নিউজটি পড়া হয়েছে 162

বিদ্যালোকে মঈনপুরের যাত্রাধ্বনি : মোঃ আখলাকুর রহমান

বিদ্যালোকে মঈনপুরের যাত্রাধ্বনি
  মোঃ আখলাকুর রহমান।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বেশ পূর্ব থেকেই ভারতবর্ষে স্বরাজ আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে। এর সাথে পরবর্তিতে মুসলমান সমাজের খেলাফত আন্দোলনও সমন্বিত হয়ে পড়ে। প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে বৃটিশ সরকার স্পষ্টতঃই ভারতবাসিকে আহ্বান জানালো এ বলে যে, তারা যদি সরকারকে যুদ্ধে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করে তবে যুদ্ধ জয়ের পর ‘স্বরাজ’ এর দাবি মেনে নেবে। এমন আশ্বাসের প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষ মহাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভারতবাসি স্বরাজ বা স্বাধীনতা গ্রহণের উপযুক্ত কি না এমন এক উদ্ভট ইস্যু দাঁড় করিয়ে ১৯০৯ এবং ১৯১৭ সালে দু’বার এবং যুদ্ধ শেষে পুনরায় ১৯১৯ সালে এসে আরো একবার তা মূল্যায়নের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে। সর্বশেষ কমিটিতে চেমস ফোর্ড কমিশন পাঠানো হয়। মর্লি মিন্টো কমিশনও এ লক্ষ্যে কাজ করেছিলো আগে। তাদের উপস্থাপিত রিপোর্ট গুলোর ভিত্তিতে শাসক শ্রেণি স্বরাজ প্রদানের প্রতিশ্র“তি থেকে সরে এসে এর বদলে ভারতীয় দের HOME RULE,VILLAGE SELF GOVERNMENT এর অধিকারপ্রদান করে। মন্টেগো চেমস ফোর্ড কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ইন্ডিয়া এ্যাক্ট ১৯২১ প্রণয়ন করে বঙ্গদেশে তখন চালু করা হয় ইউনিয়ন ও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড এবং আমাদের এলাকা আসামে প্রবর্তিত হয় লোকাল বোর্ড ও মিউনিসিপ্যালিটি। এ গুলোতে এদেশের মানুষকে কথিত ‘দেশ শাসনের উপযুক্ত’ হওয়ার প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা গৃহিত হলো। এ সময়ে ফরাসি এবং ইংরেজরা তুরস্ক সাম্রাজ্য ভাগাভাগি করে নিলে ভারতবাসিতাতে বিক্ষুব্ধ হয় এবং প্রবল ভাবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা শুরু করে। মুসলিম আলেম সমাজ তখন ডাক দেন অসহযোগ আন্দোলনের। ইংরেজদের ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য-দ্রব্য বর্জন সহ তাদের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও তখনঅবস্থান গ্রহণ করেন তারা সকলে। স্কুল ঘর পড়ে যাওয়ার পর থেকে আমাদের ‘সুনাইত্যা বাড়ি’র পুকুর পারস্থ একটা বাংলো ঘরে এর পাঠদানের কাজ চলে। পরে ১৯২০ সালের শেষ দিকে পুনরায় স্কুলঘর মেরামত করা হয়। এ সময় মঈনপুরের পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার দিশারি আরজদ আলী সে স্কুলে ভর্তি হন। তখন শিক্ষক ছিলেন খাগামুড়া নিবাসি আহমদ আলী পীর। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাবদ তখনো কোন সরকারি বরাদ্দ ছিলো না। যে কারণে খুব ঘন ঘন শিক্ষক বদল হতো। পাঠদানে থাকতো না কোনো ধরনের ধারাবাহিকতা। স্কুলের একজন সচেতন ছাত্র হিসেবে আরজদ আলী স্যার এসব তার স্মৃতিচারণে পরবর্তি সময়ে এসব জানিয়েছেন। স্কুল ঘরটাও এতো দিনে একেবারে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। ব্যবহার অনুপযোগি হয়ে পড়ায় আবারো এ বাড়ি ও বাড়ি কিংবা বাজারের দোকান কোঠায় স্থানান্তরিত হয়ে হয়ে