নিউজটি পড়া হয়েছে 183

ছোটগল্পঃ বুয়েটের বারান্দা

সময়ের হিসেবে দশ বছর পাড় হয়ে গেছে। তেমন পরিবর্তন না হলেও ইটপাথরের দাপট গগনমূখীই। ব্যস্ত সড়কগুলোর ব্যস্ততা কমবে কি! যান্ত্রিক বাহন আর মানব অবস্থানে রাস্তাঘাটগুলো দম ফেলারও সুযোগটুকু হারিয়েছে দেখাই যায়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে আসতেই অমনি স্মৃতিতে হারানো হার্টবিটের গতিটা বাড়তে শুরু করল অমিওর। শেষবার কবে এমনটা হয়েছিল! নয় বছর আগে। মনে পড়ল এখানে আসা মাত্রই সামান্থাকে কল দিতো অমিও। ফোনে কথা বলতে বলতেই বুয়েটের পেছনের গেট দিয়ে রিক্সা করে ডুকত অমিও। কাঁধে সাইট ব্যাগটা ঝুলানো থাকত। স্টুডেন্ট ছাড়া অন্যকিছু ভাবার সুযোগ ছিলনা অমিওকে দেখে। বুয়েটের স্টুডেন্ট না হওয়ায় একদিন কিছু ঝামেলা বাধিয়েছিল বুয়েটের গেটম্যান। তাই অমিও সতর্ক, স্টুডেন্ট ভাবটা নিয়েই বুয়েটে যেথো অমিও। আজ সেই গেট দিয়েই বুয়েটে অমিও। গাছের ছায়া আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশটা আজো জীবন্ত। প্রতি কদমের সাথে মস্তিষ্ক সতেজ হয়ে নয় বছর আগের সময়টাতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই। একটা অস্তিরতা কাজ করছে বুকের ভেতর। এটা বুঝানো যায়না, একান্তই অনুভবের। ধীর পায়ে এগুনোর সময় আশপাশের নিরব চোখের চাহনিটা অমিওর চোখকে এড়ায়না। স্টুডেন্ট এবং শিক্ষক সবার চোখই ছিল অমিওর দিকে, যদিও সবাই যার যার পথেই এগিয়েছে। অমিও আশপাশে তাকিয়ে দেখে চেনা সেই সুন্দর জায়গাগুলো। সবই আছে আগের মতো, তবে মানুষগুলো হয়ত নেই। নয় বছর আগের সেই স্টুডেন্টরা এখন নিশ্চয়ই কর্মব্যস্ততায় মুখর নতুন জীবনে। এখনো দুইজন তিনজন বা তারও বেশি স্টুডেন্ট বসে নোট নিয়ে বিজি, কেউ আড্ডায়, কেউ একা বসে আছে। অমিও ভাবে, আমি যখন এখানে আসতাম তখন এই ছেলেমেয়েগুলো স্কুলের গণ্ডিই পেরুয়নি। আজ তারা বুয়েটে মতো বিদ্যাপীঠে অধ্যয়নরত। চোখ আটকে সেই গাছটির উপর। এই গাছটি বেশ ছোট ছিল, কিন্তু এখন সেই গাছ যৌবনে। গাছটি সামান্থার অনেক প্রিয় ছিল। সে বলত, ইস এই গাছটি যদি আমাদের হইত! সামান্থা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আফসোস করত, অমিওকে জিজ্ঞেস করত এটা কি গাছ? অমিও বলত জানিনা। সামান্থা বলত এটা আমাদের বাসায় দিয়ে এসো। অমিও বলতো মাথা খারাপ হইছে তোমার! এটা কিভাবে নিয়ে যাব আমি? সামান্থা নাছোড়বান্দা, সে বলেই যাচ্ছে ‘গাছটা বাসায় দিয়ে এসো’ অমিও জানে সামান্থা রাগানোর জন্যই এমনটা করছে। এরকম প্রতিদিনই করে, অমিওকে রাগানোর জন্য। অমিও বসে পড়ে বারান্দাতে। এখানে কতোটা বছর কাটিয়েছি, কতো স্মৃতি! তোলপাড় করে দিচ্ছে স্মৃতিগুলো অমিওর বুকে। অমিও ভাবে, শেষ দেখার দিন সামান্থার ব্যবহারটা ছিল একটু অন্যরকম। যদিও সব ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সামান্থাকে অন্য যেকোন দিনের চেয়ে একটু আলাদা মনে হচ্ছিল। প্রতিবার এখানে আসার পর যা করে এবার তা সে করেনি। কে জানত সেই দেখাই হয়ে যাবে জীবনের শেষ দেখা!
