পরাজিত মেয়র প্রার্থীকেও দেওয়া হউক পদ মর্যাদা – অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্ত ফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬ সালের ছয় দফা দাবী আদায়ে আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণ অভ্যূত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। আর বর্তমানে জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা, সমগ্র বিশ্বের মানবতার রোল মডেল, নারী নেতৃত্বের অগ্রদূত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক ত্যাগ তিতীক্ষা ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে গেছেন। মধ্যম আয়ের দেশে রুপান্তর করেছেন। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পুত্র সন্তানের হাত ধরে তথ্যপ্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। পদ্মা সেতুর মত বড় প্রকল্পে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। যার ঝুলিতে এত বড় বড় সফলতা রয়েছে তার পক্ষেই আরো একটি নতুন ইতিহাস তৈরি করা সম্ভব। এটি মনে হয় পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। আমার মনে হয় এমন একটি ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু উনার ইচ্ছাই পারে ইতিহাস তৈরি করতে। উনার মাধ্যামে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিলেন। এরই মধ্যে নিজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে দল ও সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্বের ক্ষমতাধর সরকার প্রধানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। সুতরাং উনার পক্ষেই রাজনীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভম।

আগামী ৩/৪ মাস পরেই জাতীয় নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুুতি চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য ও কথার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। আবার চলছে বিভিন্ন শহরে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। সেখানেও চলছে প্রতিযোগিতা, নানান অভিযোগ, অর্থের খেলা, ক্ষমতার ব্যবহার ও অপব্যবহার । বাম, ডান, যুক্তফ্রন্ট, নাগরিক সমাজ, সাংস্কৃতিক কর্মী, মিডিয়া, দল ও বিরোধী দল এবং সাধারণ জনগণের সবার একটাই চাওয়া সুষ্ঠু সিটি নির্বাচন। তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে একটা অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে। আর সিটি নির্বাচনে বড় দুই রাজনৈতিক দলেরই প্রাধান্য বেশি। মেয়র প্রার্থীরা জনগণের দ্বারে ঘুরে ঘুরে ভোট চাইছেন।প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ইশতেহার ঘোষণা করছেন জনগণের ভোট পাওয়ার জন্য। অনেকে রাতের ঘুম হারাম করছেন। টাকা পয়সা প্রচুর খরচ করছেন। লিফলেট, ব্যানার ও পোস্টার এ শহরের আনাচে কানাচে ভরিয়ে দিচ্ছেন। মাইকিং করছেন। মিছিল, মিটিং ও পথ সভা করছেন। বিভিন্ন উন্নয়নের প্রচারণা করছেন। আবার এক দল অন্যদলকে কাঁদা ছুড়াছুঁড়ি করছেন। বাম, ডান ও ঐক্যের দলগুলো ভুলের হিসেব-নিকেশ কষছেন। মিডিয়া ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা চুলছেঁড়া বিশ্লেষণ করছেন। টকশোতে চলছে কথার লড়াই। চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। যেন তারা টকশোতে বসেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন। কিন্তুু দেশতো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই চলছে। তারপরও মেয়র প্রার্থীদের একটাই লক্ষ্য যেকোনভাবে মসনদে বসা। মেয়রের চেয়ারটাকে আকঁড়ে ধরা। নিজের মত করে তার ব্যবহার করা। প্রচুর সম্পদের মালিক হওয়া। নিজের আখের গোছানো। জনগণের চাহিদাকে তোয়াক্কা না করা। শুধু ভাসা ভাসা কাজ দিয়ে জনগণকে কাজের ফিরিস্তি দেওয়া। জবাবদিহিতা না থাকা। আইনকে নিজের মত করে ব্যবহার করা। পরাজিত মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ করা। তারা বলে বেড়ান এটা করিনি, ঐটা করিনি। একজনে একটা কাজ শুরু করলে আরেক জনে এসে ঐটা বন্ধ করে দিয়ে আবার নতুনভাবে শুরু করা। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। প্রকৃতপক্ষে জনগণের ভাগ্যে কতটুকু জুটে। কিন্তুু জনগণ এ অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। তারা একজন আরেক জনকে কাঁদা ছুড়াছুঁড়ির রাজনীতি দেখতে চায় না। বিজয়ী ও বিজীত মেয়র প্রার্থীরা একত্রে কাজ করুক সেটাই চায়। তাদের মধ্যে সমন্বয়ের রাজনীতি গড়ে উঠুক। একজনের কাজ আরেক জন এসে আলোচনার মাধ্যমে শেষ করুক। বিজীত মেয়র প্রার্থী ভুলটা তুলে ধরবেন আর বিজয়ী মেয়র সেটা করবেন। এ রকম রাজনীতি জনগণ প্রত্যাশা করে। তবে এটা বাস্তবায়ন করতে হলে বিজীত মেয়র প্রার্থীকেও সুযোগ দেওয়া উচিত। তাহলে সেও তার অপূর্ণ কাজগুলো করতে পারবে।

