আত্মার আত্মীয় একজন একরাম উদ্দিন আহমদ : মো. আখলাকুর রহমান

আত্মার আত্মীয় একজন একরাম উদ্দিন আহমদ

শেষতক ঘটনা একদিন ঘটেই গেলো। বাড়িতে অবস্হান কালিন সময়ে প্রতিদিনের শুরুতে এক দফা বৈঠক হয়ে যেতো প্রথমে তার বাড়িতে। আর বাড়ি থেকে বেরিয়ে দ্বিতীয় স্টপেজ ছিলো পাশের দোলার বাজারে। বাইরে না গেলে চার যোগ আট, কম করে হলেও রোজ এ মোট বারো ঘন্টা সময়ই কাটতো তার এ দু’ জায়গায়। ২০১০ সালের নভেম্বর মাসের ১৮ তারিখে দোলার বাজার ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় এক জরুরি আলোচনা সভার বৈঠকে তিনি উপস্হিত ছিলেন। হঠাৎ করে দেখা গেলো তিনি অসুস্হ হয়ে পড়েছেন এবং ক্রমশ: শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন। কথা বলার শক্তি পাচ্ছেন না, শরীরে প্রচুর ঘাম হচ্ছে। আর অবশ হয়ে কেবল ডানদিকে কাত হয়ে পড়ছেন। উপস্হিত সবাই তাকে ধরাধরি করে রাখছেন, কেউ হাতপাখা নিয়ে বাতাস করছেন, কেউ কেউ মাথা ও শরীর পানি দিয়ে মুছে দিচ্ছেন। পাশেই তার গাড়ি রাখা ছিলো, ড্রাইভার আসার সাথে সাথেই তাকে গাড়িতে উঠানো হলো। বিকাল তিনটার দিকে তাকে সিলেট শহরের নুরজাহান পলি ক্লিনিকে ভর্তি করানো হলো। আমি এদিন শহরে ছিলাম। সন্ধ্যার পর পরই একরাম ভাই’র ফোন দেখে দ্রুত রিসিভ করলাম। লক্ষ্য করলাম ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা নেই। পরে কানে ভেসে আসলো ক্ষীণ ও আড়ষ্ট কন্ঠে ‘হ্যা…..লো !’ আমারতো সব সময় তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ও আশংকা ছিলো কখন জানি কি হয়ে যায়। তার এ ফোন পেয়েই হৃদয় মন কেঁপে উঠলো। বললাম, আপনার কি হয়েছে? কোনো রকমে বললেন, ‘ধরা খেয়ে গেছি। ‘ তা ও তার স্বভাব সুলভ রসিকতার ঢংয়ে। আরো জানালেন, তার শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে যাচ্ছে। আমি যা বুঝার বুঝে গেলাম। এমন ধরা খাওয়ার শংকার কথা আমি তো কতবার তাকে বলেছি, আর এজন্যেই হয়তো সেদিন তার বোল ভাঙা মুখে ছিলো এমন স্বগোক্তি। কথা না বাড়িয়ে জানতে চাইলাম সাথে কারা আছে। আনা ( তার শ্যালক তোফায়েল আহমদ) কি আছে? বললাম ফোন দেন তার কাছে। কথা হলো আনা’র সাথে, শুনলাম সবকিছু। সে জানালো, অবস্হা স্হিতিশীল নয়, ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। ডাক্তাররা এখন প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন, নানা পরিক্ষা-নিরিক্ষা চলছে। রিপোর্ট গুলো আসার পর প্রফেসর ফয়সল এসে মুল ট্রিটমেন্টের ব্যবস্হা নেবেন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আসছি এ কথা জানিয়ে ফোন রেখে দিলাম। রাতে হাসপাতালে গিয়ে দেখি একরাম ভাই বেডে শুয়ে আছেন। ডান পাশটা পুরোপুরি অবশ। কথাবার্তা একদম জড়ো সড়ো হয়ে এসেছে।তবে আমরা যারা সেখানে আছি সকলের সাথেই কথা বলতে চাইছেন। সারা জীবনের অভ্যাস, তাই এ অবস্হায় ও থামতে চাইছেন না। তার কি হয়েছে তা আমাদের আকারে ইংগিতে সবকিছু বুঝাতে চাইছেন, আর আমরা ও তাকে থামাতে চাইছি, তবে কাজ হচ্ছে না। পরে ডাক্তার এলেন। তিনি শারিরীক পরিক্ষা-নিরিক্ষা ও রিপোর্ট গুলো দেখে মেডিসিন ও ডায়েট চার্টের ডিকটেশন এবং আরো কিছু বিষয় পরিক্ষার জন্যে নির্দেশনা দিলেন। পরে তিনি আমাদের বললেন যে, আপাতত: রক্ষা হয়েছে আর রোগির অবস্হাও খুব বেশি গুরুতর নয়। তার ডান পাশ প্যারালাইজড হয়েছে, এটা প্লাস পয়েন্ট। বাম সাইড হলে বিপর্যয় ঘটে যেতো। তবে এখন ঠিকমতো চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রুষা চললে ধীরে ধীরে রিকভারি হতে পারে। এ নিয়ে এখন থেকে অবশ্যই সাবধান থাকতে হবে, যাতে আবারো শরীরে স্ট্রেস পড়ে দ্বিতীয় বার স্ট্রোক না হয়। তিনি এ ও বললেন অন্তত প্রথম বারের ৭২ ঘন্টার ভেতরে এমন রিক্স থেকেই যায়। এক সপ্তাহের মতো তাকে হাসপাতালে রাখা হলো। সুনির্দিষ্ট চার্ট অনুযায়ি নিয়মিত ঔষধ সেবন, সীমিত পরিমাণে খাবার গ্রহণ ও ফিজিও থেরাপির পরামর্শ নিয়ে তিনি হাসপাতাল ত্যাগ করলেন। চিকিৎসা গ্রহণের সুবিধার্থে বাড়িতে আর নেয়া হলো না। আম্বরখানা এলাকায় একটা বাসা ভাড়া করা তাকে রাখার ব্যবস্হা করা হলো।সেখানে প্রতিদিন ফিজিও থেরাপিষ্ট সকাল বিকাল এসে তাকে থেরাপি দিয়ে যেতো। আমার বাসা ছিলো পাশেই হাউজিং এস্টেট এলাকায়। প্রায় প্রতিদিনই রাতে একবার গিয়ে আমি তার খোঁজ খবর নিতাম। বাসায় সাথে থাকতেন তার স্ত্রী শাহানা। কয়েক জন নিকটাত্মীয় এসে তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে সাহায্য করতো। তার দু’মেয়েই ছিলো যুক্তরাজ্য প্রবাসি। ক’দিনের মধ্যে বড় মেয়ে সুমি স্বপরিবারে বাবার কাছে চলে আসে। কিছু অসুবিধার কারণে ছোট মেয়ে রুমি আসতে পারেনি। মাস খানেকের ভেতরে একরাম ভাইকে প্রথমে ধরাধরি করে বসিয়ে দিলে একা একা তিনি বসতে এবং হুইল চেয়ারে চেপে ঘরের ভিতরে সামান্য সামান্য করে চলাফেরা করতে সক্ষম হয়ে উঠেন। আরো কিছুদিন যাওয়ার পর তিনি লাঠিতে ভর করে একটু একটু হাঁটতে ও শুরু করেন। এ সময়ের ভেতরে তার কথা বলার জড়তা ও অনেকটা কেটে যায়। মাস চার এর মতো একরাম ভাই সিলেটের বাসায় ছিলেন। তারপর গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন।এ সময়ে তার শারিরীক অবস্হার ও উন্নতি হতে থাকে আশাব্যঞ্জক ভাবে। বাড়িতে ফেরার পর শুরু হয় তার নুতন এক জীবন। ঘরের ভেতর লাঠিতে ভর করে এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যেতে পারতেন। অবশ্য হাঁটা চলার ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক ভাবে একজন সহযোগি তার পাশে থাকতে হতো। ডাঙায় আটকানো মাছকে পানিতে ছেড়ে দিলে যা হয়, যেনো আবারো তা শুরু হয়ে গেলো তার বেলায়। দু’এক দিনের ভেতর খবর রটে গেলে ‘পালের গোদা’র খোঁজ খবর নিতে সবাই হয়ে গেলো তার বাড়িমুখি। এলাকার সকলেতো আছেই, বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ও নানা পর্যায়ের মানুষ ছুটে আসতে লাগলেন তার বাড়িতে। এমন অবস্হাটা কমবেশি সিলেটের বাসাতেই শুরু হয়ে গিয়েছিলো। বাড়িতে আসার পর অবস্হা এমন ও দাঁড়ায় যে, রোগিকে বাদ দিয়ে প্রতিদিন অভ্যাগতদের ন্যুনতম সমাদর করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হলো তার পাড়া প্রতিবেশি ও নিকটাত্মীয়দের। কারণতো ছিলো একটাই, তা হলো তার প্রতি মানুষ জনের নিখাঁদ ভালোবাসার টান ও আন্তরিকতা। যত লোকের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন, দেশে-বিদেশে অবস্হানরত সকলেই অন্তত এক বারের জন্যে হলে ও তাকে দেখতে এসেছে পরবর্তি প্রায় তিন বছর সময়ের ভেতরে।(চলবে)

পরবর্তী পর্বঃ–০৪, চোখ রাখুন

লেখকঃ অধ্যক্ষ, জনতা মহাবিদ্যালয়, মঈনপুর # ছাতক, সুনামগঞ্জ।

ফেসবুক মন্তব্য
xxx