নিউজটি পড়া হয়েছে 107

নিরাপদ মানুষ চাই : অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি

বাঙালির বিজয়। বিজয়ের ৪৬ বছর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুৃক্তি যুদ্ধা, মা-বোনের ইজ্জত ও লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছিলাম। কিন্তু বিজয়ের ৪৬ বছর পরেও আমরা সত্যিকার অর্থেই কী স্বাধীন এবং কতটুকু নিরাপদ। আমরা কী স্বাধীন ও নিরাপদের সহিত চলতে পারি! আমাদের আশেপাশের মানুষরা কী নিরাপদ! নাকি নিরাপত্তাহীনতার চাদরে ডাকা! শুধু বাংলা নয়, সমগ্র পৃথিবীতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক উন্নয়নে নিরাপদ মানুষের কোন বিকল্প নেই। নিরাপদ মানুষ মানেই অাস্তার জায়গা। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জায়গা। অবলম্বনের জায়গা। কিন্তু আমরা কী সত্যিকার অর্থেই মানুষ হয়ে উঠতে পারছি। অথচ পবিত্র কুরআনে আছে, মানুষ আশরাফুল মাখলোকাত অর্থাৎ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে মানুষই একমাত্র জীব যার বিবেক-বুদ্ধি রয়েছে। মানুষই ভালকে ভাল আর খারাপকে খারাপ বুঝতে পারে। মানুষ তার চিন্তা চেতনাকে কাজে লাগাতে পারে। মানুষের মধ্যে উপলব্দি করার ক্ষমতা রয়েছে। মানুষ তার নিজের শ্রম, মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। মরে গিয়েও নিজের নামকে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখে যেতে পারে। ব্যর্থতার বুকে সফলতার চিহ্ন একে দিতে পারে। মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। আল্লাহ এবং ঈশ্বর প্রদত্ত মানুষ অসীম ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তুু প্রাণীদের মধ্যে এই ক্ষমতাগুলো নেই। তারা মানুষের মত জীবনটাকে উপভোগ করতে পারে না। পারে না নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলোকে পূর্ণ করতে। জন্ম আর মৃত্যুর জন্যই যেন তাদের জীবন।বহুমাত্রিক প্রাণি জগতের মধ্যে মানুষের বিবর্তনের বিশাল ইতিহাস ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে। মানুষ ধাপে ধাপে প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ অতিক্রম করে এখন অাধুনিক যুগ পার করছে। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানুষের আচার-আচরনের মধ্যে নানা রকমের পরিবর্তন দেখা যায়। প্রশ্ন তৈরি হয় সত্যিকার অর্থে আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি কিনা। পৃথিবীতে প্রাচীন যুগ শুরু হয় সম্ভবত ৬৫০ খিস্ট্রপূর্ব থেকে। এই যুগের স্থায়ীত্বকাল ছিল ১২০০ খিস্ট্রাব্দ পর্যন্ত। এ যুগের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকম আচার-আচারণ লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন যুগের মানুষ ছিল হিংস্র, হাত পায়ের নখ গুলো ছিল পশুর মত বড় বড়, তারা এসব ব্যবহার করত বিভিন্ন কাজে যেমন খাবার খেতে, পশু পাখি কাটতে। তারা গুহায় (গর্তে) বাস করতো অন্য হিংস্র জানোয়ারের থাবা থেকে বাঁচার জন্যে। অবাধ যৌনাচার ছিল তাদের মাঝে।