বিপ্লবের আগুনে পোড়া একটি নাম সূর্যসেন : আশরাফ জানু

ফাঁসির ৫ ঘন্টা পুর্বে লেখা একজন বিপ্লবীর শেষ ছিঠি ‘আমার শেষ বাণী আদর্শ ও একতা’। ফাঁসির রজ্জু আমার মাথার উপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলছে। এই তো সাধনার সময়। বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এই তো সময়। ফেলে আসা দিনগুলোকে স্মরণ করার এইতো সময়। কত মধুর তোমাদের সকলের স্মৃতি। তোমরা আমরা ভাই-বোনেরা তোমাদের মধুর স্মৃতি বৈচিত্র্যহীন আমার এই জীবনের একঘেঁয়েমিকে ভেঙে দেয়। উৎসাহ দেয় আমাকে। এই সুন্দর পরম মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য দিয়ে গেলাম স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। আমার জীবনের এক শুভ মুহূর্তে এই স্বপ্ন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। জীবনভর উৎসাহভরে ও অক্লান্তভাবে পাগলের মতো সেই স্বপ্নের পেছনে আমি ছুটেছি। জানি না কোথায় আজ আমাকে থেমে যেতে হচ্ছে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে মৃত্যুর হিমশীতল হাত আমার মতো তোমাদের স্পর্শ করলে তোমরাও তোমাদের অনুগামীদের হাতে এই ভার তুলে দেবে, আজ যেমন আমি তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। আমার বন্ধুরা- এগিয়ে চল, এগিয়ে চল- কখনো পিছিয়ে যেও না। পরাধীনতার অন্ধকার দূরে সরে যাচ্ছে। ঐ দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার নবারুণ। কখনো হতাশ হয়ো না। সাফল্য আমাদের হবেই। ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম ইস্টার বিদ্রোহের কথা কোনও দিনই ভুলে যেও না। জালালাবাদ, জুলখা, চন্দননগর ও ধলঘাটের সংগ্রামের কথা সব সময় মনে রেখো। ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যেসব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন,তাঁদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো।আমাদের সংগঠনে বিভেদ না আসে-এই আমার একান্ত আবেদন। যারা কারাগারের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে, তাদের সকলকে জানাই আমার আশীর্বাদ। বিদায় নিলাম তোমাদের কাছ থেকে। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক, বন্দে মাতরম।

শোষণ-বঞ্চনা, দারিদ্র্য-দুর্ভিক্ষ পীড়িত ভারতবর্ষের বুকে চেপে বসে অত্যাচারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। পরাধীনতার গ্লানি থেকে দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করতে গড়ে উঠে আপোষহীন স্বদেশী বিপ্লব। ফাঁসির মঞ্চে বিপ্লবী ক্ষুদিরামের নির্ভীক আত্মদান জাগিয়ে তুলে সমগ্র ভারতবর্ষের তরুণ-যুব সমাজকে। সে মন্ত্রে উজ্জীবিত এক স্কুল ছাত্র ধীরে ধীরে নিজেই হয়ে উঠে এক মহান বিপ্লবী, স্বাধীনতা সংগ্রামের এক মহানায়ক বলছিলাম বিপ্লবের আগুনে পোড়া একটি নাম সূর্যসেনের কথা। শহর থেকে গ্রাম রাজপথ থেকে গাঁয়ের মেঠোপথ, দিনের পরদিন কঠোর শ্রমে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার সংগ্রামে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন বড় ভরসা। একসময় শিক্ষতা করতেন বলে সব বিপ্লবীর কাছে তিনি ছিলেন মাস্টারদা। ১৮৯৪ সালে ২২মার্চ চট্রগ্রামের রাউজানে নোয়াপাড়ায় এক অস্বচ্ছল পরিবারে জন্ম নেয়া সূর্যসেনের এমন বিপ্লবী নেতা হয়ে উঠার পিছনেও আছে বড় ইতিহাস।পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়ার সময় যার হাতে কড়ি রাজনীতিতে ,এরপর বাংলা থেকে ভারতবর্ষ চষে বেড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্রিটিশ তাড়ানোর আন্দোলনে। তাঁর বড় কীর্তি ১৯৩০সালের ১৮ই এপ্রিল রাতে চট্রগ্রামে ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে চারদিন স্বাধীন রাখেন চট্রগ্রামকে, কিন্তু দুর্ভাগ্য তার তিনবছর পর আত্মগোপন থাকাবস্থায় বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেনের সহযোগিতায় ধরা পড়েন ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে। এরপর কারাগারে নির্মম নির্যাতন অত্যাচারে মাথা নুয়াননি শাসকদের কাছে,হাসি মুখে চলেছেন ফাঁসির কাষ্ঠে।

শেষ দিনগুলোতে জেলে থাকার সময় তাঁর একদিন গান শোনার খুব ইচ্ছা হল। সেই সময় জেলের অন্য এক সেলে ছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী।রাত ১১টা/১২টার দিকে কল্পনা দত্ত তাঁকে চিৎকার করে বলেন ‘এই বিনোদ, এই বিনোদ, দরজার কাছে আয়। মাষ্টারদা গান শুনতে চেয়েছেন’। বিনোদ বিহারী গান জানতেন না।

তবুও সূর্য সেনের জন্য রবিঠাকুরের “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” গানটা গেয়ে শোনালেন। সূর্যসেনকে এবং তারকেশ্বর দস্তিদারকে ব্রিটিশ সেনারা নির্মম ভাবে অত্যাচার করে। ব্রিটিশরা হাতুরী দিয়ে তাঁর দাঁত ভেঙ্গে দেয় এবং তাঁর হাড় ও ভেঙ্গে দেয়। হাতুরী দিয়ে নির্মম ভাবে পিটিয়ে অত্যাচার করা হয় এই বিপ্লবীকে। এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলে তাঁর লাশ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখে।১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারী মধ্যরাতে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি দিয়ে তাদের নিথর দেহ পর্যন্ত আত্মীয়দের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি ফাঁসির পর লাশদুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টীমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজার “The Renown” এ তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন একটা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।

লাল সালাম হে বিপ্লবী কমরেড। আমরা তোমাদের ভুলবনা। তথ্যসুত্রঃ ইন্টারনেট

লেখকঃ আশরাফ জানু
প্রবাসী কবি সাংবাদিক 
চ্যানেল আই ইউরোপ

ফেসবুক মন্তব্য
xxx