই একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ এবং দেশ প্রেমিকের দ্বারাই সম্ভব।

হে সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী, আপনার মতো সৎ ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতা, নির্লোভ কর্মতৎপরতা আমাদের করেছে অলংকৃত। আপনি দীর্ঘজীবী হোন।

লেখকঃ কান্টি ডিরেক্টর, কিউভিস টেকনোলজি (ইউকে)

ফেসবুক মন্তব্য