নিউজটি পড়া হয়েছে 145

আমার বড় বাবুটা : সোহেল রিয়াজুল

আমার বড়বাবুটার কথা প্রতিদিনই মনে পড়ে। শুধু প্রতিদিনই নয়, প্রতি ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে। ঘুম ভাঙ্গার পরে তুমি, ঘুমুতে যাবার সময়েও তুমি, ঘুমঘরে যে স্বপ্ন দেখি সেখানেও তুমি। আমার বাবু। আমার সোনামণি বাবু, আকাশ বাতাস চিন্তা চেতনায় সবখানেই যে আছো তুমি। কর্ম কাজের জন্য প্রায় প্রতিদিনই লম্বা দীর্ঘ সড়ক পথে গাড়ী যাতায়াত করতে হচ্ছে আমাকে। গাড়ির জানালার কাছে বসে বাহিরের প্রকৃতি দেখা আমার এক প্রিয় স্বভাব। সেই সাথে আনমনে কোন স্মৃতি রোমন্থন করা বা মনে মনে কারো সাথে কথা বলা, কোন স্বপ্নের জাল বুনা এ সবই চলতে থাকে তখন। আবার অনেক সময় কোন না কোন হাসির স্মৃতি মনে করে নিজে নিজেই হেসে উঠি। তবে গত চার-পাচ মাস যাবত কেবল বড় বাবুটার কথা ভেবে ভেবে দুচোখ ছাপিয়ে শুধু জল ঝরে। সেই সাথে হৃদয় জুড়ে থাকে কেবল এক বিশাল শূন্যতায় ভরা হাহাকার, আর নীরব নিথর করুন কাতর এক সুদীর্ঘশ্বাস।

মাকে হারিয়েছি গত ৩১ জানুয়ারী ২০১৬, তারও প্রায় দুমাস আগে থেকেই বাকহীন বোধহীন দীর্ঘ অচেতন মা, ছিল আমার কাছে। মাঝে মাঝে শুধু ফ্যালফ্যাল করে অপলক ভাবে কোন একদিকে তাকিয়ে থাকতো মা। বুঝি, তারও হৃদয়ে বয়ে যাচ্ছে জীবনের হাজারো স্মৃতি। বেশ হাসি খুসি মন নিয়েই মা আমার বাসায় এসেছিলো সেপ্টেম্বর ২০১৫ শেষের দিকে। কতো কথা বলেছি মা তোমার সাথে! কতো মান অভিমান জীবনের চাওয়া পাওয়া সুখ দুখ পরিবার পরিজন কতো কথা হতো তোমার সাথে! রঙিন পেন্সিল এ মায়ের একটি ছবি এঁকেছিলাম প্রায় এক বছর আগে। এবার যখন মা এসেছিলো তখন মাকে ছবিটি দেখিয়েছিলাম, কতই না খুশি হয়েছিলে ছবিটি দেখে। তোমার খুব প্রিয় একটি ছবি, যেখানে তোমার গলায় হাত রেখে আমি শুভ্র সাদা পাঞ্জাবি পড়ে স্মিত হাসি দিয়ে তোমার পাশে দাড়িয়ে আছি, ছবিটি দেখতে চাইলে আমি তা তোমাকে দেখালাম। সেই যে সাভারের বাসায় ১২ বছর আগের ছবি যা দেখে তুমি আমি সেই একযুগ আগে ফিরে গিয়েছিলাম তখন।

অবশেষে আর কিছুতেই ধরে রাখতে পারলাম না তোমায়। চলেই গেলে মা? আমি কি কেবলই মা তোমাকে হারালাম? না। আমি অনেক কিছুই হারিয়েছি।কথায় বলে ‘যার মা নাই সে পৃথিবীর সবচে গরীব’। তোমাকে হারিয়ে এখন তো আমি তাই-ই পৃথিবীর সবচে গরীব। কারে জানাবো মনের দুঃখ গো আমার বুক চিড়িয়া – অন্তরে তুষের অনল জ্বলে রইয়া রইয়া।