দেশে প্রায় ১০/১১ টি সিটি কর্পোরেশন রয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনে অনেক প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করে। নিবার্চনে লড়াই এর মাধ্যমে বিজয়ী মেয়র নির্বাচিত হয়। কিন্তুু বিজীত প্রার্থীরা হারের পর জনগণের বাইরে চলে যান। তাদের আর সুযোগ থাকেনা কিছু করার। যিনি বর্তমানে মেয়র থাকেন তাকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হয়। তিনিও জনগণের বাইরে চলে যান। কিন্তুু যদি এ ধরনের একটা সুযোগ তৈরি করা হয় যে নির্বাচনে যিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করবেন তার জন্যও একটা পদ মর্যাদা থাকবে। তাকেও সিটি কর্পোরেশনে বসার সুযোগ করে দেওয়া হবে তাহলে বিজয়ী ও বিজীত দুই জন মিলে মিশে কাজ করতে পারবে। কিছুটা হলেও কাঁদা ছুড়াছুঁড়ি ও একজনের বিরুদ্ধে আরেক জনের অভিযোগ বন্ধ হতে পারে। তখন দুজনকেই জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে। যদি তারা ব্যর্থ হন তাহলে জনগণ তৃতীয় কাউকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। আবার মেয়র পদে ও দ্বিতীয় স্থানে বসার স্বপ্ন থাকলে তাদেরকে অনেক কিছু ভাবতে হবে ওল্টা-পাল্টা করতে গেলে। যা জনগণকে বর্তমানের চেয়ে বেশি কিছু পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিবে। আর জনগণ এটাই প্রত্যাশা করে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গত ১০ বছরে আপনি আপনার সরকারের অনেক বড় বড় সফলতার নজির স্থাপন করেছেন। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে যা হয়নি আপনি তা করেছেন। অনেকে বলে গণতন্ত্র নাই। কত আলোচনা-সমালোচনা হয়। কিন্তুু আপনি সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রেখেই রাষ্ট্র পরিচালনা করে যাচ্ছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে আরেকটি সুযোগ নতুন ইতিহাস তৈরি করার। রাজনীতির ভারসাম্য তৈরি করার। যারা বলে গণতন্ত্র নাই তাদের কাছেও হবে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আপনার একটু সু-নজরে সিটি কর্পোরেশনে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। যিনি মেয়র নির্বাচিত হন তিনি যেমন চেয়ার অলংকৃত করেন তেমনি যিনি মেয়র প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে থাকবেন তার জন্যও একটি পদের ব্যবস্থা করা হউক। যা আপনার পক্ষে সম্ভব। জাতীয় নির্বাচনের আগে এটা হউক আপনার আরেকটি চমক। তাহলে মনে হয়, যারা গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলেন,সম বন্টনের কথা বলেন তাদের জন্যও হবে সঠিক জবাব। আর মেয়র প্রার্থীদের মাঝে কিছুটা হলেও হানাহানি, রেষারেষি ও কাঁদা ছুড়াছুঁড়ি বন্ধ হবে। জনগণ কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনি হচ্ছেন জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা। জনগণের কথা চিন্তা করে আপনি এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করতে পারেন। আপনার মাধ্যমেই হউক বাংলাদেশের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনা। জয় হউক আপনার, জয় হউক মেয়র প্রার্থীদের, জয় হউক জনগণের।

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি
লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক
সিলেট, ২৮ জুলাই ২০১৮

ফেসবুক মন্তব্য
xxx