এখানে রুদ্ধ চারি ধারঃ পথ নেই পালিয়ে যাবার- মোঃ আখলাকুর রহমান

এখানে রুদ্ধ চারি ধারঃ পথ নেই পালিয়ে যাবার
মোঃ আখলাকুর রহমান।

উচ্চ শিক্ষায় এক ব্যতিক্রম ধর্মি প্রত্যয়ের দৃঢ়তাকে মন্ত্রগুপ্তি করে আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে অভিযাত্রা শুরু করেছিলো জনতা মহাবিদ্যালয়। সে অভিযাত্রা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ক্রমাগত তা এগিয়ে চলেছে নির্দ্বিধায় এবং এক অনিরুদ্ধ প্রাণশক্তি সঞ্চয় করে ও তা অবিচল রেখেই তা অব্যহত রয়েছে।

জনতা মহাবিদ্যালয়ের শুরুতেই আমরা আমাদের শিক্ষা সমাজে বিরাজমান প্রতিবন্ধকতা গুলোকে যথার্থই চিহ্নিত করে একটা প্রধান প্রতিপাদ্য স্থির করেছিলাম। জনতা কলেজে আসা আমাদের শিক্ষার্থি সন্তানদের কখনো যা’তে করে ছাত্রত্ব কোনো রকমেই বাঁধাগ্রস্ত না হয় সে জন্যে তাদের প্রতি আমাদের একটাই আহ্বান ছিলো—-ENTIRE TO LEARN and COME OUT TO SERVE. অর্থাৎ শিক্ষার মন নিয়ে এসো আর সেবার মন নিয়ে বেরিয়ে যাও।

না, এটা কেবল কোনো কথার কথাই ছিলো না, জনতা মহাবিদ্যালয়ের সরলোক্তিটাকে একটা কালজয়ী প্রতিশ্রুতি করেই নিতে সক্ষম হয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। মাঝে মাঝে একটু আধটু বিপত্তি যে আসেনি তা বলবো না। তবে এ সব প্রতিকুলতাকে কঠোর ভাবে মোকাবেলা করেই এগিয়ে চলেছে এখানে সুষ্ঠ পরিবেশে শিক্ষা পদ্ধতি পরিচালনা ও আগামি দিনের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্যে উপযুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চার আবহ।

জনতা মহাবিদ্যালয় এক সময়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক প্রত্যন্ত গ্রামিণ এলাকায় তার যাত্রা শুরু করেছিলো। গ্রামে কলেজ হয় না, এমন বড় এক চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করেই কিছুটা ধীর গতিতে হলেও তা এখন অনেক দুর এগিয়ে এসেছে। উদ্যেক্তাদের নিরলস পরিশ্রম, এলাকাবাসির নিখাঁদ আন্তরিকতা ও একাট্টা সহযোগিতা এবং এর নিবেদিত প্রাণ একদল উদ্যমী শিক্ষকের আত্মনিবেদনে এখন তা এক বিরাট মহীরুহ। শুরুতে ছাত্র স্বল্পতা একটা বড় অন্তরায় ছিলো। কিন্তু একাডেমিক পারফরমেন্সকে সযত্নে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার টীম ওয়ার্কে তা দুরীভূত হয়ে গেছে অনেক আগেই।

পর পর তিন শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান শাখা সংযোজনের মাধ্যমে প্রথমে তা একটা পুর্ণাঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। শুরুতে যে সকল প্রতিকূল পরিস্থিতি ছিলো তা কাটিয়ে উঠতে অবশ্য সময় লেগেছে। বিগত ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ধারাবাহিক ভাবে বিএ, বিএসএস এবং বিবিএস কোর্স চালুর মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এক পুর্ণাঙ্গ ডিগ্রি কলেজ হিসেবে দেশের শিক্ষাংগণে রাজনীতি ও সন্ত্রাস মুক্ত তকমা নিয়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে জনতা মহাবিদ্যালয়। অধিকিন্তু চলতি ২০১১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স কোর্স খোলার অনুমতি লাভের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা স্তর অনার্স কোর্স পরিচালনার গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে এখন জনতা মহাবিদ্যালয়। সামগ্রিক পূর্বশর্ত বহাল থাকায় পর্যায়ক্রমে এখানে বিএ, বিএসএস ও বিবিএস সহ অন্যান্য কিছু ডিসিপ্লিনের অন্তত ২০ টা বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা সম্ভব হবে এবং তা বাস্তবায়নের জন্যে যথাযথ পরিকল্পনাও রয়েছে জনতা মহাবিদ্যালয়ের। এটা প্রায় নির্ধারিত প্রক্রিয়া যে, সে সকল বিষয়ে অনার্স কোর্স খোলা হবে, সরকার অনুসৃত নীতিমালা অনুযায়ি সে গুলোর মাস্টার্স কোর্স চালু করা যাবে ধারাবাহিকভাবে।

