নিউজটি পড়া হয়েছে 1256

নবীগঞ্জে ধর্ষনে ব্যর্থ হয়েই বউ-শাশুরীকে হত্যা করে ঘাতক শুভ ও তালেব।

এম. মুজিবুর রহমানঃ নবীগঞ্জে বউ-শাশুড়ি খুনের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। উৎঘাটন হয়েছে হত্যার মুল রহস্য। পুলিশের হাতে আটক জাকারিয়া আহমদে শুভ ও আবু তালেব এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

গতকাল হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শম্পা জাহানের আদালতে ঘাতক জাকারিয়া আহমেদ শুভ ও আবু তালেব এ স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দি দেয়। স্বীকারোক্তিতে তারা গৃহবধু রুমী বেগমকে ধর্ষণ করতে গিয়ে এ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানিয়ে হত্যাকান্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। যে ছুরি দিয়ে শ্বাশুড়ী মালা বেগম ও পুত্রবধূ রুমী বেগমকে হত্যা হয়েছিল শুভ ও তালেবের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সেই ছুরি, তাদের পড়নের রক্তমাখা কাপড় উদ্ধার করেছে পুলিশ।

ঘাতক জাকারিয়া আহমেদ শুভ বাহুবল উপজেলার খাগাউড়া গ্রামের হাফিজুর রহমানের পুত্র ও আবু তালেব নবীগঞ্জ উপজেলার আমতৈল গ্রামের আমির হোসেনের পুত্র। শুভ সাদুল্লাপুর তার নানা মানিক মিয়ার বাড়ি থাকতো। অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত লেখা পড়া করেছে। পরে বখাটেপনা শুরু করে। এলাকায় সে একজন বখাটে যুবক হিসেবে পরিচিত। তার বাবা হাফিজুর স্ত্রীকে হত্যা করে ছিল। পরে বানিয়াচঙ্গ উপজেলায় আরেকটি বিয়ে করে সেখানে বসবাস করছে। আবু তালেব সাদুল্লাপুর গ্রামের মালা বেগমের পাশের বাড়ির ফুরুক মিয়ার বাড়িতে কাজ করতো।

রুমী বেগমের পিতা কুয়েত প্রবাসী সুজন চৌধুরীর বাড়ি এবং তালেবের বাড়ি একই গ্রাম আমতৈল হওয়ায় রুমী বেগমের বাড়িতে আসা যাওয়া করতো। পরিচয়ের সুবাদে এবং বাড়িতে কোন পুরুষ লোক না থাকায় প্রয়োজনী বাজার সদায় তালেবই করে দিত।

গতকাল বিকেল ৫টায় পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিংয়ের মাধ্যমে তাদের দেয়া স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দির লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রায় ৫ ঘন্টা এদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। গতকালই তাদেরকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