প্রতি সোমবার আমার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অনেক কাজের ভিড়ে, বাজার শেষে ছোট দুই মেয়ে অধরা আর সরোবরকে যত্ন সহকারে গোসল করানো আমার কাজ ছিল। সেই নভেম্বর মাসের এক সোমবার আব্বার চোখের অপারেশন থাকায়, তাঁকে বিছানায় শুইয়ে চুল দাড়ি গোঁফ সাবধানে শেম্পু করে মুখ সাবান জলে ধুইয়ে, পরে গোসল খানায় নিয়ে আব্বাকে সুন্দর করে গোসল করিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। এরপরে অধরা আর সরোবর, আমার ছোট বাবুদের গোসল করিয়ে দিলাম। হঠাৎ মনে হোল আজ মাকে সুন্দর করে চুলে শ্যাম্পু করে গোসল করিয়ে ঝলমলে বানিয়ে দেই। অনেক সময় ধরে মায়ের মাথায় শ্যাম্পু করছি, এ যেন মায়ের মাথার চুল নয় যেন আমারি ভবিতব্য সাদাচুল ওগুলো। ধীরে ধীরে যখন মায়ের মুখে সাবান ঘষছি ততোক্ষণে মা, আর আমার মা হয়ে থাকেনি, ধীরে ধীরে সে আমার মেয়ে বড় অধরা, বড় সরোবর। ধীরে ধীরে সে আমার মেয়ে বড় অপ্সরা। না তার চেয়েও বড়, যেন আমার আরেকটি বড় মেয়ে। যেন আমার বড় বাবুটা, যাকে আমি হারিয়েছি চিরকালের জন্য। বাবু তুমি সারা জীবন আমাকে ভেবেছ। আমার মরন ব্যাধিতে তোমার সেবা দিয়ে আমায় সারিয়ে তুলেছিলে। তোমার চৈতন্যে আমি ছিলাম তোমার অবচৈতন্যেও আমি ছিলাম। তোমার জীবনের সবশেষের কথাগুলো যা ছিল তার অধিকাংশ কথা জুড়েই যে আমি ছিলাম। মরন দুয়ারে দাঁড়িয়েও করুন স্বরে সবাইকে জিজ্ঞেস করেছিলে- সুয়েল কই? সুয়েল আইছিল? হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভারসাম্যহীন তুমি, পলিকে নির্দেশ দিয়েছিলে ‘আমি বড় বড় রুইমাছ ভুনা করছি সুয়েলের লেইগা লইয়া যা, সুয়েল হুদা ভাত খাইতেছে। তাড়াতাড়ি যা নইলে পরইশ্যা সব খাইয়া ফালাইব’।

মা। ওরে আমার মা। ও আমার বাবুরে! তোমার ভালোবাসার প্রতিদান কি আমি দিতে পেরেছি? মনে হয় না। মিটিবে না সাধ ভালবাসিয়া, ভালবাসিয়া তোমায়’‘ কি জানি! অতি সামান্য হলেও তোমার ইচ্ছে পুরনের চেষ্টা করেছি সব সময়। তোমার মনের মত পুত্রবধু, তোমার মনের মত নাতনীত্রয়, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের পড়াশুনা, সৎ আর সুনামের সাথে চাকুরী। তুমি অসুস্থ হবার একমাস আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ডিজাইন কর্মশালার ক্লাস নেয়া আর জাতীয় জাদুঘরে চিত্রকলা প্রদর্শনী, থাকা খাওয়া চিত্ত বিনোদন, ঘরের ভিতরে তোমার প্রিয় গানের আসর বসানো, কি পাওনি তুমি? জানি কিছুই তোমার পাওয়া হয়নি। সবই বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে। তোমার মননে গায়ে কিছুই লেপটে থাকতে দেয়নি- অসুন্দরেরা।

মা তোমার যা ছিল যাবতীয় অনিন্দ্য সুন্দর সব সাজ, আমি তা সব লুটপাট করে নিয়েছি। তোমার যা ছিল প্রেমপ্রীতি সখ্যতা তা আমি সব গোগ্রাসে গিলে ফেলেছি, তোমার নিকশকালো অন্ধকারের যা ছিল জোনাকি পোকা তার সবগুলোই এখন আমার ঝোলায়। মা তোমার এই বিশাল মনি মানিক্যের সম্ভার আমি কাকে দিবো? তোমার পরবর্তী প্রজন্মের কারা পারবে তোমার অমন শ্রীধারা জলে সাঁতার কাটতে? যারা পারবে তারা ঠিকই জলে নেমে পরেছে সাঁতার কাটতে। আর তোমার রাজ সম্ভারের রাজভোগের উচ্ছিষ্ট টুকুও যারা অর্জন করতে পারে নাই কোনদিন, তারা এখনো ব্যর্থ হাড্ডি লোলুপ কুকুরের মতো আশপাশ দিয়ে ঘোরে আর ঘেও ঘেও করে।

(লেখাটি আমার ব্যাক্তিগত এক বিষণ্ণ গাঁথা, এর বেদনা আর কষ্ট গুলো শুধুই আমার। আর মায়ের যত গুণকীর্তন তা জগতের সবার মায়ের জন্য। সব মা ই সেরা)

সোহেল রিয়াজুল

ঔপন্যাসিক

০২/০৭/২০১৮

ফেসবুক মন্তব্য
xxx