নিউজটি পড়া হয়েছে 113

গল্পঃ চিরকুট

গল্পঃ- চিরকুট

(উৎসর্গঃ কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে)

১. আজ আমাদের কলেজে মন্ত্রী আসবেন। আজ আমাদের কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। এতে মন্ত্রী সাহেব প্রধান অতিথি। মন্ত্রী সাহেব একটি জরুরী কাজে আসলে আমাদের কলেজের পাশেই এক হোটেলে উঠেছিলেন। কাজ শেষ, তাই আজ ফিরে যাওয়ার আগে আমাদের কলেজে উঠবেন কথা দিয়েছেন। তাই কলেজে বেশ উৎসব মুখর এক পরিবেশ। হল রুমটি অনেক সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। আমরা কয়েকজন বন্ধুরা আমাদের স্যার-ম্যাডামের সাথে সারারাত কাজ করেছি। আজ আমাদের কলেজের একটি স্বরনীয় দিন। সবাই বেশ উত্তেজিত। কিন্তু আমাদের ‘চিরকুট’ এর তেমন ভাবান্তর দেখা যাচ্ছে না। চিরকুট হলো আমাদের এক সহপাঠী। সে একজন পথশিশু। এলাকার বাজারে একটি দোকানে কাজ করে এবং মানুষের সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা করে। তার নাম আসলে সবুজ। চিরকুট নামটা আমরা সবাই দিয়েছি। সে একবার আমাদেরকে বলে তাকে নাকি মন্ত্রী একটি ‘চিরকুট’ দিয়েছেন। আর সেই চিরকুটে নাকি লিখা ছিলো, ‘আজ থেকে তোমার সকল দায়িত্ব আমার’, আর এরকম একটি সাধারণ হাতে লিখা চিরকুট সে আমাদের দেখায়। ব্যস সেই থেকেই তার নাম পরে যায় ‘চিরকুট’।

* চিরকুট বরাবরই একদম চুপচাপ থাকে। কারো সাথে মেশেও না। সবাই তাকে নিয়ে হাসি তামাশা করে। কিন্তু তারপরও তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারনে সে পড়াশোনা থেকে পিছু হটেনি। স্যার- ম্যাডামরাও তার এক কাপড় প্রতিদিন পরে আসা ও নানাবিধ বিষয়ে তাকে বকাঝকা করেন। কিন্তু পড়ালেখার প্রতি তার মনোবল বড়ই শক্ত। তার কোনো বন্ধুবান্ধব নেই। স্যার ম্যাডামেরা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন অনুষ্ঠানেকে কি পরিবেশন করবে তার তালিকা করে দেয়ার জন্য। সর্বমোট পাঁচজনের তালিকা আমি দিয়েছি। আমাদের সকল বন্ধুবান্ধবের পরিকল্পনা মতো চিরকুটের নাম দিয়ে দিয়েছি দেশাত্মবোধ গানের তালিকায়। এটা সবার সামনে চিরকুটকে নিয়ে একটা মজা করার পরিকল্পনা। আমরা কেউই কখনো চিরকুটকে গান গাইতে শুনিনি। আর যদি সে গান জেনেও থাকে হাজার লোকের সামনে গান গাইতে গিয়ে না পারলে কি যে লজ্জা পাবে! সেটা দেখার মতো একটা দৃশ্য হবে।

২.
যথাসময়ে মন্ত্রী সাহেব এসে কলেজে হাজির হলেন। উনাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়ার পর তিনি মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন। তারপর অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রথমে, ইমরান কোরআন থেকে তিলাওয়াত করলো। তারপর, আমরা কয়েকজন মিলে গাইলাম জাতীয় সংগীত। এরপর সবশেষে চিরকুটকে ডাকা হলো দেশাত্মবোধ গান গাইতে। তার নাম বলার পরে সে হকচকিয়ে উঠল। কারণ, সেতো জানতই না আমাদের প্ল্যানের কথা। ম্যাডাম দুইবার তার নাম ডাকার পরে সবাই তাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। তখন সে কোনোরকমে উঠে দাড়িয়ে ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে হাটতে শুরু করলো। যখন সে মঞ্চে উঠল, ম্যাডাম তাকে ভয় না পেতে ইশারায় মনোবল দিলেন। তখন সে চোখ বন্ধ করে গাইতে লাগলো,

