নিউজটি পড়া হয়েছে 185

১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলা ও কিছু স্মৃতি : ইকবাল এইচকে খোকন

সময়ের স্রোতধারায় কেটে গেছে ১৩ টি বছর। কিন্তু এতগুলো বছর আগের সেই দমবন্ধ করা অজানা ভয়টা মনে আসলেই শিওরে উঠি আজও। ২০০৫ সাল, বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের বছর, রাজনৈতিক অস্তিরতার পাশাপাশি সবচেয়ে ভয়াবহ আতংকের নাম ছিল জঙ্গি। সারা দেশে জঙ্গি হামলায় রক্ত আর লাশ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক একটি ব্যাপার। কে যে কোন সময় জঙ্গিদের বোমা হামলায় মরে তার কোন ঠিক ঠিকানা ছিলনা। দিনগুলো চরম অজানা আতংক আর দুশ্চিন্তায় কাটতো সবার। তখন গ্রেনেড আর বোমা ছিল খেলনার মতো, যেখানে ইচ্ছা যাকে ইচ্ছা বোমা মেরে, গ্রেনেড মেরে হত্যা ছিল স্বাভাবিক একটি বিষয়। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তখন কি করত সেটা তারা নিজেই হয়ত জানত না।

যাই হোক, আসল কথায় আসি। ২০০৫ সালের ১৬ আগস্ট ব্যবসার কাজে ঢাকা যাই। যখনই ঢাকা যেতাম তখন কেউ না কেউ সাথে থাকতো। কিন্তু কি সমস্যার জন্য যেন সেই দিন একা যেথে হয়েছিল ঢাকা। রাতের ট্রেনে ঢাকা যাই, সকালে যথারীতি হোটেলে রেস্ট নিয়ে দশটার দিকে বের হই। মতিঝিলে ব্যাংকের কাজ শেষ করে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটে গেলাম। সেখানে সকালে ডুকলে বের হতাম রাতে, কাজ শেষ করে। ফেসবুক, হোয়াটসআপ, ইমোর যুগ ছিলনা তখন। শুধু মোবাইলই সঙ্গী। সকাল থেকে কাজ করতে করতে রাত হতো। ১৭ আগস্ট সারাদিন ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটেই কেটেছে সময়। বিকেল নাকি সন্ধ্যার দিকে যেন বাসা থেকে ফোন এলো। সারা দেশে একযোগে বোমা হামলা হয়েছে, অবস্থা ভালনা, আমি ঠিক আছি কিনা এবং কোথায় আছি এসব নিয়া বাসার সবাই চরম অস্থির। বললাম আমি ভাল আছি, নিরাপদে আছি। ফুলবাড়িয়া মার্কেটে আছি। আমার কথা কে শোনে, সবার এক কথা এই মুহুর্তে সিলেট চলে আয়, যেকোন ভাবে। আমি পড়লাম চাপে, একদিকে সব কাজ এলোমেলো অবস্থায় আর অন্যদিকে বাসা থেকে চাপ সিলেট ফেরার জন্য। সব ফেলে রেখে যেনো চলে আসি সেই চাপও বাসা থেকে চলছেই। এদিকে বোমা হামলার খবরটি যখন সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে তখন সবার মাঝে একটা অজানা আতংক দেখা যায়। কতজনের কতো অভিভ্যক্তি। কি করব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সব অগোছালো, অন্যদিকে কিছু সময় পর পর বাসা থেকে ফোন, ব্যাক করছি কিনা। আমার ফোনের অবস্থা দেখে ঢাকার আমার ব্যবসায়ীক পরিচিতজনরা সিলেট ব্যাক করার কথা বলতে লাগল। তারা বলল বাসা থেকে সবাই যাওয়ার জন্য বলছে, চলে যান, পরিস্থিতি ঠিক হইলে চলে আসবেন। এক পর্যায়ে সব মালামাল বক্স করে তাদের কাছেই দিয়ে আসলাম। ট্রান্সপোর্টে পাঠিয়ে দিতে বললাম তাদের। সন্ধ্যার কিছু সময় পর হোটেলে ফিরলাম। ফ্রেশ হয়ে আবার বের হলাম। উদ্দেশ্য কমলাপুর রেলস্টেশন। আমি বরাবরই ট্রেনের জার্নি পছন্দ করি। তাই বাসের দিকে না থাকিয়ে রেলস্টেশনে গেলাম। সিলেটগামী