নিউজটি পড়া হয়েছে 110

চাকুরীতো সবাই করে : অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি

উপমহাদেশের বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদার তার একটি উক্তিতে বলেছিলেন ‘চাকুরীতো সবাই করে, কেউ কেউ স্বপ্নটাকে আকঁড়ে ধরে রাখে’। আমাদের সমাজের প্রায় প্রত্যেক মানুষই চাকুরী করেন এবং অধিকাংশ মানুষই জন্মলগ্ন থেকে চাকুরী পাওয়ার নেশায় মত্ত থাকেন। চাকুরী যেন আমাদের সুখের চাবিকাঠি। এটি যেন আমাদের মূল চালিকাশক্তি। এই চাকুরী দিয়েই আমরা কর্মময় জীবনের শুরু করি এবং জীবনের ইতি টানি। চাকুরী যেন সমাজের সম্মানের জায়গা। চাকুরী পেলেই মুক্তি। প্রাণ ভরে নি:শ্বাস ফেলা। চাকুরীটা কত ছোট আর কত বড় এটি কোন বিষয় নয়। সরকারী চাকুরীজীবি হলে তো আর কথা নেই। মনে হয় সাত খুন মাফ হয়ে যায়।

নতুন প্রজন্ম যখন বড় হতে শুরু করে তখন থেকেই তাদের চাকুরী শব্দটির সাথে পরিচয় ঘটে। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষ চাকুরী পাওয়ার নেশাটি ঢুকিয়ে দেয় তাদের অন্তরে। যুবক-যুবতীরা তাদের পড়াশোনার জীবন শেষ করে পাগলের মত খুঁজতে থাকে চাকুরী। চাকুরীর আবেদন করতে গিয়ে প্রচুর টাকা খরচ করে। আর চাকুরীর পরীক্ষা রাজধানী ঢাকাতে দিতে গিয়ে হাজার হাজার টাকা পকেট থেকে চলে যায়। কেউ মা-বাবার পকেট থেকে, কেউ বা টিউশনি করে, আবার কেউ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। কেউ মেধা দিয়ে, কেউ চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে, আবার কেউ ভিটেমাটি বিক্রি করে চাকুরী পায়। জীবনের তাগিতে প্রতিটা মানুষ এই প্রতিযোগীতায় অংশ গ্রহণ করে। কেউ সফল হয় আবার কেউ ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করে।

জীবন চলার পথে প্রতিটা মানুষের মধ্যে একটা বড় স্বপ্ন কাজ করে। আর এই স্বপ্ন দেখার পালা শুরু হয় what’s your aim in life? এই প্রশ্ন দিয়ে। ছোট বেলা থেকেই সবাই ঠিক করে নেয় বড় হয়ে কে কী হবে। কেউ শিক্ষক, কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ খেলোয়ার, কেউ অভিনেতা, কেউ মডেল, কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ বড় ব্যবসায়ী আরো কত কী। কেউ লক্ষ্য পূরণ করতে পারে আবার কেউ করতে পারে না। অধিকাংশ মানুষের কাছে এই স্বপ্নগুলো বইয়ে পড়া রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
অার্থিক অসচ্ছলতা, সামাজিক ও পারিপাশ্বিক বিভিন্ন অবস্থার কারণে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতী রয়েছে। যারা চাকুরী পাওয়ার প্রত্যাশায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই যুদ্ধে কত যুবক-যুবতী সফল হচ্ছে প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে। আর যখন স্বপ্ন পূরণ হয় না তখনই পরিবারের ও সমাজের হাজারো সমালোচনা শুনতে হয়। আবার অনেকে চাকুরী না পাওয়ার হতাশায় নিজেকে নেশার জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে এবং আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়। জীবনটা শুধুই কী চাকুরীর জন্য?

বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির যুগে অফুরন্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকা স্বত্তেও সবাই কেন ঐ সোনার হরিণের দিকে ছুঁটছে। মানুষের ভিতরের নতুন কিছু সৃষ্টির অসীম ক্ষমতা থাকা স্বত্তেও কেন কাজে লাগাচ্ছে না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয় তারা তাদের নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করছে। প্রত্যেকটা দেশ কারিগরি শিক্ষাকে খুব গুরুত্ব সহকারে দেখে। তারা ছোট বেলা থেকেই যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করে নানান কিছু শিখতে। যে যার মতো করে যে কোন বিষয় শিখতে পারে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি তারা বিভিন্ন রকম জিনিস তৈরি করে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং বেকারত্ব মোচনে অনেক সহযোগীতা করে। হাতের কাজ শিখার মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে পারে। চীন, জাপান সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের কথা উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে। এই সব দেশগুলোর যুবারা ‘চাকুরী পাওয়ার মানসিকতা নয়, চাকুরী দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠছে।

বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের দেশে ঠিক তার উল্টোটা ঘটছে। চাকুরী পাওয়ার মানসিকতা আমাদের রক্তের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও সমাজের প্রত্যেকটা মানুষের কাছে একটাই প্রশ্ন, তুমি কী করছ? আপনার উত্তরটা যদি নেগেটিভ হয় যে আপনি চাকুরী করছেন না। তাহলে আপনার মাথা নিচু করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। আপনার হয়তো বা লজ্জায় মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। কষ্ট করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। আর এই চাকুরী পাওয়ার মানসিকতাকে নোবেল বিজয়ী ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস বলেছেন ‘চাকুরী খোঁজা হলো আধুনিক দাসত্ব’। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী নিয়ে শিক্ষার্থী বলছেন আমাকে একটা চাকরি দেন, বলছেন না যে আমাকে ১০ হাজার ডলার দেন আমার ভাগ্য আমি নিজেই গড়ে তুলবো। তার ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ তিনি তুলে দিচ্ছেন আরেকজনের হাতে। এটা আধুনিক দাসত্ব’। এই মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত। বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের স্বপ্ন পূরণে মনযোগী হওয়া ও কারিগরি শিক্ষায় এগিয়ে আসা দরকার।

পৃথিবীতে হাজার হাজার সফল মানুষ আছেন যারা নিজেদের স্বপ্ন পূরণের জন্য দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রনা, আলোচনা-সমালোচনা, অপমান সবকিছু নিরবে সহ্য করেছেন। জীবনের তাগিতে হয়তো বিভিন্ন চাকুরী ও পেশার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন। পরিবারের চাপে ও সামাজিক স্ট্যাটাস রক্ষার্থে হয়তবা চাকুরীর সাথে আলিঙ্গন করেছেন। কিন্তুু ছোটবেলায় যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্ন থেকে কখনো সরে দাঁড়াননি। শত শত বাধা- বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে গেছেন নিজের লক্ষ্য পূরণে। নিজের ভেতরের স্বপ্নটাকে আঁকড়ে ধরেছেন শক্তভাবে। তারা জানতো মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড় হয়। স্বপ্নই তাদেরকে সাফল্যের পথে নিয়ে যায়। আঁকড়ে ধরা স্বপ্নটাই তাদেরকে পৃথিবীতে স্মরণীয় করে রেখেছে।

উদাহরণ স্বরুপ বলা যেতে পারে, বাংলা চলচ্চিত্রের এক জীবন্ত কিংবদন্তি গাজী মাজাহরুল আনোয়ারের নাম। যিনি ২১ হাজার গানের স্রষ্টা ও বাংলা গানের সর্বকালের সেরা গীতিকারের একজন। তিনি পরিবারের চাপে ভর্তি হয়েছিলেন মেডিকেল কলেজে ডাক্তার হবার জন্য। কিন্তুু তিনি স্বপ্ন দেখতেন ভাল লেখক হওয়ার। ১৯৬২-১৯৬৩ সালে মেডিকেলে পড়ার সময় তিনি প্রথম গান লিখা শুরু করেন। ‘বুঝেছি মনের বনে রং লেগেছে’ এই গান দিয়ে যাত্রা শুরু। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি তার ফুফুর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে লেখালেখি করেন। পরিবার চাইতো ডাক্তার হতে আর উনি চাইতেন লেখালেখি করতে। কিন্তুু ফুফু তাকে বলেছিলেন তোমার মন যা চায় তুমি তা হওয়ার জন্য কাজ করো। তিনি তার আঁকড়ে ধরা স্বপ্নটাকে পূরণ করার জন্য মন থেকে চেষ্টা করেন। তিনি যদি নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব না দিয়ে পরিবারের স্বপ্নকে গুরত্ব দিতেন তাহলে আজ একজন স্বনামধন্য সুরকার, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক হতে পারতেন না। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতির একটি প্রতিষ্ঠান। আঁকড়ে ধরা স্বপ্নটাই উনাকে সমাজে যুগের পর যুগ ধরে বাঁচিয়ে রাখবেন।

