নিউজটি পড়া হয়েছে 324

বিদ্যালোকে মঈনপুরের যাত্রাধ্বনি : মোঃ আখলাকুর রহমান

সিলনিউজ২৪.কমঃ মঈনপুর, সুনামগঞ্জ জেলার এক প্রাচীনতম ও সুবৃহৎ গ্রাম। এর গোড়া পত্তনের বিষয়ে এ যাবত প্রাপ্ত নানা তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এমনটাই অনুমিত হয় যে, এ জনপদে বহমান জীবনধারার সূচনা ঘটেছে অন্ততঃ সাড়ে তিন’শ বছর আগে। প্রাচীন যুগে সিলেট অঞ্চলের সভ্য জনপদ ইন্দেশ্বর থেকে আগত প্রথম যে দু’টো পরিবার এখানে এসে বসতি গড়ে তুলে তাদের চৌদ্দতম পুরুষ প্রজন্ম এখন বর্তমান অবস্থান রয়েছে। এদের ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন সময়ে যে সমস্ত পুরোনো পরিবার গুলো এসে এ গ্রামে বসত ভিটে স্থাপন করেছে, যাদের স্তরভেদে ছয় থেকে বারোতম প্রজন্ম পর্যন্ত বহন করে চলেছে সেগুলোর উত্তরাধিকার। তবে কালের যাত্রাপথে সংযোজন-বিয়োজনের ধারাও এখানে রয়েছে সক্রিয়, যথারীতি নিয়তির বৈচিত্র্যময় বাস্তবতায়। ভূমি বণ্টন ব্যবস্থায় মধ্যযুগে এসে প্রবর্তিত হয় তাম্বার সনদ, বৃটিশ আমলে তা তালুকে পরিবর্তিত হয় এবং সর্বশেষ দেশভাগের পর তা বিভাজিত আকারে খতিয়ানে রূপান্তরিত হয়েছে। তাম্বার সনদ প্রথার শেষদিকে দেখা যায়, মঈনপুরের প্রথম পরিবারগুলোর অন্তত চার প্রজন্মের ধারাবাহিকতা ছিলো। ঐতিহাসিক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর মাধ্যমে তালুক প্রদানের ভূমি বণ্টন ব্যবস্থা চালু করা হলে দেখা গেছে, মঈনপুর গ্রামের পুরোনো পরিবারগুলো মোট আটটা তালুকের স্বত্ত্ব লাভ করেছিলো। এগুলো হচ্ছে-নুর জামাল, গোলাল রাতিন, আদন নাইওর, বনমালী, কাশী,বাসুরাম ও আমজষ্টিপুর। মঈনপুরে যখন বসতি গড়ে উঠে, তখন রাউলির দু’একটা পরিবার ছাড়া আশেপাশের গ্রাম গুলোর অস্তিত্ব ছিলো না। অবশ্য কাল পরিক্রমায় সেগুলো পরে ক্রমশঃ গড়ে উঠেছে। মহাকালের আবর্তে মঈনপুরের যাত্রাপথ মুটোমুটি দীর্ঘ হলেও শিক্ষার আলোতে এর অবগাহনের পিপাসা জাগ্রত হয়েছে অন্ততঃ শুরু থেকে দু’শ বছর পরে। প্রথমদিকে কিছু আগ্রহী মানুষ প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও প্রাণান্তকর চেষ্টা করে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস খুঁজেছে। তৎকালিন সময়ে শিক্ষালাভের মাধ্যম দুরদুরান্তের টোল কিংবা চতুষ্পাঠিতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই জ্ঞানলাভের একটু স্বাদ পেয়েছেন। এতে করে নিজেরা যে বৈষয়িক অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, পরে চেষ্টা করেছেন উত্তরসুরিদের মাঝে তা ছড়িয়ে দিয়ে এদের পিপাসার তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে। এভাবে সূচনা ঘটেছে পরিবর্তনের। ভূ-সম্পদ আর কৃষি নির্ভর জীবন ধারাটাই ছিলো অজ্ঞানতায়পূর্ণ, আলোহীন তিমিরের গহ্বরে। ধীরে ধীরে জ্ঞানের জগতে বিচরণের ক্ষেত্র তৈরি হতে থাকে, সমাবেশ ঘটতে থাকে নানা সব নিয়ামক উপকরণের, তখন ক্রমশঃ অরুণ আভায় দীপ্তময় হয়ে উঠতে থাকে এগিয়ে চলার পথ। খুব মন্থর গতিতে, নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে মঙ্গঁলালোকের অভিযাত্রায় নিরন্তর এগিয়ে এসেছে মঈনপুর কেন্দ্রিক জনপদের