এ রকম দুরদর্শি এক সম্ভানাময় ভবিষ্যতকে প্রতিপাদ্য করা হয়েছে জনতা মহাবিদ্যালয়ে। সুবিধা বঞ্চিত গ্রামিণ এলাকার ছেলে মেয়েরা যা’তে নিজের বাড়িতে অবস্থান করেই প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে সর্বোচ্ছ একাডেমিক ডিগ্রি লাভ করে আগামি দিনের যোগ্য নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে এটাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। সুষ্ঠু ও গঠনমুলক পরিকল্পনা থাকায় তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নও হচ্ছে। একশত পনেরো বৎসরের পুরোনো মঈনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ আশপাশের প্রায় প্রত্যেক গ্রামে প্রাইমারি স্কুল, বেশকিছু বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষালয় ও কিন্ডার গার্টেন, সুনামগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহি ও সুপ্রাচিন বিদ্যাপীঠ মঈনপুর বহুমূখি উচ্চবিদ্যালয় সহ চতুর্পাশ্বের প্রায় ১০ টা মাধ্যমিক স্কুল এবং বেশ ক’টা দাখিল ও আলিম মাদ্রাসা নিয়ে জীবনধর্মি শিক্ষার আবহ এখন সুদৃঢ় হয়েছে জনতা মহাবিদ্যালয়কে ঘিরে।

জীবন জয়ের কলতানকে পুঁজি করে জনতা মহাবিদ্যালয় এগিয়ে চলেছে তার অভীষ্ট লক্ষ্যপথ ধরে। কিন্তু মাঝে মাঝে এর পথযাত্রায় পানিতে ভাসমান খড়-খুঁটোর মতো কিছু কিছু আপদ এসে যেনো বাঁধা সৃষ্টি করার পায়তারা করে। আবার যখন তাদের মাথায় হাতুড়ির ঠুকা পড়ে, তখন তাদের হুশ হয় আর অমনি লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায়। না গিয়ে কি উপায় আছে ? তারা বুঝতে পারে, এখানে বন্ধ চারিধার, দেরি হলে পথ পাওয়া যাবে না পালাবার !

এখন গুরুত্বপুর্ণ কিছু শারিরীক চিকিৎসার জন্যে আমি দেশের বাইরে আছি। কেউ কেউ হয়তো ভাবছে এতো দুর থেকে কি আর সব কিছু আমি দেখি, আর দেখলেই বা কিছু করার আছে কি ? তারা হয়তো ভুলে যায় আমরা এখন কোন পৃথিবীতে আছি। আমার সহকর্মিরা তো সক্রিয় আছেনই, পাশাপাশি কলেজের প্রতিটা বিষয়ই রয়েছে আমার নখদর্পণে। আমি নিয়মিত সকল খবরই নিচ্ছি, কে কখন কি করছে তা স্পষ্টই আমার চোখে ধরা দিচ্ছে। কারণ এখন তো অবগুন্ঠনে কোনো কিছুকেই আর কাকের মতো লুকোনোর উপায় নেই। ছোট্ট এক জনতা কলেজের রাজনীতি চর্চা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দু’দিন ধরে যেনো ভাইরাল হয়ে গেছে একটা বিষয়— যা কোনো ভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