অমিও মনে মনে বলে, কোথায় আছো সামান্থা! পৃথিবীর কোন প্রান্তে তোমার অবস্থান জানিনা। একবারও কি মনে পড়েনা আমার কথা? একবারও কি স্মৃতিগুলো তোমাকে আচ্ছন্ন করেনা!
অমিওর অজান্তেই দুফোটা অশ্রু চোখ বেয়ে নিচে নেমে আসে। অমিও বিড় বিড় করে বলে, সামান্থা! তোমার অমিও আজো অন্যকারো হয়নি! তোমার স্মৃতিগুলো নিয়েই বেঁচে আছে সে। কেন এমন হলো! কেন এক আত্মার দুটি মানুষ দুই মেরুর বাসিন্দা হলো!
অমিওর অনেক কষ্ট হচ্ছে, ফেলে আসা সব স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে যেন সামনে চলে আসছে। ছোট্ট একটি ভুল, সামান্থার অনুশোচনা, অত:পর দুদিকে দুইজনের হারিয়ে যাওয়া! সব যেনো অকল্পনীয় বাস্তবতায় হারিয়ে যায়।
অথচ কতো শক্তই না ছিল তাদের সে বন্ধন, প্রচণ্ড ভালোবাসা কিংবা অগাধ বিশ্বাস দুজনের। সবই ছিল অনেক আপন, অথচ সামান্য ভুলেই বিশাল ভালোবাসার বন্ধনটা ছিন্ন হয়ে যায়। এক ঘন্টা কথা না বলে যেখানে থাকা সম্ভব ছিলনা, সেই জায়গায় কেটে গেল বছরের পর বছর! এ যেনো রুপকথার গল্প।
তিন সপ্তাহের জন্য দেশে এসেছে অমিও। আগামি পরশু ফিরে যেথে হবে ব্যস্ত প্রবাস জীবনে। কবে আর ফেরা হবে জানে না অমিও। দেশ কিংবা বিদেশ, সব জায়গাতেই অমিওর অস্তিত্বে সামান্থা জীবন্ত। একটি বার সামান্থাকে দেখার ব্যাকুলতার অবসান হবে না জানি, তবুও স্মৃতির টানে বুয়েটের বারান্দায় ফিরে আসা।
ফিরে যাবার সময় হয়ে গেছে। কাধে ঝুলানো ব্যাগ থেকে এক টুকরো সাদা কাগজ বের করে একটা চিরকুট লেখে অমিও। “সামান্থা! আজো ভুলতে পারলাম না তোমাকে, যেখানেই থাকো ভাল থেকো। এ জীবনে জানি দেখা হবে না আর। কেন এমন হলো! এটাতো স্বপ্ন ছিলনা। নিয়তির ফেরানো মুখ জীবনে তোমাকে আর এনে দিতে দিল না। চলে যাচ্ছি, ফিরে আসার সময় জানিনা, হয়তো ফেরা হবে না আর। অনেক ভালো থেকো, অমিও”
চিরকুটটা বারান্দায় রেখে উঠে দাড়াও অমিও। ফিরতে হবে থাকে। পা বাড়ায় সামনে। আবার থমকে দাঁড়ায় সে! মনে পড়ল সামান্থা ডাকছে দাঁড়িয়ে। সবই মনের ভুল, তবুও পেছনে থাকায় সে। কিছুই নেই, সেই গাছটি নিজের মতো করে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে এগুতে থাকে অমিও। মনে পড়তে থাকে স্মৃতিগুলো। বদরুন্নেছা মহিলা কলেজের স্টুডেন্ট ছিল সামান্থা। কলেজ ফাঁকি দিয়েই বুয়েট আসতো দেখা করার জন্য। বুয়েটের বারান্দাটা সামান্থার অনেক প্রিয় ছিল, এখানেই দেখা করার পছন্দের জায়গাটি ছিল তার। এখানেই শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কেটেছে। খুনসুটিতে ভরা প্রতিটি মুহূর্ত আজো তাড়া করে অমিওকে। কিন্তু নিয়তি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে দু’জনকে। প্রিয় দু’জন মানুষ কে কোথায় আছে জানেনা তারা। অমিও ফিরে এসেছে, সামান্থা কি এসেছিল, নাকি আসবে বুয়েটের বারান্দায়!

লেখকঃ সম্পাদক, সিলনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

৩১ মার্চ ২০১৮

ফেসবুক মন্তব্য
xxx