প্রেসব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দির লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে বলেন, নিহত রুমী বেগমের লন্ডন প্রবাসী স্বামী আখলাক চৌধুরী গুলজার তার স্ত্রী রুমী বেগমকে মোবাইলের একটি কাভার কিনে দেয়ার জন্য তার এক বন্ধু রিপনকে বলে। রিপন মোবাইলের কাভারটি কিনে গত ১১ মে শুক্রবার তার ভাই জয় এর মাধ্যমে সাদুল্লাপুর প্রেরণ করেন। জয় আসার পথে ওই এলাকায় বসবাসরত বখাটে যুবক জাকারিয়া আহমেদ শুভ এর সাথে দেখা হয়। এ সময় জয়ের সাথে শুভও রুমী বেগমের বাড়ি যায়। সেখানে গিয়ে জয় ঘরে প্রবেশ করলে শুভ বাহিরে অপেক্ষা করে। পরে মোবাইল কাভার পছন্দ না হওয়ায় রুমী সেটা ফিরত দিয়ে দেন। ওই সময় রুমী বেগমের প্রতি কুনজর পড়ে বখাটে যুবক শুভর। ওই বাড়ি থেকে যাবার পথে পাশের বাড়ির ফুরুক মিয়ার কাজের লোক আবু তালেবের সাথে পরিচয় হয় শুভর। আবু তালেব প্রায় সময় রুমী বেগমের বাড়িতে যেত এবং তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিত। সে বিষয়টি জানা ছিল বখাটে শুভর। তাই সে তালেবের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে ওই বাড়িতে প্রবেশের পরিকল্পনা করে। পরদিন শুভ খোজে বের করে তালেবকে নিয়ে বাড়ির পাশে একটি ব্রীজে আড্ডায় বসে। এ সময় শুভ তার মোবাইলে থাকা পর্ণূগ্রাফি ছবি ও ভিডিও দেখায়। এসময় শুভ প্রবাসীর স্ত্রী রুমী বেগমকে ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ করে তালেবকে। এতে তালেব রাজী হলে ব্রীজে বসেই দু’জনে পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন গত ১৩ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে এরা মালা বেগমের বাড়িতে যায়। পূর্ব পরিচিত হিসেবে তালেব গেইটে গিয়ে ডাক দিলে মালা বেগম গেইট খুলে দেন। এ সময় শুভকে দেখতে পেয়ে তিনি শুভকে ঘরে প্রবেশে বাধা দেন। এ সময় কথা বার্তার এক পর্যায়ে তালেব তার হাতের ছোরা দিয়ে মালা বেগমকে আঘাত করে। এতে মালা চিৎকার দিয়ে দৌড়ে একটি ঘরে একটি রুমে প্রবেশ করলে ওড়না দিয়ে বেধে উপর্যুপরী ছুরিকাঘাতে মালা বেগমকে হত্যা করে। এদিকে মালা বেগমের চিৎকার শুনে তার পুত্রবধু রুমী বেগম শয়ন কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসলে শুভ ছুরি দিয়ে তাকে আঘাত করে। এ সময় রুমী চিৎকার দিয়ে বাঁচার জন্য দৌড় দিয়ে কিছু দুর গিয়ে পড়ে গেলে শুভ ও তালেব উপর্যুপরী ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। ঘটনার সময় পার্শ্ববর্তী ইউপি চেয়ারম্যান আলী আহমেদ মুসার বাড়িতে গ্রামের লোকজন বৈঠকে ছিলেন। মালা এবং রুমীর চিৎকার শুনতে পেরে লোকজন আসতে শুরু করলে তালেব ও শুভ দ্রুত পালিয়ে যায়। যাবার সময় শুভ পাশের খালে রক্তমাখা কাপড় ও ছোরা ফেলে নানার বাড়ি চলে যায়। এদিকে তালেবও তার মালিক ফুরুক মিয়ার বাড়িতে গিয়ে গোয়াল ঘরে প্রবেশ করে রক্তমাখা কাপড় পরিবর্তন করে।

প্রেস ব্রিফিংকালে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আ স ম শামছুর রহমান ভূইয়া, নবীগঞ্জ-বাহুবল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার পারভেজ আলম চৌধুরী, সহকারি পুলিশ সুপার নাজিম উদ্দিন, ডিআই-১ মাহবুবুর রহমান, ডিবির ওসি শাহ আলমসহ পুলিশের কর্তকর্তাগণ।

উল্লেখ্য, গত ১৩ মে রবিবার রাত প্রায় ১১ টার দিকে উপজেলার কুর্শি ইউনিয়নের সাদুল্লাহ্ পুর গ্রামের লন্ডন প্রবাসী আখলাক চৌধুরী (গুলজার) এর মাতা মালা বেগম। (৫০)ও স্ত্রী রুমি বেগম(২১)কে নিজ বাড়ীতেই নির্মমভাবে হত্যা করে দূর্বৃত্তরা। এঘটনায় ঘাতক শুভ ও তালেব সহ ৫জনকে তাৎক্ষনিক অভিযান চালিয়ে পুলিশ গ্রেফতার করলে পরে ৩জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে স্থানীয় চেয়ারম্যান আলী আহমেদ মুসার জিম্মায় ছেড়ে দেয় পুলিশ।
পরে ঘাতক শুভ ও তালেবের স্বীকারোক্তিতে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছোরা ও রক্তমাখা ভিজে কাপড় উদ্ধার করে পুলিশ।

এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনায় নবীগঞ্জ সহ দেশ বিদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ব্যাপক তুলপাড় চলছে।

এদিকে পুলিশের তড়িৎ পদক্ষেপে হত্যাকান্ডের মুটিভ উদঘাটনে মামলার বাদী নিহত রুমির বড় ভাই পল্লী চিকিৎসক নজরুল ইসলাম চৌধুরী সন্তোষ প্রকাশ করে ঘাতকদের ফাঁসি দাবী করেন।

ফেসবুক মন্তব্য
xxx