রাতের ট্রেনের টিকেট নেই, পরের দিনের টিকেটও নাই জানালো। শেষে চিরায়িত ঐতিহ্য (অতিরিক্ত সেলামী) দিয়ে একটা টিকেট নিলাম। পরদিন মনে হয় ১১ টার দিকে ছিল ট্রেন, টাইমটা ঠিক মনে নেই। ট্রেন সম্ভবত জয়ন্তিকা ছিল। ঠিক মনে পড়ছেনা না এই মুহুর্তে। যাই হোক, কমলাপুর থেকে ফিরে রাতের খাবার সেরেই হোটেলে ফিরলাম। সব জায়গাতেই দেখলাম টিভির দিকে সবার চোখ। হোটেলের রিসিপশনেও একই অবস্থা। সবার সাথে নিজেও কিছু সময় সেখানে দাড়ালাম। এরপর রুমে ফিরলাম। বাসা থেকে আমাকে ফোনে ফোনে মনিটরিং করা হচ্ছে। বাইরে বের হতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। আমি আর বের হইনি। পরদিন যথারীতি সিলেটে ব্যাক করার জন্য ট্রেনে চাপলাম। সবার হাতেই পত্রিকা, লাল কালিতে লেখা বড় বড় হেডলাইনে চোখ সবার। আর আরেক দিকে কিছু বিশেষজ্ঞ (সব জায়গাতেই কিছু লোক এরকম থাকে) বিষয়টি বিশ্লেষণ করছেন পক্ষে বিপক্ষে উচ্চগলায়। নিশ্চুপ আমিও কান দিয়ে শুনছি আর পত্রিকা হাতে খুটিনাটি সব দেখছি। তবে কেউ যে শান্তিতে আছে সেটা বলা যাবে না। সবাই অজানা আতংকে আছে। আমাদের ট্রেনে/বগিতে যে বোমা/গ্রেনেড হামলা হবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে? মহিলারা খুব বেশি চিন্তিত, বুঝাই যাচ্ছে তাদের চেহারা দেখে। আলোচনা সমালোচনা পুরো ট্রেনেই চলছে, আবার কেউ কেউ বলছে, ভাই আল্লাহ আল্লাহ করেন, ভালভাবে যাথে সিলেট পৌঁছাতে পারি সেই দোয়া করেন। এক সময় ট্রেন ছাড়ল, মানুষের আওয়াজও কমে আসতে লাগল। মজার কথা হচ্ছে বেশ কয়েকজনকে দেখলাম খুব সতর্ক অবস্থান নিতে। টিকেট ছাড়া স্ট্যান্ডিং যাত্রী কাউকেই আমাদের বগিতে দাড়াতে দিচ্ছেন না, আর হুজুর টাইপের কেউ আসলেতো আরো সিরিয়াস অবস্থা। এদিন ট্রেনে অবশ্য স্ট্যান্ডিং টিকেটের যাত্রী কম ছিল। যখন সন্ধ্যা নামল তখন দেখলাম ট্রেনের জানালা সবাই বন্ধ করে দিচ্ছেন। মুখ দিয়ে কেউ না বললেও পরিবেশে বুঝা যাচ্ছে সবাই আতংকে আছে। বগিতে একসময় কথাবার্তাও থেমে গেলো, কেউ ঘুমাচ্ছে আবার কেউ ঝিমুচ্ছে। তবে কোনটার দলেই আমি না। জেগে আছি নিজের মতো করেই। রাত আটটার দিকে সিলেটে এসে থামল আমাদের ট্রেন। স্বস্তির একটা নিশ্বাস নিল সবাই, আবার শুরু হইল একেক জনের একেক কমেন্ট। কেউ বলল ট্রেনেতো নিরাপদেই আসলাম, এখন বাকি আছে বাসা পর্যন্ত নিরাপদে যাওয়া। সেটা হলেই রক্ষা। এদিকে ট্রেন সিলেটে আসার আগ পর্যন্ত কতবার যে বাসা থেকে ফোন রিসিভ করছি মনে নাই। সিলেট নেমেই ফোন দিলাম, বাসা থেকে বলা হইল সিএনজি রিজার্ভ করে বাসায় চলে আয়। আচ্ছা বলে ট্রেন স্টেশন থেকে বের হলাম। টিলাগড় আসার পর মনে হলো বাসায় ফিরলাম। বরাবর এমনই হয়, টিলাগড় আসা মাত্রই মনে হয় বাসায় এসেছি। ১৩ বছর আগের সেই দুঃসহ এবং আতংকের দিন এখন আর নেই। তবে সেই ভয়াবহ দিনগুলো এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় অতীতে ফিরে গেলে। প্রিয় বাংলাদেশটা শান্তিপূর্ণ দেশ হয়ে বেচে থাক সেই স্বপ্ন সব সময়ই দেখি।

লেখকঃ ইকবাল এইচকে খোকন

সিলেট। ১৭ আগস্ট ২০১৮ (শুক্রবার) 

ফেসবুক মন্তব্য
xxx