একদল প্রথমে বাহাদুরী দেখিয়েছে নেতা বনে যাওয়ার। তারপর পাল্টা আরেক গ্রুপ দেখাচ্ছে প্রতিবাদি চেতনা। কলেজের জন্যে তৃতীয় আরেক পক্ষের দরদ উথলে উঠেছে। এ যেনো মায়ের থেকে মাসীর দরদের কি আধিক্য ? তারা দু’পক্ষকে মনে হচ্ছে মা ও বাপ আর মাঝখানে কলেজ কর্তৃপক্ষকে তারা করে ফেলেছে নীরব দর্শক। কিছুদিন আগে কলেজের এবারকার বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্টানে একটা ছাত্রকে অপর একজন ধারালো ছুরা দিয়ে কাঠাল কাটার মতো অনেক লম্বা একটা পুঁচ মেরে মারাত্মক ভাবে জখম করে। পরে তার বিকৃত রক্তাক্ত দেহের স্ক্রীনশর্ট নিয়ে একটা সুযোগ সন্ধানী গোষ্ঠি ব্যাপক প্রচার প্রোপাগান্ডায় নেমেছিলো। ঘটনাকারিরা তো আছেই, পাশাপাশি এ সব অতি উৎসাহিদের কারণে যে কলেজের ভাবমূর্তি কতোটা ক্ষুন্ন হয়, এটা হয় তা তারা বুঝতে পারেনা, না হয় ইচ্ছে করেই ক্ষতিকারক এ কাজটা তারা করে থাকে।

আমার ধারণা দ্বিতীয় বিষয়টাই কৌশলে করা হয়। কারণ, দেখেছি ফেইসবুকে দেয়া এ সব পোষ্টে কলেজকে এমনকি কখনো কখনো আমাকেও ট্যাগ করা হয়— এতোটাই সাহস বেড়ে গেছে তাদের। তখন ঐ ঘটনার পর সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে আমি একটা ইংগিতপুর্ণ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলাম। সবাই পরে তারা ঠিকই দেখেছে সে ঘটনায় দায়িদের কপালে কি জুটেছে। কয়েক জনেরই তো ছাত্রত্ব রুদ্ধ হয়ে গেছে সে ঘটনায়। আর সতর্ক পর্যবেক্ষণে রয়েছে আরো কয়েকজন।

আমরা যখন ছাত্রদের ভর্তি করি, তখন একটা নির্দিষ্ট অংগিকার-নামায় অভিভাবক সহ ছাত্রদের দস্তখত রাখি, এটাই আমাদের প্রধান অস্ত্র। জনতা কলেজে ছাত্রত্বের জন্যে হানিকর কোনো কাজ করে কেউ পার পায় না। অতীতে অনেকেরই ভাগ্যে নানা রকম শাস্তি ও দুর্ভোগ ঘটেছে। এ ছাড়া কলেজের জন্যে নিবেদিত প্রাণ এলাকার সচেতন অভিভাবক বৃন্দ আছেন সব সময় আমাদের পাশে। কেউ অপরাধ করে থাকলে সে কার ছেলে তা খোঁজ নিয়ে দেখা হয়না অন্তত জনতা কলেজে। বর্তমানে যারা উৎপাত শুরু করেছে তাদের উদ্দেশ্যে বলি, তোমাদের প্রত্যেকের এক্টিভিটিজ আমাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। দায়িরা কোন দিকেই পালানোর পথ পাবেনা। সহসাই দেখবে চারদিকের সকল কপাট সহসাই এক যোগে বন্ধ হয়ে গেছে।

তোমরা যদি ভেবে থাকো বড়ো নেতা হওয়ার পথ পেয়ে গেছো, তবে ভুলই করবে। কারণ বিপদ শুরু হলে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায় এমনকি কেন্দ্রীয় পর্যায়েরই যে কোনো দলের কোনো নেতাকে আর সাহায্যকারি হিসেবে পাবে না। এমন কি স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্ছ প্রশাসনও বৈরি হয়ে উঠবে তোমাদের। প্রয়োজন অনুভূত হলে কে কোথায় ধরা খাবে, কে কখন গ্রেফতার হয়ে লালঘরে যাবে তা আগে আন্দাজই করতে পারবো না। তাই বলি সময় আছে এখনো— সবাই সাবধান হয়ে যাও।