পোষাকগুলো ছিল ছোট্ট ছোট্ট। মানুষের এই পোষাকগুলো পশুর চামড়া, গাছের ছাল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হতো। প্রাচীন যুগ শেষে মানুষ মধ্য যুগে পদার্পণ করে। মধ্য যুগ ১২০১ খিস্ট্রাব্দ থেকে শুরু হয়ে ১৮০০ খিস্ট্রাব্দ পর্যন্ত চলে। এ যুগে মানুষের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়।এ যুগের মানুষ গুলো শান্ত শিষ্ট, হাত পায়ের নখগুলো ছিল ছোট্ট ছোট্ট, তারা যৌথভাবে বসবাস করত বিরোধী পক্ষের (জমিদার) হাত থেকে বাঁচার জন্যে। পোষাকগুলো ছিল ঢিলে ঢালা বড় বড়। সুষ্ঠু, সুন্দর, বিধি নিয়মের যৌনাচার ছিল এ যুগের মানুষের মাঝে। মধ্য যুগের মানুষ তাদের শক্তি সাহসীকতা ব্যবহার করত নব কিছু সৃষ্টিতে জীবনের প্রয়োজনে। মানুষে মানুষে চমৎকার সেতুবন্ধন ছিল। মধ্য যুগের গন্ডি পেরিয়ে মানুষের পথ চলা শুরু হয় আধুনিক বা বর্তমান যুগে। আধুনিক যুগ শুরু হয় ১৮০১ খিস্ট্রাব্দে। আধুনিক যুগে এসে মানুষের চিন্তা-চেতনায় আধুনিকতার ছুঁয়া লাগে। মানুষের ব্যবহারে অামূল পরিবর্তন আসে। এ যুগের মানুষ প্রাচীন ও মধ্য যুগ থেকে পুরোপুরি আলাদা। বর্তমানে মানুষগুলো তাদের শক্তি সাহসীকতা ব্যবহার করে অন্যকে ঠকাতে, মানবতা ধ্বংসে, অন্যের ক্ষতিসাধনে। প্রাচীন যুগের মতই মানুষ বড় বড় নখ রাখে ফ্যাশন হিসেবে, কখনো বা নারী পুরুষের অথবা পুরুষ নারীর সতিত্ব ছিনিয়ে নিতে। বর্তমানে মানুষ প্রাচীন যুগের মত গর্তে বা গুহায় বসবাস করে বাবা-মা, দাদা-দাদি ও পরিবারের ব্যয় থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্যে। অবশ্য প্রাচীন যুগে গুহা ছিল পাহাড়ের গর্ত, বর্তমানে তা শহরেরছোট্ট ছোট্ট রুম। বর্তমানে মানুষ এক কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। মানুষের মাঝে হিংস্রতা ব্যাপক আকারে ধারণ করেছে। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে পারেনা। মানুষ স্বার্থের জন্য মারামারি কাটাকাটিতে লিপ্ত হচ্ছে। মানুষের মাঝে যৌনতা চরণভাবে দেখা দিয়েছে। যুব সমাজ পর্ণো গ্রাফিতে আকৃষ্ট হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে স্কুলগামী মেয়েদের উপর। স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা প্রতিনিয়ত ধর্ষনের শিকার হচ্ছে। মাঝে মাঝে দেখা যায় নিজের আপন মানুষের (চাচা, মামা, খালো, ভাই, সৎ ভাই, সৎ বাবা, পাড়া -প্রতিবেশী, অফিসের বস, ধনীর দুলাল ও বন্ধু) কাছে ধর্ষিত হচ্ছে মেয়েরা। কোন জায়গাই যেন তাদের জন্য নিরাপদ নয়। আজকাল মানুষ লোভের পাল্লায় পড়ে ছেলে বাবা-মাকে, ভাই ভাইকে, ভাই বোনকে, বোন ভাইকে, চাচা ভাতিজাকে, ভাতিজা চাচাকে, ব্ন্ধু ব্ন্ধুকে, কলিগ কলিগকে, প্রেমিক প্রেমিকাকে, প্রেমিকা প্রেমিককে মেরে ফেলে। কে কার শত্রু বুঝা বড় দায়। আর রাজনীতির কথা বলতে গেলে সেখানে যেন প্রতিযোগিতা চলে কে কাকে ঠকাবে। অফিস আদালতগুলো যেন দুর্নীতির আখড়া। প্রশাসন যেখানে সহযোগীতার হাত বাড়াবে সেখানে তারা শাসকের ভূমিকা পালন করে। সাধারণ মানুষ যেখানে স্বস্তির জায়গা খুঁজে সেখানে তারা প্রায়ই নির্যাতনের স্বীকার হয়। শিক্ষা হচ্ছে জাতির মেরুদন্ড আর শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষা গুরু। আজ সেই শিক্ষকরাই ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে নিরাপদ নয়। প্রায় সময়ই তারা লাঞ্চিত ও নির্যাতিত হচ্ছেন।  