তাহলে কি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন রেজা কিবরিয়া?

তাহলে কি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন
 রেজা কিবরিয়া?
মো. আখলাকুর রহমান

নিতান্তই নাবালকের মতো দেশবাসির কাছে প্রশ্ন রেখেছেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী এএসএম কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া !

এটা তো এখন সবাই বলবে তিনি নিজের পছন্দ মতো সম্প্রতি নির্বাচন করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা তার জন্য উত্তম। তার বাবা আওয়ামী লীগ করতেন, তিনি তো আর সে কারণে দায়বদ্ধ নন যে তিনি আওয়ামী লীগ করবেন। শুনেছি আওয়ামী লীগ তাকে আগেও দেয়নি এখনো নমিনেশন দিতে রাজি নয়। এর কারণ তিনি আর আওয়ামী লীগই ভালো বলতে পারে। তারপরেও বলতে হয়, তিনি আগামী দিনে বাবার মতো এমপি হবেন, মন্ত্রী হবেন। তাই তো ঐক্যজোটের প্রার্থী হলেন, নির্বাচনও করবেন। শোনা যাচ্ছে এবার ধানের শীষের সম্ভাবনা ভালো। এ খবরটা তিনি পেয়ে গেছেন বলেই হয়তো সেখানে গিয়ে লাইন ধরেছেন। ভাবতে অবাক লাগে এ লোকটা আবার কেনো এমন প্রশ্ন করেন দেশবাসিকে বলার জন্যে যে, আওয়ামী লীগের প্রতি তার আনুগত্য রাখা ঠিক কি না?

দেশের মানুষ অবশ্যই বলবে তার আওয়ামী লীগের প্রতি আর আনুগত্য রাখা ঠিক নয়। আওয়ামী লীগ বিরোধীরা তো বলবেই, বোধ করি আওয়ামী লীগাররাও বলবে তার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে, কারণ তিনি এখন ধানের শীষের প্রার্থী। সারা দুনিয়াবাসিও সে কথা বলবে। তার সৃষ্টিকর্তাও বলবেন, আওয়ামী লীগের প্রতি তার আর আনুগত্য রাখা চলে না।

একটাই কারণ হলো তার কাছে এবং এটাই বড় কারণ যে আওয়ামী লীগ তার বাবার হত্যাকান্ডের বিচারকার্যে সহযোগিতা করেনি। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি এএসএম কিবরিয়া তার নির্বাচনী এলাকা হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক জনসভায় যোগদান শেষে ফেরার সময় দুর্বৃত্তদের গ্রেনেড হামলায় তিনি ও তার ভাতিজা শাহ মঞ্জুর হুদাসহ মোট ৫ জন নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। এতে আহত হন আরো ৪৩ জন। ঐ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক দু’টো মামলা দায়ের করা হয়। কয়েক দফা তদন্ত শেষে এর সর্বশেষ চার্জশীটে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও হবিগঞ্জের মেয়র জি.কে গউছ সহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে দু’টো মামলারই চার্জশীট দেয়া হয়। কিন্তু দফায় দফায় তদন্তের বেড়াজালে আটকে থাকা লোমহর্ষক এ হত্যাকান্ডের বিচার শুরু করতে কেবলি দেরি হচ্ছে। মামলার বিচারকার্যই শুরু হয়েছে মামলা দায়েরের ১০ বছর পরে।

জানা যায়, আইনি জটিলতায় বিচার বিলম্বিত হচ্ছে এ চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার। এ মামলায় মোট ১৭১ জন সাক্ষী আছেন। কিন্তু নানা আইনি জটিলতার কারণে স্বল্প সংখ্যক সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ফৌজদারি আইনের বিধান অনুযায়ী সাক্ষী আদালতে হাজির হলে এবং আসামি জেল হাজতে থাকলে তাকে আদালতে হাজির করতে হয়। আসামি হাজির না করা গেলে সাক্ষী নেয়া যাবেনা। এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামিরা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মামলার আসামি থাকায় তাদের ঠিকমতো আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়না। ফলে সাক্ষ্যও নেয়া যায় না। হত্যাকান্ডের ১৩ বছর পুর্তিকালীন সময়ে এর সরকারি কৌশুলীরা জানিয়েছিলেন, তখন পর্যন্ত মাত্র ২৪ জনের সাক্ষী নেয়া হয়েছে দীর্ঘ ২ বছর সময়ে।

তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সাংসদ এএসএম কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ অনেক নেতাকর্মী হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন। এ সমস্ত ঘটনায় তখন মামলা দায়ের হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে স্বদলীয় অপরাধীদের বাঁচাতে প্রায় প্রত্যেকটা মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করেছিলো ক্ষমতাসীনরা। কারণ এ সব ঘটনা ঘটেছিলো সে সময় তাদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে। কিছুদিন আগে এ সময়ের সবচেয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী  বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে নৃশংস ভাবে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের মদদে পরিচালিত ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তারিখে সংঘটিত গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ১৪ বছর পরে হয়েছে।

বাংলাদেশে বরাবরই ন্যায় বিচার প্রাপ্তি একটা কঠিন ব্যাপার বলেই সর্বজনবিদিত। যেখানে স্বপরিবারে জাতির জনক হত্যাকান্ডের বিচার হয়েছে প্রায় ২৫ বছর পরে। একই রকম দেরিতে হয়েছে জাতীয় ৪ নেতা হত্যার বিচার। এমনকি ‘৭১ সালের ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞের সাথে জড়িত মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার হয়েছে স্বাধীনতার ৪০ বছর পরে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছিলো জাতিকে। তার পেছনে কারা ছিলো তা এ দেশের মানুষের অজানা নয় এবং এটাও সবার জানা যে, স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরই প্রথম সে অচলায়তনের দেয়ালে হাতুড়ী ঠুকেছেন। তিনিই সাহস করে অনেক গুলো বড় বড় ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিচারকার্য পরিচালনার পথকে নির্বিঘ্ন করে দিতে পেরেছেন।

কিন্তু বিচার কাজ তো শেখ হাসিনা করেন না, আওয়ামি লীগও করেনা, সরকারের নির্বাহী বিভাগও না। তা হলে কোনটা আশা করেছিলেন রেজা কিবরিয়া? পিতৃহত্যার বিচার যদি তার এখন রাজনীতিতে অনুপ্রবেশের কারণ হয়, তা হলে কি তিনি ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করাটাকে বেছে নিলেন? আদালতে তার বাবার হত্যা মামলায় আসামিদের নামের তালিকা নিশ্চয়ই তিনি দেখেছেন। আগামি জানুযারি মাসে তার হিসাব মতো সব ঠিকঠাক থাকলে ধানের শীষ হাতে নিয়ে যে সরকার আসবে তখন তার পিতৃহত্যার বিচারের চিত্র কি হবে, তা কি তিনি ভেবেছেন? আর সে সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ কি তিনি দেশবাসিকে খোলাসা করে বলবেন?

রেজা কিবরিয়ার নাবালকি প্রশ্ন তোলার কথা নিবন্ধের শুরুতে এ কারণেই বলেছিলাম। তিনি সুশিক্ষিত বলেই জানতাম। কিন্তু সংগ দোষে সর্বনাশ যে হয় তার বড় এক প্রমাণ পাওয়া গেলো তার কথায়। বাবা, তুমি রাজনীতি করবে– করো ! তবে দেশের মানুষকে এতোটা বেআক্কেল ভাববে কেনো? প্রায়ই শুনে থাকি রাজনীতিতেও বেশ্যাপনা আছে। এ লাইনে পুরাতন যারা, তাদের ভেতর সদরঘাট থাকলেও বাইরে সবকিছু ফিটফাট থাকে। তবে এ লাইনে নুতন এলেই রেজা কিবরিয়ার মতো বিড়ম্বনা ঘটে। এ কালে বেশকিছু হেভীওয়েট রাজনীতির ঐ সকল পদার্থরা কি মুন্সীয়ানা করে সময় পার করছে ! দিনের শেষে রাতের আলো-আঁধারিতে হাতিয়ে নেয়া আয় তাদের ঠিকই থাকবে। কিন্তু রেজার মতো নুতন আমদানিরা তার তালই পাবে বলে মনে হয় না। তারা মুলা ঝুলতেই দেখবে আর শেষ পর্যন্ত ওদের আম ও ছালা দু’টোই যাবে……!

তারিখঃ ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রি.
অস্টিন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র।

ফেসবুক মন্তব্য
xxx