আমি রাজনীতি বিরোধি নই। স্বচ্ছ্ব এবং বাংলাদেশের মুলধারার রাজনীতি প্রতিষ্টার পক্ষে অনেক লেখালেখিও করি। আমি প্রত্যাশা করি, এ গুলো তোমরা পড়বে, এবং যতটুকু সম্ভব নিজেরা শিখবে। এ ছাড়া জনতা কলেজেও রাজনীতি বিজ্ঞান পড়ানো হয়। আমরা তো তোমাদের প্রথম দিন থেকেই বলি আগে রাজনীতি শেখো, রাজনৈতিক অধিকার কি তা আগে বুঝো। তোমরা দেখেছো আমি নিজেও রাজনীতি নিয়ে অনেক ভাবি, এখনো শেখার চেষ্টা করি। রাজনীতি ছাড়া দেশ সমাজ কিছুই চলতে পারেনা। তবে সে কোন রাজনীতি ? সেটা অবশ্যই গড়ার রাজনীতি, কোনোভাবেই ভাঙার রাজনীতি নয়। রাজনীতির নাম করে আজ আমাদের ছেলেরা অপরাজনীতিকদের হাতের পুতুল হয়। তারা কুমন্ত্রণা পেয়েই শিক্ষা প্রতিষ্টানের চেয়ার ভাঙবে, টেবিল ভাঙবে, দরজা জানালার গ্লাস ভাঙবে আর ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে রাস্তায় গাড়ী ভাঙবে— এ অপরাজনীতি আমরা চাইনা। আমরা আমাদের ছেলেদের এমন রাজনীতিক হতেও দেবো না।

তাই আবারো বলি, সবাই আগে সকল বিষয়ে মৌলিক জ্ঞানার্জন করো। লেখাপড়ার কাজটা ভালো ভাবে শেষ করে তারপর নিজের সেবা করো, সমাজের সেবা করো, মানুষের সেবা করো, ব্যবসা বাণিজ্য করো, চাকরি বাকরি করো। তখনি তো কেবল জীবনে সফলতা আসবে। বিপরীতে যদি হাফ বারিস্টার হয়ে দুনিয়াকে আইনী খেলার মাঠ বানানোর কাজে লেগে যাও তা’তে আম তো যাবে, ছালাও যাবে। তোমাদের মা-বাবার আশা ভরসা আর আমরা শিক্ষকদের স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেয়ার অপচেষ্টা করো না। তা’তে দেখবে নিজেরাই নিজেদের সৃষ্ট আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছো।

আমি খুবই অসুস্থতা নিয়ে এ কথা গুলো বলছি। গত দু’দিন আগে আমার শরীরে অপারেশন করে আইসিডি ডিভাইস স্থাপন করা হয়েছে। ক’দিন পরে আমার গলায় আরো একটা অপাররেশন ( থায়েরোক্টেমি) হবে। আমাকে যদি তোমরা ভালোবাসো তবে আমার জন্যে দোয়া করবে এবং কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার অবশ্যই চেষ্টা করবে। আর যদি আমাকে পছন্দ না হয় তবে এই দোয়া-ই করো আমি যেনো মরে যাই। তোমরা মনে রাখবে আমি যা বলি, বুঝে শুনে এবং নিশ্চিত হয়েই বলি এবং তা কার্যকর করেও ছাড়ি।

আমি যতোদিন বেঁচে থাকবো সরাসরি হোক অথবা পরোক্ষ ভাবে হলেও জনতা মহাবিদ্যালয়ের পেছনে থাকবো—পাহারা দিয়ে যাবো।

অধ্যক্ষ, জনতা মহাবিদ্যালয়, মঈনপুর
ছাতক, সুনামগঞ্জ

তারিখঃ ২১ এপ্রিল, ২০১৮ খ্রি. ★ ★ অস্টিন/টেক্সাস/যুক্তরাষ্ট্র।

ফেসবুক মন্তব্য
xxx