নিউজটি পড়া হয়েছে 132

বিদ্যালোকে মঈনপুরের যাত্রাধ্বনি : মোঃ আখলাকুর রহমান

বিদ্যালোকে মঈনপুরের যাত্রাধ্বনি 
মোঃ আখলাকুর রহমান

আরজদ আলী স্যারের গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি ছিলো না। তাই এলাকাবাসির অনুরোধে ছৈলার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি এগিয়ে এসে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে সাময়িক ভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন তিনি বৃটেনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এদিকে আরজদ আলী ও মৌলানা নুরুল হক সহকারি শিক্ষক হিসেবে কার্যরত থাকলেন। পরে এ বছরই নুতন গ্র্যাজুয়েশন ধারী ভাতগাঁওয়ের আবুল হাসনাত মো. আব্দুল হাইকে স্থায়ীভাবে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হলে সিরাজ চৌধুরি তার হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করে লন্ডনে চলে যান। স্কুলের সাংগঠনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি মরহুম আরজদ আলী গ্রামের অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজগুলোতেও মনোযোগি ছিলেন। আরজদ আলী তার নিজস্ব জমিতে এলাকাবাসির অনুরোধে স্থানীয় ইউনিয়ন অফিসের পাকা ভবন নির্মাণ করেন। এক্ষেত্রে এলাকাবাসি আংশিক ভাবে আর্থিক সহযোগিতা করলেও সিংহ ভাগ খরচ তিনি নিজে বহন করেন। একই ভাবে মঈনপুর পোষ্ট অফিসকে সাব পোষ্ট অফিসে উন্নীত করার প্রয়োজনে এর পাকা ঘর নির্মাণের পূর্ব শর্ত পূরণের জন্যে একই ভাবে তা ও তিনি করে দেন। এ দু’টো কাজে মৌলানা স্যার ছিলেন তার ছায়া সংগী। পরবর্তিতে তিনি এ সাব পোষ্ট অফিসের পোষ্ট মাষ্টার হিসেবে ও দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন। মঈনপুর হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠা লগ্নে বেশ কিছু বিদগ্ধ শিক্ষক গণের সমাবেশ ঘটেছিলো এর অরুণ আভা ছড়ানো উর্বর ও দীপ্তিময় অংগনে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন উজানীগাঁওয়ের আব্দুস সাত্তার সাত্তার (রাজাকার সাত্তার নন), ডুংরিয়ার আমির উদ্দিন, খুরমার গোপিকা রঞ্জন, হায়দর পুরের আজহার আলী, জামাল গঞ্জের শচীন্দ্র কুমার দেব, ছৈলার সফিকুর রহমান, বারগোপীর পিযুষ কান্তি পাল প্রমুখ ক্রমান্বয়ে সহকারি শিক্ষক পদে যোগ দেন। প্রথম তিন জন বাদে ১৯৬৮ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর আমি বাকি সকলকেই শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। হাসনাত স্যার ১৯৬৩ সালে যোগদানের পর থেকে একটানা ৫ বছর অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ছিলেন অবিবাহিত। মূলতঃ বিয়ে পর্ব সম্পাদন ও সংসার জীবনের সূচনা ঘটাতেই তিনি চলে গিয়েছিলেন। স্বপদে কর্মরত থেকে তিনি তা করতেও পারতেন। কিন্তু সমস্যা ছিলো ভিন্ন। কারণ তার হবু স্ত্রী ছিলেন মঈনপুর স্কুলেরই প্রথম দিকের ছাত্রী। হয়তো এ কারণেই তার স্থান ত্যাগ করার প্রয়োজন পড়েছিলো।মরহুম হাসনাত চলে যাওয়ার পর জনপ্রিয় শিক্ষক সফিকুর রহমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৬৯ সালে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ কবি রিয়াছত আলী ঢাকা ওয়েষ্ট এন্ড হাইস্কুলের সহকারি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সকলের অনুরোধে স্ব-গ্রামের এ শিক্ষাংগণের হাল ধরেন। ভাগ্যের নির্মম কষাঘাতে ১৯৭১ সালে বিজয়ের প্রাক্কালে ১২ ডিসেম্বর তারিখে নিতান্তই এক অপঘাতে তার মৃত্যু হলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে সাময়িক শূন্যতা তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের শেষ ভাগে বিশ্বনাথের মঈনুল ইসলাম প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন। এ সময় মুক্তিযুদ্ধ ফেরত কতিপয় ছাত্রের সাথে মতবিরোধে (অটো প্রমোশন দাবিতে) তার মতদ্বৈততা সৃষ্টি হলে তিনি পদত্যাগ করে চলে যান। এরপর