“সুন্দর, সুবর্ণ, তারুণ্য, লাবন্য।
অপূর্ব রূপসী, রূপেতে অনন্য। 
আমার দুচোখ ভরা স্বপ্ন, 
ও দেশ তোমারই জন্য”

এতক্ষণ সবাই চিরকুটের গান মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলো। গান শেষ হতেই চারদিকে সবাই হাততালি দিতে লাগলো। চিরকুট তখন এক দৌড়ে কান্না করতে করতে মঞ্চ থেকে নেমে আসলো। সবার পিছনে গিয়ে গুটিশুটি মেরে বসে থাকলো। তারপর পুরস্কার বিতরণীর পরে আগে স্যার-ম্যাডাম ও অন্যান্য অতিথিরা সকল ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে অনেক শিক্ষামূলক বক্তব্য দিলেন। সবশেষে প্রধান অতিথি তথা মন্ত্রী সাহেবের বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠান এর সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে।

৩.
মন্ত্রী সাহেব যখন সমাপনী বক্তব্য দিতে আসলেন সবাই একটু নড়েচড়ে বসলো। তিনি প্রথমেই সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করলেন।

আসসালামু আলাইকুম মঞ্চে উপবিষ্ট সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, উপস্থিত সকল স্নেহভাজন কোমলমতি শিক্ষার্থী বন্ধুরা, অভিভাবক ও শিক্ষকগন। সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের বক্তব্য শোনার জন্য আপনারা এতটা সময় ধরে কষ্ট করে অপেক্ষা করেছেন। আমি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, কারণ আমি এতো ভালো বক্তা নই। তবে আজ আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি এই কলেজের প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতিভা দেখে। আমি সকল শিক্ষক এবং অভিভাবকদেরকে অনুরোধ করে বলবো আপনারা আপনাদের সন্তানের এই প্রতিভাকে কাজে লাগাতে যে যার অবস্থান থেকে যা কিছু সম্ভব করে যান, যে কোনো প্রয়োজনে আপনারা আমার সর্বাত্মক সহযোগিতা পাবেন।

আর আমার প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আমি তোমাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাই। এটা হতেও পারে তোমাদের মাঝে অনেকেই অনেক দিক থেকে আমার থেকে এগিয়ে হয়তো বা। কিন্তু তোমাদের সবাই আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। তাই একজন বড় হিসেবেই আমি কথাগুলো বলতে চাই। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনো। জীবনে কখনো কোনো কিছুকেই ছোট করে দেখবে না। কেননা, প্রতিটি নগন্য জিনিস থেকে খোদা কখন কি করেন তা কেউ বলতে পারবে না। উদাহরণ, তোমাদের সামনে আমি নিজে। তোমরা কেউ কি আছো যে কোনো কিছু ছোট চোখে দেখো, থাকলে হাত তোলো? তারমানে কেউ নেই। আমি যদি বলি তোমরা সবাই মিথ্যা বলছো, তাহলে কি আমার ভূল বলা হবে? আশা করি না।

জানো প্রিয় বন্ধুরা আজ আমি তোমাদের কলেজে কেন এসেছি? আমার নিজের দেয়া একটা কথা রাখতে গিয়ে। তোমাদের ই কোনো এক সহপাঠীকে আমি একদা একটা কথা দিয়েছিলাম। তার সম্পর্কে সবকিছু জানার পর আমি তাকে সাহায্যের কথা বলেছি। একটা চিরকুট দিয়েছিলাম তাকে। তাতে লিখে দিয়েছিলাম, আজ থেকে তোমার সকল দায়িত্ব আমার। আর আপনাদের সবাইকেই সাক্ষী রেখে আমি আমার সেই দায়িত্ব আজ কাধে নিতেই আপনাদের কলেজে এসেছি।