সাংস্কিতিক কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। সংবাদপত্র হচ্ছে জাতির বিবেক আর সাংবাদিকরা হচ্ছে তার প্রাণ। সত্য প্রকাশ যাদের কাজ আজ তারাই সত্য প্রকাশে হচ্ছেন বলির পাঠা। বাসায় নিরাপদে পৌঁছবে কিনা তার নিশ্চায়তা নেই। মানুষ যে খাদ্য খেয়ে বাঁচার স্বপ্ন খুঁজে সেটি যেন মানুষের মরণ ফাঁদ। ফরমালিন যুক্ত খাবার খেয়ে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা লাভের আশায় মানুষকে ঠকাচ্ছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষের আগের মত স্নেহ, মমতা, অান্তরিকতা, ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ যেন লোপ পাচ্ছে। মানুষের মনুষ্যত্ববোধ দিনের পর দিন বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। মানুষ মানুষকে মানুষ মনে করে না। বর্তমানে মানুষ কেউ কারো কাছে গিয়ে স্তত্বিবোধ করে না। মানুষের মাঝে সন্দেহ প্রবণতা কাজ করে। মানুষ হায় হুতাশ করে কাকে সে বিশ্বাস করবে। কার কাছে সে নিরাপদ। কে তাকে নিশ্চয়তা দেবে। নাকি নিশ্চয়তা ব্যক্তিটিই তাকে ঠকাবে। এ রকম হাজারো প্রশ্ন ঘোরপাক খায়। দিনে দিনে নিরাপদ মানুষের অভাব দেখা দিচ্ছে। আধুনিক যুগ কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। নাকি নতুন প্রজন্মের জন্য ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে। তবে সৎ ও নিরাপদ ব্যক্তি যে নাই তা নয় কিন্তুু তারা সংখ্যায় কম। কম সংখ্যক দিয়ে অধিক সংখ্যক মানুষকে সার্পোট দেওয়া কষ্টকর। নিরাপদ সড়ক চাই স্লোগানে সারা বাংলায় আমরা যেভাবে জাগরণ তৈরি করি ঠিক তেমনি ভাবে নিরাপদ মানুষ চাই স্লোগানে বাংলার আনাচে কানাচে জাগরণ তৈরি করা উচিত। তাহলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষ স্তত্বি পাবে। মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে। মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি হবে।  মানুষ সবাইকে নিরাপদ ভাবতে শুরু করবে। সামাজিক কলহ থেকে মুক্ত হবো। অন্যের জন্যে নিরাপদ মানুষ তৈরি হওয়ার চর্চা ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলায়। সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই এটিই যেন বাস্তবে রুপ নেয়। তাহলে আল্লাহ এবং ঈশ্বরের মানুষ সৃষ্টির স্বার্থকতা থাকবে। নিরাপদ মানুষে পরিপূর্ণ হউক সারা বাংলা । আর ‘নিরাপদ মানুষ চাই’ স্লোগানে মুখরিত হউক গ্রাম-গঞ্জ, শহর-বন্দর, জেলা-উপজেলা, থানা, অফিস-আদালত, নামি-দামি হোটেলের গোল-টেবিল বৈঠক। তাহলে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে। মানুষ স্বস্থির নিঃ শ্বাস  ফেলবে।

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী রনি
কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
ফেসবুক মন্তব্য