তা যেনো ভ্রাম্যমান এক শিক্ষাংগনের রূপ ধারণ করে। আরজদ আলী স্যার তার স্মৃতিচারণে আরো জানিয়ে ছিলেন ঘন ঘন শিক্ষক বদলের বিষয়টাও। তার অধ্যয়ন কালের তিন বছরে অন্ততঃ তেরো জন শিক্ষকের রদবদল ঘটেছিলো মঈনপুর প্রাইমারি স্কুলে। যার কারণ ছিলো, এরা কাজ করতেন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে অবৈতনিক ভাবে। পালপুরের গোপেন্দ্র ঠাকুর, মর্য্যাদ গ্রামের দীনবন্ধু রায়, খালিশার রমন পাল, পাটলীর দেলোয়ার হোসেন, দাউদপুরের আব্দুশ শহিদ চৌধুরি সহ দেবেন্দ্র দেব এবং অন্যান্যদের মধ্যে তেরা মিয়া, মছদ্দর আলী, সিকন্দর আলী প্রমুখ শিক্ষকরা তখন স্বপ্রণোদনায় স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করেছেন। তাদের দর্শন ছিলো, বিদ্যা দান হচ্ছে সবচেয়ে বড় দান। এটা দান করলে এর পরিমাণ না কমে উল্টো পুনঃপৌণিক ভাবে তা কেবল বাড়তেই থাকে। আর তা হয় বড়ো বেশি পুণ্যের কাজ। এদিকে ছাবাল পীর কিন্তু হাল ছাড়লেন না। একদিকে যেমন গ্রামের মানুষকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যেতেন, অন্যদিকে তিনি একজনের পর একজন শিক্ষক যোগাড় করে নিয়ে আসতেন। ১৯২৩ সালে স্কুল ঘর তৈরির জন্যে পুনরায় তিনি লোকাল বোর্ডের বরাদ্দ নিশ্চিত করতে সমর্থ হলেন। এ সময় মঈনপুর গ্রামবাসি মূলত চতুঃপার্শ্বের গ্রাম গুলোর সাথে যোগাযোগের সুবিধার্থে উত্তর পশ্চিম দিকে সরে এসে ভটের খাল ও মঈনপুর খালের সংযোগ স্থলের কাছাকাছি জায়গা নির্ধারণের উদ্যেগ নিলেন। বর্তমান প্রাইমারি ও হাইস্কুলের সংযুক্ত ভূমির পশ্চিমাংশে মো. দুর্লভ খাঁনদের কিছু পারিবারিক জমি ছিলো। তারা ছাবাল পীরের অনুরোধে স্বেচ্ছায় তা স্কুলের জন্যে দান করেন। এগুলোর সাথে ফয়েজুল্লাহ তার বাড়ীর পাশের দেয়া ভূমি টুকু ফেরৎ পাওয়ায় এ গুলোর বদলা হিসেবে সেখানে কিছু জমি ক্রয় করে তা স্কুলের জন্যে দান করেন। পরবর্তিতে সে সময়ে নদীর মিলন স্থল বর্তমান স্কুল সীমানা থেকে অন্ততঃ ৩০০ মিটার দূরে ছিলো আর দু’নদীর তীর ঘেঁষে কৌণিক অবস্থানে ছিলো গ্রামের বাজার। ধীরে ধীরে নদীর ভাঙন স্কুলমুখী হয়ে দক্ষিণ দিকে এগুনোর ফলে বাজার নদীগর্ভে বিলীন হতে থাকলে বর্তমান অবস্থানে তা স্থানান্তরিত হয়। স্কুলের সীমানার মধ্যে এখন ঢুকে পড়েছে নদী আর গত প্রায় দু’যুগ ধরে স্কুল ভবন গুলো কোন রকমে টিকে আছে স্থানীয় ভাবে গৃহীত কিছু কিছু প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থার কারণে। নানা ভাবে সরকারিপ্রতিকারের জন্যে দৃষ্টি আকর্ষণ বা আবেদন নিবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত এ জন্যে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। নিকট ভবিষ্যতে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলেও মনে হচ্ছে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের থেকে শুরু করে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা গত পঞ্চাশ বছর ধরে ব্যাপারটা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছেন। মনে হচ্ছে যেেনো কারো কিছু করার নেই। আর এরকম উদাসীনতা চলতে থাকলে শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা গুলোর নিয়তি যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা অনুমান করাও কঠিন।

(চলবে) পর্ব-৩, প্রকাশ হবে আগামিকাল …

ফেসবুক মন্তব্য
xxx