নিউজটি পড়া হয়েছে 57

লাল ফ্রক : ফাহাদ আহমেদ।

রনি। ১২ বছরের এক বালক। ছোটবেলায় ১ ছেলে ১ মেয়েসহ স্ত্রীকে ফেলে অন্য নারীর সাথে সংসার গড়েন রনি বাবা। দুই সন্তানকে নিয়ে পথে নামেন রনির মা। মানুষের বাসায় কাজ করা শুরু করেন তিনি। স্বামী তাদেরকে ফেলে চলে গেলেও সন্তানদের ফেলে চলে যেতে পারেন নি তিনি। রনি সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মানুষের কাছ থেকে যেটুকু সাহায্য পায় আর তিনি মানুষের বাসায় বুয়ার কাজ করে যা পান তা দিয়েই ২ বেলা খেয়ে কোনমতে দিন পার করে তারা। 

রমজান মাস প্রায় শেষ হতে চললো, ঈদের বাকি আর মাত্র তিনদিন। রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে রনি। ওর ৪ বছরের ছোট বোনটি ঈদে নতুন কাপড় পড়তে চেয়েছে। অনেক বছর হয়ে গেলো তারা নতুন কাপড় চোখে দেখেনি। এবার রনি ঠিক করেছে যে করেই হোক বোনকে একটি লাল ফ্রক কিনে দিবে। ফ্রকের দাম কত তা সে জানেনা কিন্তু বোনের জন্য একটি নতুন লাল জামা কিনতে হবে এটাই জানে সে।

সারাদিন এর ওর কাছে ঘুরে যা টাকা পেয়েছে সেগুলো গুনলো একবার। তার হাতে এখন সবমিলিয়ে ২৬৫ টাকা আছে। ২৭০ ছিলো কিন্তু একটু আগে ৫টাকার একটি কেক খেয়েছে ক্ষুদা সহ্য করতে না পেরে। অনেক ভেবে চিনতে একটি বড় শপিংমলের সামনে দাড়ালো রনি। একটু আগেও সে এখানে ঢুকতে চেয়েছিলো কিন্তু পারেনি। একটা খাকি কালারের কাপড় পরা বুড়ো দাদু থাকে ঢুকতে দেয় নি। বিশাল কাচের দরজার সামনে যখন দাড়িয়েছিলো ও, তখন দরজার ভেতর থেকে খুব ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে ওর গায়ে লাগে। এমন সময় ঐ বুড়ো দাদু এসে তাকে তাড়িয়ে দেয়। এজন্য অবশ্য বুড়ো দাদুকে সে মনে মনে ধন্যবাদ দিয়েছে। কারন মা বলেছে গায়ে ঠান্ডা বাতাস লাগলে নাকি নিমুনিয়া হয়।

এখন অবশ্য সে ঐ বড় দোকানটায় ঢুকবে না। দোকানের সামনে একজন লোক ভ্যানে করে কাপড় বিক্রী করছে। অনেকগুলো লাল রঙের ফ্রকও আছে তার কাছে। সেখান থেকেই একটা ফ্রক কিনে ফেললো ২৫০ টাকা দিয়ে। দামটা অবশ্য একটু বেশীই মনে হয়েছে কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনা রনির অবশ্য, কারন বোনের জন্য ঈদের কাপড় কিনতে পেরেছে এতেই সে অনেক খুশী। ও ঠিক করেছে রাস্তার ঐপাশের দোকান থেকে কয়েকটা চকলেট কিনে নিয়ে যাবে বোনের জন্য। চকলেট পেলে খুব খুশী হবে ও। অনেক আগে একবার মা দুইটা চকলেট এনেছিলেন ওদের জন্য। মা যে বাসায় কাজ করতো সেখান থেকে দিয়েছে। খুব মিষ্টি ছিলো চকলেটগুলো। মা বলেছিলো, অইগুলো নাকি বিদেশী চকলেট ছিলো। রনি ঠিক করেছে ও বড় হয়ে যখন বিদেশ যাবে তখন বোনের জন্য অনেকগুলো বিদেশী চকলেট আনবে।

এসব চিন্তা করতে করতে ও কখন রাস্তার মাঝে চলে এসেছে সে খেয়াল নেই। হঠাৎ প্রচন্ড এক ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়লো রাস্তার একপাশে। অপর পাশ থেকে আসা একটি প্রাইভেট কার ওকে ধাক্কা দিয়েছে। হাতে ধরে রাখা লাল ফ্রকটা হাত থেকে ছুটে গিয়ে একটা ড্রেনে পড়ে গেলো। প্রাণপণ চেষ্টা করলো ও ফ্রকটা তুলে আন অতে কিন্তু নড়তে পারলো না। খেয়াল করলো রক্তে ওর পুরো শরীর ভিজে গেছে, লাল রঙের তরল। চোখ একটু তুলে দেখলো যে গাড়িটা ওকে ধাক্কা দিয়েছে ওটা আরো দ্রুতগতিতে পালিয়ে যাচ্ছে। গাড়িটা রঙ ওতো লাল। আচ্ছা, সব লাল রঙ কি ভালো হয়না? ছোট্ট রনি আর কিছু চিন্তা করতে পারলো না, চোখ বন্ধ হয়ে আসছে ওর। ওর চোখের সামনে আবছাভাবে ভেসে উঠলো ওর ছোট্ট বোনটি লাল রঙের ফ্রক পরে দৌড়াচ্ছে।

লেখকঃ ফাহাদ আহমেদ।

স্টাফ রিপোর্টার, সিলনিউজ২৪.কম।

ফেসবুক মন্তব্য