ড. এ কে আব্দুল মোমেন : সিলেটের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র (পর্ব-১)

ড. এ কে আব্দুল মোমেন। একাধারে একজন বরণ্য অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রদূত, শিক্ষক। সিলেটের সম্ব্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া ড. মোমেন তার কর্মময় জীবনে রেখেছেন সাফল্যের অনন্য কীর্তি। সিলেটের এই কৃতিসন্তান সিলেট গভঃ পাইলট হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ অনার্স ও এমএ পাশ করেন এবং আইন শাস্ত্রে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন। মেধাবী হওয়ায় তিনি স্কুল জীবন থেকে শুরু করে সারা জীবনই হরেক ধরনের স্কলারশীপ পেয়ে পড়াশোনা করেন৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র থাকাবস্থায় তিনি বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসাবে কাজ করেন। পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ২৩শে মার্চের পর কাজ ছেড়ে চলে যান এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯শে ডিসেম্বর তিনি স্বকাজে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাক সেনাবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। বাংলাদেশ দখলদার মুক্ত হলে পরে তিনি তৎকালীন আঞ্চলিক প্রশাসক দেওয়ান ফরিদ গাজীর নির্দেশে প্রথমত চা শ্রমিকদের ভারত থেকে স্বদেশে নিয়ে আসার কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের ‘আনরব’ অফিসের সহায়তায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে চাল, ডেউটিন ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যসামগ্রী রাশিয়ান বিমানযুগে উত্তরবঙ্গের যুদ্ধবিধস্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত হন৷ রিলিফের কাজ শেষ হলে পরে তিনি নবগঠিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন। তিনি সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর একান্ত সচিব থাকাবস্থায় প্রবাসীদের উদ্দ্যেগে ‘ওয়েজ আর্নার স্কীম’ চালু করেন, যা ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের অন্যতম সফল নীতি এবং এর মাধ্যমে প্রবাসীরা নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করে স্বদেশে আনতে পারতেন। এই নীতিমালার ফলে দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সরবরাহ যেমন বাড়ে তেমনি মুদ্রাস্ফীতিও কমে। তার এই পলিসি নব্বই দশক পর্যন্ত চালু ছিল এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার দ্রব্য সামগ্রী আমদানী করা হয়।

ড. মোমেনের সৌভাগ্য যে তিনি বঙ্গবন্ধুর সরকার ও তারই কন্যা শেখ হাসিনা সরকারে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু যখন প্রেসিডেণ্ট আইয়ূব খানের আহ্বানে রাওয়ালপিণ্ডিতে রাউণ্ড টেবিল বৈঠকে  যোগদান করেন তখন ড. মোমেন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষনিক সহকারী এবং ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা তাকে তার প্রতিনিধি হিসাবে জাতিসংঘে পাঠান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার সলিমুল্লাহ হলে থাকাবস্থায় ছাত্র মোমেন কেরেম চ্যাম্পিয়ান, টেনিস চ্যাম্পিয়ান ও টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়ান পুরষ্কার ছাড়াও বিভিন্ন খেলাধুলায় ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বহুবিধ পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি যখন এসএম হলের ভলিবল এবং বাস্কেটবল ক্যাপ্টেন ছিলেন তখন শেখ কামালকে এস এম হল ভলিবল ও বাস্কেটবলে সম্পৃক্ত করেন। এমসি কলেজে থাকাবস্থায় তিনি ‘উষশী’ নামে একটি উন্নত সাহিত্য ম্যাগ্যাজিন প্রকাশ করেন এবং তার এবং তার সহপাঠী সৈয়দ মোস্তফা কামালের উদ্যেগে কবি দিলওয়ারের ২য় বই ছাপাকলে প্রকাশিত হয়।

