নিউজটি পড়া হয়েছে 216

বীরপ্রতীক কাকন বিবি : রণাঙ্গনের এক সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা

স্টাফ রিপোর্টার ::: চলে গেলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধা  কাঁকন বিবি (বীর প্রতীক)। বুধবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের রণাঙ্গনের এ নরী সৈনিক। তিনি ছিলেন একাধারে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা ও গুপ্তচর।  ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কাকন বিবি মুক্তিবাহিনীর হয়ে গুপ্তচরের কাজ করেছেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিপক্ষে। মহান মুক্তিযুদ্ধে কাকন বিবির অসামান্য অবদানের জন্য  বীরপ্রতীক খেতাব সম্মান দেওয়া হয়।

কাকন বিবির মূল বাড়ি ছিল ভারতের খাসিয়া পাহাড় অঞ্চলে। ১৯৭০ সালে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের ঝিরাগাঁও গ্রামের শহিদ আলীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হন তিনি। এরপর তিনি ধর্মান্তরিত হন এবং তার নাম রাখা হয় নুরজাহান বেগম। তার কন্যাসন্তান জন্ম হওয়ার পর তিনি স্বামীর সঙ্গে আলাদা হয়ে যান। এরপর ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে ইপিআর সৈনিক মজিদ খানের সাথে তার বিয়ে হয়। স্বামীর সাথে তিনি সিলেটে বসবাস করতে থাকেন। মাস দুয়েক সংসার করার পর তার মেয়েকে আনতে আগের স্বামীর বাড়ী যান। সেখান থেকে ফিরে এসে জানতে পারেন স্বামী বদলি হয়ে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সীমান্ত এলাকার কোন এক ক্যাম্পে আছেন। এক পর্যায়ে তিনি ঝিরাগাঁও গ্রামের জনৈক শহীদ আলীর আশ্রয়ে শিশুকন্যাকে রেখে দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা ক্যাম্পে যান।  তখন জুন মাস ছিল। সারা দেশে চলছিল তুমুল মুক্তিযুদ্ধ। সেই অবস্থায় স্বামীকে খুঁজতে গিয়ে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। পাকিস্তানি হায়ানার দল তাকে তাদের বাঙ্কারে দিনের পর দিন অমানুষিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে। এক পর্যায়ে তাঁকে ছেড়ে দেয় হানাদাররা। এরপরেই স্বামীকে খুঁজা বাদ দিয়ে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হবার প্রতিজ্ঞা করেন। যুদ্ধচলাকালীন ১৯৭১ জুলাই মাসে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দেখা করেন কাকন বিবি। এক পর্যায়ে তার আগ্রহে বীর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী দেখা করিয়ে দেন সেক্টর কমাণ্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর শওকতের সাথে। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় গুপ্তচর হিসেবে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করার। তিনি সাহসিকতার সাথে বিভিন্ন রূপ ধারন করে পাকিস্তানীদের কাছ থেকে তথ্যসংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এরপর তার সংগৃহীত তথ্যের উপর ভিত্তি করে মুক্তিযোদ্ধারা অনেক সফল আক্রমণ চালান। পরাস্ত করেন পাক হানাদার বাহিনীকে।

গুপ্তচরের কাজ করতে গিয়ে তিনি দোয়ারাবাজারের বাংলাবাজারে অাবারো ধরা পড়েন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে। এসময় একনাগাড়ে ৭ দিন স্থানীয় রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনী অমানবিক নির্যাতন চালায় তার উপর। লোহার রড গরম করে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দেওয়ার মতো বর্বরোচিত তাণ্ডব চালায় তার উপর। এক পর্যায়ে হানাদাররা তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। দিন কয়েক পর তার জ্ঞান ফিরে আসলে তাঁকে উদ্ধার করে বালাট সাবসেক্টরে নিয়ে আসা হয়। এরপর তিনি সুস্থ হয়ে উঠে পুনরায় ফিরে আসেন বাংলাবাজারে। মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর কাছে তিনি অস্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেন এবং পরবর্তীতে তিনি সম্মুখ যুদ্ধ আর গুপ্তচর উভয় কাজই শুরু করেন।

তিনি প্রায় ২০টি যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের শেষদিকে নভেম্বর মাসে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। এসময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সেই ক্ষতচিহ্ন নিয়ে তিনি  বেচেঁ ছিলেন মৃত্যুর অাগ পর্যন্ত।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলো পৃথিবীর মাইচিত্রে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাকন বিবি ঝিরাগাঁও গ্রামে এক ব্যক্তির কুঁড়েঘরে মেয়ে সখিনাসহ আশ্রয় নেন। এরপর প্রায় ২ যুগ তিনি চলে যান সবার চোখের অন্তরালে।

১৯৯৬ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রচারণায় আড়ালে থাকা কাকন বিবি দেশব্যাপী আলোচনা আসেন।  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে অাসেন কাকন বিনি। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাকন বিবিকে এক একর খাস জমি প্রদান করেন। এবং কাকন বিবিকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করেন। 

ফেসবুক মন্তব্য