তোমাদের মাঝে এমন কেউ কি আছো, যে জীবনে একবেলা না খেয়ে পড়ালেখা করেছো? যার স্কুলে যাওয়ার জন্য ড্রেস পাওনি? যে টিফিনে একটা কিছু না খেয়ে একদিন স্কুলে ক্লাস করেছো? জানি কেউ নেই। তবে এখানে এমন দুইজন আছে যারা একটি ছেড়া শার্ট শেলাই করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছে। যারা একদিন খেয়ে ভূলে যেতো শেষ কবে ভাত খেয়েছিল। যারা নিজেদের জীবনের সাথে প্রতিটি মূহুর্তে সংগ্রাম করে বাঁচে। যারা তার দিয়ে বেধে এক জোড়া স্যান্ডেল পড়ে কাটায় মাসের পর মাস। তাদের দুচোখে একটাই স্বপ্ন, নিজেকে শিক্ষা ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে সমাজে একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকবে। তোমাদের মাঝেও এমনই একজন তোমাদের অবহেলা আর সমাজের ঘৃণিত হতে হতে নিরুপায় হয়ে চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে আমার কাছে গেয়েছিল। তার নাম ‘সবুজ’ আর সেই দ্বিতীয় ব্যক্তি হলাম আমি নিজে। আমি না খেয়ে থেকেছি দিনের পর দিন। দিনে ইট ভাংতাম, রাতে পড়তাম। যা উপার্জন হতো, কোনরকমে খেয়ে না খেয়ে পড়াশোনাটা চলে যেতো। আর যদি আমার জন্মপরিচয়টা জানতে চাও, তাহলে শুনো, আমার বয়স যখন ৩/৪ দিন তখন আমাকে রাস্তায় নর্দমার ধারে কুড়িয়ে পেয়ে এক ভদ্রমহিলা এতিমখানাতে দিয়ে যান। আল্লাহ আমাকে সেই নর্দমা থেকে তুলে এনে আজ মন্ত্রী বানিয়েছেন। এবং আমি বিশ্বাস রাখি, এই সবুজও একদিন কিছু একটা হবে। আজ আমি এই মঞ্চে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছি এটা এই মন্ত্রীত্বের কারনে। যা আমি জীবনের সাথে যুদ্ধ করে উপহার হিসেবে পেয়েছি। আজ যদি আমি এই অবস্থানে আসতে না পারতাম, তাহলে সমাজের চোখে আমি কুকুর সমতুল্য হতাম। কারণ উভয়েই নর্দমায় থাকতাম। এটাই আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি! আমরা আজ ভূলে গেছি মানবতা সবচেয়ে বড় ধর্ম। আমরা আজ মানুষকে বিচার করি তার স্ট্যাটাস, সম্পদ, বংশ, পরিবারগুলো দিয়ে। আমরা আজ ভূলে গেছি আমাদের যার যা ই স্ট্যাটাস, সম্পদ, বংশ, হোক না কেন; সবারই শুরু মৃত্তিকা থেকে আর শেষও মৃত্তিকাতেই। তাই আমাদের এই সমাজকে তোমারা সকল নবীন রা মিলেই এই সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে। সবশেষে আমি সবুজকে মঞ্চে আসার আহবান জানাচ্ছি।

সকলেই মন্ত্রমুগ্ধের মত মন্ত্রী সাহেবের বক্তব্য শুনছিলাম। সবার চোখের কোনেই পানি চলে এসেছে। সবুজ ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে অগ্রসর হলো।

আপনাদের সবাইকে বলতে চাই, এই যে সবুজ; সে আমারই অতীতের এক প্রতিচ্ছবি। আমি আর সবুজ আলাদা নই একই জীবনী, দুইটা দেহ মাত্র। যে ছেলেটা তার ম্যাডামের চোখের ইশারায় দেয়া সামান্য মনোবল পেয়ে একজন পেশাদার শিল্পীর মতো শ্রুতিমধুর কন্ঠে গান গাইতে পারলো এতো লোকের সামনে। একবার চিন্তা করে দেখুন আমাদের সমাজে এরকম কতো শত-সহস্র সবুজেরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে, অথচ আপনার আমার বাড়িয়ে দেওয়া একটি মানবিক সাহায্যের হাতই গড়ে তুলতে পারে আমার মতো করে অসংখ্য সবুজদের।

বলতে বলতে মন্ত্রী সাহেবের গলা ধরে গেলো। তিনি সবুজের যাবতীয় খরচের দায়ভার নিলেন। তিনি আর সবুজ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। সাথে কাঁদালেন আমাদের সবাইকে। সেদিন সবচেয়ে বেশি কেদেছি আমি। কারণ, চিরকুটের সাথে সবচেয়ে বেশি আমিই দুষ্টুমি করতাম। সবুজ ছিলো আমার কলেজ জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা।

চলবে………

লেখকঃ মনসুর মোর্শেদ 

ফেসবুক মন্তব্য
xxx