ভারতীয় বিজ্ঞানী ও ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একাদশ রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আব্দুল কালাম অতি কষ্টের জীবনেও স্বপ্নকে নিজের মধ্যে খুব আঁকড়ে ধরেছিলেন। তিনি আকাশকে জয় করার জন্য হতে চেয়েছিলেন পাইলট। কিন্তুু ভারতের বিমানবাহিনীর পরীক্ষায় ৯তম হয়েছিলেন। তারা ৮ জনকে নির্বাচন করেছিলেন ।তাই তিনি বাদ পড়ে যান। তবে উনার অদম্য ইচ্ছা শক্তি, বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞান, মেধা, কঠোর পরিশ্রম, শিক্ষার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ এবং স্বপ্নবাজ মানুষ হওয়ার কারণে তিনি শুধু আকাশ না মহাকাশকে জয় করেছিলেন। তিনি হয়েছিলেন মহাকাশ বিজ্ঞানী।

হুমায়ূন আহমেদ বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরর্বতী শ্রেষ্ঠ লেখক। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ছিল তার প্রচন্ড আগ্রহ। এই স্বপ্নটাকে আঁকড়ে ধরার কারণেই তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন অধ্যাপনা জীবন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘তোমাদের জন্য ভালবাসা’ রচনা করেন। তারপর ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তিনি রসায়ন বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার এই জনপ্রিয়তাও তাকে অধ্যাপনায় ধরে রাখতে পারেনি। নিজের ভেতরের আঁকড়ে ধরা স্বপ্নটাকে পূরণ করার জন্য দিনের পর দিন করে গেছেন অক্লান্ত পরিশ্রম। তাইতো তিনি হয়েছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার ও গীতিকার। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমাদৃত। বলা হয় আধুনিক বাংলা কল্প বিজ্ঞানের তিনিই হলেন পথিকৃৎ। অধ্যাপক হিসেবে যত জনপ্রিয় ছিলেন তার চেয়ে কয়েকগুন বেশি জনপ্রিয় ছিলেন তার লেখালেখির জন্য। তিনি মরে গিয়েও সবার মাঝে অমর হয়ে আছেন। এ রকম হাজারো সফল মানুষ আছেন যারা চাকুরী করা স্বত্বেও নিজেদের স্বপ্নগুলোকে আঁকড়ে ধরে সফলতার স্বর্ণ শিখরে উঠেছেন।

সুতরাং জীবনের প্রয়োজনে হয়তো সবার চাকুরী করা উচিত, কিন্তুু যার যেই একান্ত স্বপ্ন সেই স্বপ্ন পূরণে শত কষ্টের মাঝেও এগিয়ে যাওয়া দরকার। যুব সমাজকে উৎসাহ দেওয়া উচিত নিজের মন থেকে তারা যা করতে চায় তা যেন তারা করে। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তাদের উপর কোন স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। চাকুরীর প্রয়োজনেই তারা চাকুরী করবে কিন্তুু নিজের আঁকড়ে ধরা স্বপ্নটাকে সফল করার জন্য তারা যেন ব্রত হয়। তাহলেই আধুনিক সভ্যতা হতাশাগ্রস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসবে । পৃথিবীর সেরা ধনী বিল গেটস এর উক্তি দিয়ে শেষ করবো। তিনি বলেছেন ‘চাকুরী করে কেউ কোন দিন বিলিয়নিয়ার হতে পারেনি, উদ্যোক্তা হও,উদ্যোক্তা’

লেখকঃ অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি
কলামিস্ট, সাংবাদিক

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ফেসবুক মন্তব্য
xxx