১৯৭৮ সালে ‘ফোর্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশীপ’ ও ‘হাভার্ড ম্যাসন ফেলোশিপ’ নিয়ে তিনি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ট বিদ্যাপীঠ হাভার্ড ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়ন করতে যান এবং অর্থনীতি ও লোক প্রশাসনে এমপিএ ডিগ্রী অর্জন করেন। স্বদেশে বহুদেশীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধান জন্য আওয়াজ তোলায় বাংলাদেশের তৎকালীন সামরিক সরকার তাকে ‘পি-ও-ওর্ডার-৯’ এর বরাদ দিয়ে চাকরিচ্যূত করলে তিনি যুক্তরাস্ট্রে ‘কমিটি ফর ডিমোক্রেটিক বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই দুঃসময়ে বহু ধরনের কাজ করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে আইনসিদ্ধভাবে থাকার জন্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি একাধিক ডিগ্রী অর্জন করেন। যেমন পিএইচডি (অর্থনীতি), এমবিএ (বিজনেস) ইত্যাদি ডিগ্রী অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেন। তিনি ‘বেস্ট শিক্ষক’ হিসাবে ছাত্র/ছাত্রীদের আস্থা অর্জন করে পুরষ্কৃত হন। তিনি হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, এমআইটি, নর্থ ইষ্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সেলেম স্টেট ইউনিভার্সিটি, মেরিমেক কলেজ, কেমব্রীজ কলেজ, ম্যাসাচুচেস্ট ইউনিভার্সিটি (USMASS) এবং পরবর্তীতে ফ্রেমিংহাম স্টেট ইউনিভার্সিটিতে দীর্ঘ ২৩ বছর শিক্ষকতা করেন।

তিনি ওয়াশিংটনে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকেও (World Bank) অর্থনীতিবিদ হিসাবে কাজ করেন এবং ইউএনডিপির কনসালটেন্ট হিসাবেও কাজ করেন। ২০১৬ সালে তিনি ইউএনডিপি ও ফাইনান্স মন্ত্রনালয়ের জন্যে ‘সাউথ সাউথ কর্পোরেশন, ফাইনান্সিং ফর এসডিজি’ এর উপর একটি গবেষণাধর্মী রিপোর্ট প্রকাশ করেন।

তিনি প্রায় পাঁচ বছর রিয়াদে সৌদী আরব সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সৌদী (ইন্ডাস্টিয়েল ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি) ইকোনোমিক এডভাইজার বা কনসালটেন্ট হিসাবে কাজ করেন। সেই সময় তিনি সৌদী আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশী শ্রমিকদের উপর অমানবিক ব্যবহার বন্ধের জন্যে আন্দোলন শুরু করলে কিছু সংখ্যক আদম ব্যবসায়ী  তার বিরোধীতা করলে বিরোধী দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তাকে অভয় দেন এবং তার প্রচেষ্টার ফলে শত শত শ্রমিকের উপর অত্যাচার বন্ধ হয় এবং এর ফলে কোম্পানীগুলো তাদের প্রাপ্য বেতন-ভাতা বা মজুরী দিতে বাধ্য হয়। তাছাড়া ৫০ ডিগ্রী তাপমাত্রার অধিক তাপমাত্রা হলে শ্রমিকদের উন্মোক্ত স্থানে কাজ করা বা বন্ধ ভ্যানগাড়ীতে পরিবহন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। আইন না মানলে ভূক্তভোগী শ্রমিকদের দেশ ‘ ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (WTO) ক্ষতিপূরণ দাবী করতে পারার নীতিও গৃহীত হয়।

বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুবিধ প্রচেষ্টা চালান এবং ১৯৮৮ সালে তার উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে বাংলাদেশের উপর এক ‘শোনানির’ আয়োজন করা হয় যা এরশাদ সরকারের অবস্থানকে দুর্বল করে। তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস, সিনেট ও সরকারে ‘মিস্টার বাংলাদেশ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ম্যাসাচুচেস্ট অঙ্গরাজ্যের গভর্নর তাকে ‘Ambassador of Good will’ উপাধিতে ভুষিত করেন। তবে বাংলাদেশের সামরিক সরকার তাকে চাকরিচ্যূত করেন এবং দেশে আসা নিষিদ্ধ করেন। এমতাবস্থায় তিনি দেশের প্রতি প্রবল মমত্ববোধের কারনে দেশের দূর্যোগে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং তার প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জনগণ বিভিন্ন দূর্যোগে বাংলাদেশকে অনেক অনেক টাকা প্রদান করে এবং বাংলাদেশের দেয়া ঋন মওকুফ করে দেয়। তিনি ১৯৮৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মাইকেল ডুকাকিসের উপদেষ্টা হিসাবে সুনাম অর্জন করেন। তিনি বোস্টনের ‘নিউ ইংল্যাণ্ড বাংলাদেশ সমিতির’ সভাপতি ছিলেন এবং তিনি নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশ সম্মেলন বা ফোবানার একজন প্রতিষ্টাতা সদস্য এবং ১৯৮৯ সালে এর ৩য় সম্মেলনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। (চলবে)

লেখকঃ কায়েস চৌধুরী
কান্ট্রি ডিরেক্টর, কিউভিস টেকনোলোজি, ইউকে

ফেসবুক মন্তব্য
xxx