নিউজটি পড়া হয়েছে 96

বিদ্যালোকে মঈনপুরের যাত্রাধ্বনি : মোঃ আখলাকুর রহমান

 

বিদ্যালোকে মঈনপুরের যাত্রাধ্বনি: পর্ব-৩
মো. আখলাকুর রহমান

সর্বশেষ বর্তমান প্রাইমারি স্কুল ভবনের স্থানেই আবারো ঢেউটিনের ছাউনি যুক্ত স্কুল গৃহ তৈরি করা হলো। ছাবাল পীর এবার এম.ই পাশ দু’জন শিক্ষক নিয়ে এলেন। প্রথম জন ওসমান পুরের সৈয়দ এরশাদ আলী যিনি শিক্ষক-ট্রেনিং(গুরু প্রশিক্ষণ) প্রাপ্ত ছিলেন এবং অপরজন সিংগের কাঁচ গ্রামের সমুজ মিয়া চৌধুরি। ১৯২৫ সালের মধ্যেই স্কুলটা কেন্দ্র স্কুলের মর্যাদা লাভ করে। একই সালে লোকেল বোর্ড পরিচালিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় আরজদ আলী অংশগ্রহণ করেন প্রথম বারের মতো। এতে তিনি প্রথম ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হয়ে সে কালের মর্যাদাপূর্ণ ‘হাজী মো. মহসিন বৃত্তি’ লাভ করে সৃষ্টি করলেন গৌরবোদীপ্ত এক অধ্যায়ের। মঈনপুর স্কুলের খ্যাতি ধীরে ধীরে ডালপালা গজাতে শুরু করে। স্কুলের ফলো আপ পর্যবেক্ষণে ১৯২৬ সালে আঞ্চলিক স্কুল ইন্সপেক্টর বদরুজ্জামান চৌধুরি এবংসুরমা ভেলী ও হিল ট্র্যাক্টস অঞ্চল বিভাগের ইন্সপেক্টর বাবু সতীশ চন্দ্র রায়, (এমএ – লন্ডন) কে নিয়ে স্কুল পরিদর্শনে আসেন। সে আমলে এ পর্যায়ের একজন ইন্সপেক্টরের স্কুল পরিদর্শনে আসা ছিলো যেনো এক কল্পনাতীত ঘটনা। তখন তারা এখানে এসে লব্ধ প্রতিষ্ঠিত এ স্কুলের শিক্ষাদান পদ্ধতি ও কো-কারিকুলাম কার্যক্রম এবং স্থানীয়দের সহযোগিতা ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তারা তখন স্কুলের জন্যে বেশ কিছু মূল্যবান বই উপহার দেন এবং পরিদর্শন বইয়ে সতীশ বাবু মন্তব্য করেন যে, এখানে অনায়াসে একটা এমই স্কুল চলতে পারে। তাদের ইতিবাচক রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯২৭ সালে মধ্যবঙ্গ স্কুলে উন্নীত হয় মঈনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। উত্তরণের প্রথম ধাপেই এম.ই স্কুল করা হয়নি এ কারণে যে, এর তিন মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে খুরমা ও লাকেশ্বরে দু’টো এম.ই স্কুল আগে থেকেই চালু ছিলো। বিরাজমান নীতিমালা অনুযায়ী এতো কম দূরত্বে একাধিক এমই স্কুল স্থাপনের নিয়ম তখন ছিলো না। অবশ্য এরই মধ্যে আসামে নিউ স্কীম জুনিয়র মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। সিলেটের এক কৃতি শিক্ষাবিদ আবু নছর মো. অহিদ এর প্রস্তাবানুসারে তা সরকারি অনুমোদন লাভ করেছিলো। ১৯২৮ সালে তাই বাংলা, ইংরেজি, আরবী ও ফার্সি ভাষার সমন্বিত নিউ স্কীম জুনিয়র মাদ্রাসায় উন্নীত হয় মঈনপুর মধ্যবঙ্গ স্কুল। এতে প্রথম যোগদান করেন তেলিকোণার মৌলবী তাহির আলী। তিনিও অবৈতনিক ভাবে প্রতিনিয়ত বদল হওয়া শিক্ষকদের নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছিলেন এ জুনিয়র মাদ্রাসাকে। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, যেখানে তখন অনুমোদিত প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকদের বেতন ছিলো মাসিক ১২ টাকা করে, তখন প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি প্রাপ্ত এ মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন ছিলো এর অর্ধেক অর্থাৎ মাত্র মাত্র ৬ টাকা থেকে স্তর ভেদে ১০ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষা বিদ্বেষের কারণে তখন এসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা ভর্তি হতো না। তাই ছাত্রসংখ্যা ছিলো নিতান্তই কম। পাশাপাশি ছাত্র বেতন আদায়ের হার ছিলো, নিম্ন শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত আট আনা এবং চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত চৌদ্দ আনা মাত্র। প্রথম সাত বছর তা এম ই স্কুলে উন্নীত হতে পারেনি। ১৯৩৩ সালে আসাম প্রদেশের ডিপুটি স্কুল ইন্সপেক্টর আব্দুল ওয়াহেদ খুরমা ও লাকেশ্বর স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে সেগুলোর পরিচালনা কমিটির সাথে বৈঠক করেন। তিনি তাদের কাছে জানতে চান যে, মঈনপুরে নুতন এম.ই স্কুল প্রতিষ্ঠা পেলে তাদের ছাত্র-শিক্ষক প্রাপ্তি, স্থানীয় সহযোগিতা ইত্যাদি ব্যাপারে কোনো রকম অসুবিধা হবে কি না। এ সময় তারা পরিস্কার ভাবেই তাদের অনাপত্তির কথা জানিয়ে দেন। এ পরিদর্শন কাজের পরের বৎসর ১৯৩৪ সাল থেকে মঈনপুর এম.ই স্কুল স্বীকৃতি লাভ করে এবং এর সরকারি মঞ্জুরী তখন ৩০ টাকায় বর্ধিত হয়। ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল তারিখে মঈনপুরের সুসন্তান মরহুম আরজদ আলী স্কুলের হেড মাষ্টার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯২১ সাল থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত মঈনপুর প্রাইমারি স্কুলে, এর পর দু’বছর নিউ স্কীম জুনিয়র মাদ্রাসায় এবং পরে রাজশাহী এলাকায় একাধারে তিনি ৬ বছর ধরে শিক্ষকতা এবং লেখাপড়া অব্যাহত রেখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং পরবর্তিতে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রথম বিভাগে আই.এ পাশ করেছিলেন। এ তিন পর্যায়েই তিনি তার অসামান্য মেধার স্বীকৃতি স্বরূপ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘হাজী মো. মহসিন’ বৃত্তি লাভের কৃতিত্ব অর্জন করেন, যা ছিলো তখনকার সমাজে এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। তার সুদক্ষ নেতৃত্বে স্কুলটা নানা চড়াই উৎরাই অতিক্রম করে কাঠামোগত ব্যুৎপত্তি অর্জন সহ একাডেমিক ইনপুট-আউটপুট বর্ধন করে ক্রমশঃ নানা উর্ধ্বমুখী মাত্রা লাভে সক্ষম হতে থাকে। অবশেষে দেশ ভাগের পর ১৯৫০ সালে তা আপগ্রেডেড হয়। এর দু’বছর পর মঈনপুরের বিদ্যাংগনকে অধিকতর উজ্জ্বলতা দানে নিবেদিত প্রাণ তৎকালিন আসাম অঞ্চলের সুবিদিত রাজনীতিক, সমাজ হিতৈষী ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিত্ব ঝিগলী নিবাসি মৌলানা আবু আসাদ মো. নুরুল হক এসে আরজদ আলীর সহযোগি হলেন। তিনি তখন আসামের গৌরিপুর হাই মাদ্রাসার সুপারিনটেন্ডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মূলত নিজের এলাকায় উদীয়মান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রায় আবেগাপ্লুত হয়েই একটা উচ্চতর প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদে ইস্তফা দিয়ে তিনি ছুটে এসেছিলেন। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টা উল্লেখ না করলেই নয় তা হলো, তিনি দেশ ভাগের সময় প্রখ্যাত মুসলিম রাজনীতিক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সহ অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের সাথে মাওলানা নুরুল হক অখন্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন। ’৪৭ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চল পাকিস্তানে যোগদানের ও বিরোধী ছিলেন। নিজে তখন মাঠ পর্যায়ে গণভোটের পক্ষে সমর্থন না দেয়ার জন্যে সর্বসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রচার প্রোপাগান্ডাও চালিয়েছেন। রাজনৈতিক ভাবে উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাতাবরণে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ধর্মীয় বিদ্বেষ ইত্যাদি কারণে সিলেটের সংখ্যাধিক্য মুসলমান সমাজ তখন ইসলাম ফোবিয়ায় পুরোমাত্রায় আন্দোলিত। সুতরাং যা হবার তাই হয়েছে। সিলেট পূর্ব বাংলার অংশ ছিলো না, ছিলো আসামের অংশ এবং সুরমা ভেলী হিসেবে পরিচিত। নুরুল হক এ ঘটনায় খুবই মর্মাহত হন এবং পাকিস্তানে না এসে আসামেই থেকে যান। এ ছাড়াও দেশ ভাগের আগে তিনি আসামের ভাসানটেক আন্দোলনে মাওলানা আব্দুল হামিদ খাঁনের অন্যতম সহযোদ্ধা ছিলেন। এ আন্দোলনের সুবাদে মাওলানা হামিদ খাঁন পরবর্তিতে মাওলানা ভাসানী হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এক কথায় বলবো একমাত্র শেকড়ের টানেই সকল মান-অভিমান ভুলে মাওলানা নুরুল হক দেশে ফিরে এসেছিলেন। এরপর রাজনীতিকে পরিহার করে কেবল সমাজের সমৃদ্ধি ও অগ্রযাত্রার জন্যে বাকী জীবনটাকেই উৎসর্গ করেছিলেন। নুরুল হক কে সহযোগি হিসেবে পেয়ে আরজদ আলীর মাঝে যেনো নুতন প্রাণের সঞ্চার ঘটে। তৈরি হয় মঙ্গঁলযাত্রার এক মানিক জোড়। দু’জনই ছিলেন প্রখর মেধাবি, সৎ, নির্লোভ ও সত্যাশ্রয়ী সমাজ সংস্কারক। তখন পর্যন্ত অন্ধকার কিছুটা দুরীভূত হলেও আলো আঁধারির খেলা বহমান ছিলো আমাদের সমাজে। ছিলো ধূসর, বিবর্ণ যাত্রাপথ। পরিবর্তনকে বাঁধা প্রদানের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণের গ্রে-এরিয়া বিদ্যমান ছিলো সমাজে। কিন্তু এর মধ্যেও নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে সক্রিয় ছিলেন দু’ লড়াকু সৈনিক, একজন নীরব আর অন্যজন সরব। মাওলানা নুরুল হকের অতুলনীয় ক্যারিশমা ছিলো সমাজের সর্বসাধারণকে যে কোন ইতিবাচক ইস্যুতে উদ্বুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করার। মঈনপুর বেশ আগে থেকেই একটা বড় গ্রাম। তা জনসংখ্যার আধিক্যে এবং ক’টা গোত্রে বিভক্ত ছিলো। সুতরাং ভালো হোক আর মন্দ হোক, যে কোন বিষয়ে প্রায়ই মতানৈক্য হতো, পারস্পরিক বিরোধিতা হতো। মৌলানা নুরুল হক এমন কিছুর উদ্ভব হলেই মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি সকলের শ্রদ্ধা, আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন অত্যন্ত স্বল্পতম সময়েই। তার নিরপেক্ষতাও ছিলো প্রশ্নাতীত। পক্ষান্তরে আরজদ আলী স্যারের জনসম্পৃক্ততা তেমনটা ছিলো না। তিনি ছিলেন নিভৃতচারি এবং নীরব কর্মি। তবে জ্ঞানগর্ভ কৌশল ও নীতি নির্ধারণে তিনি ছিলেন পারঙ্গম। আরজদ আলী স্যার মৌলানা স্যারের যোগদানের পূর্বে বিচ্ছিন্ন ভাবে বিভিন্ন উদার প্রাণ ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতা নিয়ে এগুচ্ছিলেন। তার এমন পথ চলায় কাঙ্খিত গতিশীলতা ছিলো না বলা চলে।

চলবে… আগামী কাল পর্ব  -৪

ফেসবুক মন্তব্য