মানুষ। সরকারি আংশিক অর্থানুকূল্যে মঈনপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘর প্রথম নির্মিত হয় ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে। ঢেউটিনের ছাউনি, বাঁশপালার কাঠামো আর নলখাগড়া দিয়ে মাটির তৈরি দেয়ালঘর। ১১৫ বছর আগে যা ছিলো সকলের চোখে তাক লাগানোর মত লম্বাটে, তাও একটা আবার স্কুল গৃহ। এর স্থান সংকুলান হয়েছিলো আরজদ আলী স্যারের পৈতৃক পুরান বাড়ি সংলগ্ন ধান মাড়াইয়ের খলায়। এর অবস্থান ছিলো গ্রামের উত্তরে সম্প্রতি নির্মিত ব্রীজের প্রায় দু’শ দক্ষিণে বড় খালের পশ্চিম পারে। বর্তমানে এ বসতবাড়িটা পরিত্যক্ত। ১৯০৩ সাল থেকে মঈনপুরে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সূচনা স্থল ছিলো এ প্রাথমিক বিদ্যালয়গৃহ। তবে মঈনপুর গ্রামে শিক্ষাযাত্রার পেছনে প্রস্তুতি পর্বের প্রায় এক দশক কালের একটা নাতিদীর্ঘ যাত্রাপথও ছিলো। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ শাসনের বিপক্ষে নানা সময়ে সৃষ্ট বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় শেষদিকে এসে মুসলিম সমাজে খেলাফত আন্দোলনের ব্যাপ্তি ঘটে। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে নুতন রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের যাত্রা শুরু হয়। এ সময় মুসলমান সমাজে নুতন করে গণসচেতনতার সৃষ্টি হতে শুরু করে। মূলতঃ বৃটিশ বিদ্বেষ থেকে উদ্ভুত কারণে তাদের দ্বারা প্রবর্তিত ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ঘৃণাবোধ জমাট বাঁধতে থাকে সমস্ত ভারতবর্ষে। অবশ্য অন্য ধর্মাবলম্বিরা তেমনটা শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে এতটা রিএ্যাক্ট করেনি যতটা করেছিলো তখনকার মুসলমানেরা। সে সময়ে নেতৃস্থানীয় মুসলিম আলেমরা প্রচার করতে শুরু করলেন যে, যারা বেদ্বীন নাছারাদের ভাষা পড়বে বা শিখবে তারা দোযখে যাবে। আর যে হাত দিয়ে তা লিখবে, সে হাতও হাবিয়া দোযখে পুড়তে থাকবে পরকালে। এমন অবস্থা সৃষ্টির পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতবর্ষে ইতিহাস খ্যাত ‘দ্রোহ’ সেই ১৮৫৭ সালের ‘সিপাহী বিদ্রোহ’কে বৃটিশরা অতি নিষ্ঠুরতার সাথে দমন করেছিলো। এরপর একই সালের ১ নভেম্বর আইন পাশ করে বৃটিশ পার্লামেন্ট প্রায় একশ বছর ধরে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কব্জায় থাকা ভারত বর্ষকেসরাসরি বৃটিশ শাসনাধীনে নিয়ে যায়। একই সাথে মহারাণী ভিক্টোরিয়াকে তারা ‘ইমপ্রেস অব ইন্ডিয়া’ হিসেবে ঘোষণা করে। অবশ্য এ ঘটনার পরপরই রাণী ভিক্টোরিয়া তার ঐতিহাসিক ‘কুইন্স প্রোক্লেমেশন’ জারি করে ভারতের সকল জাতিকে কথিত সম্পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস প্রদান করেন। কিন্তু ভারতের জনগণের কাছে তা নিষ্ঠুর পরিহাস হিসেবেই বিবেচিত হয়। এরপর থেকে দ্রুত প্রায় ছয়শত দেশীয় রাজ্যকে একীভূত করে ইংরেজরা অখন্ড ভারতবর্ষ তৈরি করে নেয়। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সকল এলাকাকে তারা ছোট ছোট ইউনিটে বিভক্ত করে ফেলে। তখন বৃহত্তর সিলেট জিলাকেও ১০টা রাজস্ব জিলায় বিভাজিত করা হয়। এ সময়ে সিলেট সদরকে তাজপুর ও পারকুল জিলায় ভাগ করা হয়। সিলেট অঞ্চলের অন্যান্য রাজস্ব জিলাগুলো, মৌলবীবাজারের হিংগাজিয়া ও রাজনগর হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, শংকরপাশা ও লস্করপুর এবং সুনামগঞ্জের রসুলগঞ্জ ও নোয়াখালি নামে ছিলো। এগুলো আবার সর্বমোট ১৬৪ পরগণায়ও বিভক্ত ছিলো। সুনামগঞ্জের রসুলগঞ্জে কালেক্টরেট এবং মুন্সেফী আদালত দু-ই ছিলো। ১৮৭৭ সালে সুনামদি নামের কৃতি এক সিপাহির স্মৃতি রক্ষার্থে তার নাম জড়িয়ে সুনামগঞ্জ মহকুমা সদর, ১৭৭৮ সালে হবিগঞ্জ, করিমগঞ্জ মহকুমা, ১৮৮২ সালে উত্তর সিলেট বা সিলেট সদর মহকুমা এবং একই সাথে দক্ষিণ সিলেট বা মৌলবীবাজার মহকুমায় বৃহত্তর সিলেট উপত্যকা বিভাজিত হয়। সুনামগঞ্জ শহর প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পর ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে মঈনপুরে প্রথম প্রাথমিক পর্যায়ের একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা পায় স্থানীয় শিক্ষানুরাগিদের ঐকান্তিকতায়। গ্রামের বিশিষ্ট সমাজ হিতৈষী মরহুম মো. ইলিয়াছ মিয়ার বৈঠক খানায় চালু হওয়া এ শিক্ষালয়ের প্রথম দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন মৌলবী নুর মোহাম্মদ। দু’বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম করে তিনি একে মুটোমুটি একটা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছিলেন। এরপর তিনি বুরাইয়া মাদ্রাসায় যোগদান করলে কান্দিগাঁও নিবাসি মৌলবী কোরবান আলী এর দায়িত্বআভার গ্রহণ করেন। ১৮৯৭ সালের করালগ্রাসী ভূমিকম্পে সমস্ত আসাম প্রদেশ জুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়। সুরমা ভেলী তথা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে এর ব্যাপকতা ছিলো অনেক বেশি। সকল কাঁচা ঘরবাড়ি সহঅধিকাংশ পাকা, আধা পাকা বিল্ডিং ধুলিস্যাত হয়ে গিয়েছিলো প্রকৃতির নির্মম রাহুগ্রাসে। জনজীবনে সর্বত্র নেমে আসে স্থবিরতা, সকল স্বাভাবিক জীবন ও কর্মধারাহয়ে পড়ে অচল। এ সময়ে এ মাদ্রাসারকার্যক্রমও সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সর্বব্যাপি এমন ধ্বংসলীলার মাঝেও কিছুদিনের মধ্যে এর পুনরুদ্ধারে ছৈলা গ্রামের দুই সহোদর ওসমান আলী এবং নজাবত আলী মাষ্টারদ্বয় এগিয়ে আসেন। তারা তখন নুতনরূপে মঈনপুরের মধ্যবর্তী স্থানে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সূচনা ঘটান। কিছুদিন তারা এটা পরিচালনা করার পর বিদায় নিয়ে চলে গেলে তাদের স্থলাভিষিক্ত হলেন কাটার বৈকুণ্ঠ দাস এরপর বাউর কাফনের প্যারি মোহন পাল এবং শেষে জাহিদপুরের নবকিশোর দে। সে সময়ে সিলেট সদরের রেঙ্গা শরিষপুর নিবাসী অনেকটা সংসার বিরাগী গোছের একজন উদারমনা মানুষ মঈনপুরে অবস্থান করতেন। তার নাম ছিলো আস্কর আলী, সমাজের লোকজনের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ছাবাল পীর নামে। তার এক ভাতিজীকে বিয়ে দিয়েছিলেন আমার এক চাচার সাথে। একই সময়ে তিনি আরেক ভাতিজির বিয়ে দেন আমাদের পাশের বাড়ির খাঁন পরিবারে। এর সুবাদে বেশির ভাগ সময় থাকতেন আমাদের বাড়িতে।

( চলবে )

ফেসবুক মন্তব্য
xxx