জগন্নাথপুরে কৃষি শ্রমিক সংকটেও হাওড় জুড়ে চলছে বোরো ধান কাটার উৎসব।

 বিপ্লব দেব নাথ,জগন্নাথপুর:-জগন্নাথপুরে বৃহৎ নলুয়া ও মইয়ার হাওড় সহ সবকটি হাওড় জুড়ে পুরোধমে শুরু হয়েছে বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ধুম। আনন্দে মেতে উঠেছেন কৃষকরা। কৃষাণীরা তাদের সোনালী ফসল গোলায় তুলতে হাওড়পাড়ে, খেলার মাঠে, বাড়ির আঙ্গিনায় খলা তৈরি করে ধান মাড়াইয়ের সাথে সাথে কুলা দিয়ে ধানের সাথে থাকা ছোট নাড়া বাতাসের সাহায্যে পরিস্কার করে খলায় ধান গুলো রোদে শুকিয়ে বস্তায় প্যাকেটজাত করণের কাজে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন।

গতকাল সোমবার নলুয়ার হাওড় ঘুরে দেখা গেছে গত এক সপ্তাহ আগে হাওড়জুড়ে ছিল সবুজের সমারোহ। এখন সোনালী ধানের শীষগুলো বাতাসের সাথে চিক চিক করে দোলছে। এদিকে হাওড়াঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকায়ধান কাটার শ্রমিক না থাকায় কৃষকরা জমিতে পাকা ধান নিয়ে চরম উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। নলুয়ার হাওড়ের কৃষক আরস আলী শ্রমিক সংকটের কথা উল্লেখ করে জানান হাওড়ে এবার ধান কাটা মাড়াই দেয়া পর্যন্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্য বছর দেশেরবিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক আসত এবার তাদের সংখ্যা কম।ইতোমধ্যে পুরো উপজেলার হাওর গুলোর ২৫/৩০ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ৫০ভাগ ধান কাটা সম্ভব হবে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। জমির মালিক ও বর্গাচাষী কৃষকরা বৃহৎনলুয়া, মইয়া ও পিংলার হাওরের উচু স্থানে অস্থায়ী ন্যাড়ার ঘর তৈরী করে দিনরাত সেখানে বসবাস করে ধান উত্তোলনের কাজ করেযাচ্ছেন। সকল বয়েসী পুরুষ ও নারীদের পাশাপাশি কিশোর,
কিশোরীরাও বাড়িতে বসে নেই। দিনব্যাপী মাড়াই দেয়া ধানগুলো শুকানোর কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।

এদিকে গত বছরের অকাল বন্যার পর এবার হাওড়ের ফসল রক্ষায় সরকার ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক এরই মধ্যে সবকটি হাওড়ের ফসলরক্ষা বাধের শতভাগ নির্মান কাজ শেষ করেছেন। প্রতিটি বাধ অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশ মজবুত ও উচু করে নির্মান করায় কৃষকরা মহাখুশি। কৃষকরা জানান এবার পাহাড়ি ঢল এলেও ফসল ঘরে তোলার সময় পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জগন্নাথপুর উপজেলার উপ-সহকারি প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন জানান, জগন্নাথপুর উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষায় ১৪ কোটি৫০হাজার টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে ৯২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইসিকমিটি) কর্তৃক বেড়িবাধ নির্মান কাজ সম্পন্ন হয়েছে।সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সিদ্দিক আহমদ জানান, হাওরজুড়ে এখন সোনালী ফসলের সমারোহ। বিভিন্ন জাতের ধান ইতোমধ্যে কাটা শুরু হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ জানান ব্রি-২৮ জাতের ধান কেটে শেষ করার সাথে সাথেই শুরু হয়েছে হাওড়জুড়ে ধান কাটারধুম। কৃষকরা এবার বোরো ফসল গোলায় উঠাতে পেরে মহা খুশি।তিনি জানান আগামী ১০/১৫ দিনের মধ্যে কৃষকরা ধান কেটে শেষকরার সম্ভাবনা রয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, চলতিবোরো মৌসুমে জগন্নাথপুর উপজেলার ৯টি হাওরে ১৪হাজার ৪শ৭৫ হেক্টর এবং হাওর বহির্ভূত ৫হাজার ৮শ ৫৮ হেক্টরসহ মোট২০হাজার ৩শ ৩৩ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে বৃহৎ নলুয়ার হাওরে ৪হাজার ২শ হেক্টর, বৃহৎ মইয়ার হাওরে ২হাজার ১শ ৫০হেক্টর, জামাই কাঁটা হাওরে ১হাজার ৮শ হেক্টর, হাফাতি হাওরে ১হাজার ৫শ হেক্টর, পারুয়ার হাওরে ১হাজার ৬শ হেক্টর, বানাইর হাওরে ১হাজার হেক্টর, রাঙ্গারকিত্তা হাওরে ৫শ ৫৫ হেক্টর, দলুয়ার হাওরে ৬শ ২০হেক্টর এবং পিংলার হাওরে ১হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে এবং হাওরবহির্ভূত ৫হাজার ৮শ ৫৮ হেক্টর জমিতে ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, ব্রি-৫০, ব্রি-৫৮, ব্রি-৫৫, বিআর-২৬সহ  হাইব্রিড জাতের ধান চাষাবাদ করা হয়েছে। এবারে ৮১হাজার ৯শ ৩৫ মেট্রিকটন ধানউৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। তবে বাম্পার ফলন হওয়ায়১লাখ মে: টন ধান উৎপাদন হওয়ায় সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে বেশীফলনকৃত ব্রি-২৮,২৯ ও হাইব্রিড এবং হাইব্রিড সুপার ধান কাঁটা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রায় ৩ভাগ ধান পাকায় হাওড়জুড়েসব জাতের ধানকাটা পুরোধমে শুরু হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকলেআগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে কৃষকরা এবার নিরাপদে তাদের কষ্টার্জিত ফসল গোলায় তোলা সম্ভব হবে।

এদিকে গত ১৪এপ্রিল উপজেলার দলুয়ার হাওরে ধান কাটা উৎসব পালন করেছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান। এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বিজন কুমার দেব, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের সহকারি উদ্ভিদ সংরক্ষন কর্মকর্তা তপন চন্দ্র শীল, সাংবাদিক আলী আহমদ প্রমূখ।

ফেসবুক মন্তব্য