সৈয়দের গাঁও নিবাসী সৈয়দ মাহবুব আলী ১৯৭৩ সালের প্রথম ভাগে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি প্রায় দু’বছর এ পদে বহাল থাকার পর ’৭৪ সালের শেষ দিকে চা’বাগান ব্যবস্থাপনার চাকুরি পেয়ে পদত্যাগ করে চলে যান। এরপর তার স্থলাভিষিক্ত হন মো. আব্দুল কাইয়ূম। তিনিও দু’ বছরের মতো দায়িত্ব রত ছিলেন। পরে আইন পেশার সনদ লাভ করে তিনি সুনামগঞ্জ বারে যোগ দেন। এ সময় সহকারি শিক্ষক বদরুজ্জামান চৌধুরি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৯৭৭ সালে মো. শহীদুল ইসলামের প্রধান শিক্ষক পদে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু শহীদুল ইসলামের স্থায়িত্বকাল এক বছরের ও কম ছিলো। তিনি চলে গেলে মো. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরি প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন ১৯৭৭ সালের শেষদিকে। তিনি প্রায় দু’বছর পর সিলেট শহরের একটা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করে চলে গেলে তার ছেড়ে দেয়া পদে স্কুলের সাবেক সিনিয়র শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র দত্ত ১৯৭৯ সালের শেষ প্রান্তে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। তিনি প্রায় দু’বছরের মতো দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তার স্থলাভিষিক্ত হন মো. ফযলুল হক যিনি দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে এক নাগাড়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। মঈনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের যাত্রাপথে মো. ফযলুল হকের দায়িত্ব পালন কালই দীর্ঘতম। স্কুলের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে তিনিই হলেন সবচেয়ে সফল প্রধান শিক্ষক। চাকুরি জীবনের পুরো সময়টাই তিনি কাটিয়েছেন মঈনপুরে। প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পূর্বে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (এম এ ইন এড) সমাপ্ত করেন। এর আগে কবি রিয়াছত আলী শুধুমাত্র এম এ ইন এড ডিগ্রিধারি ছিলেন। মঈনপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাল অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু এর সিংহভাগ সময়ই কেটেছে ফযলুল হকের দক্ষ নেতৃত্বে। প্রথম দিকে প্রধান শিক্ষক পদে ঘন ঘন রদবদল তথা ১৬ বছরে ১৩ বার পরিবর্তন এসেছে এ পদে। যে কারণে প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষতা অর্জনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব ছিলো না বোধগম্য কারণেই। ফযলুল হক একাধারে প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে মনোযোগি ছিলেন স্কুলের একাডেমিক ব্যুৎপত্তি অর্জন সহ সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ডকে এগিয়ে নেয়ার কাজে। তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ জেলার অধিবাসি। কিন্তু দীর্ঘ কর্মজীবনের সুবাদে তিনি মঈনপুর এলাকায়ই অধিকতর পরিচিত ছিলেন নিজের জন্মস্থান থেকে। এ এলাকার আপামর জনসাধারণের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহমর্মিতা সবই পেয়েছিলেন তিনি। প্রায় তিন যুগ সময়ে তার উৎপাদনের ব্যপ্তি সম্পর্কে বর্ণনা করাই অপ্রয়োজনীয়। এলাকাটি পুরো দু’প্রজন্মের পড়ুয়া সকলেই ছিলো তার ছাত্র-ছাত্রী। একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের এ রকম বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘতর কর্মধারা সৃষ্টির ইতিহাস নিতান্তই এক বিরল ঘটনা। ফযলুল হকের অবসর গ্রহণের পর এর আগে থেকে নিয়োগ প্রাপ্ত সহকারি প্রধান শিক্ষক আবু রায়হান খাঁনকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি তার পূর্বসুরির উত্তরাধিকার বহন করেই সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

(চলবে) পরবর্তি পর্ব-৫, আগামীকাল।

ফেসবুক মন্তব্য
xxx