নিউজটি পড়া হয়েছে 356

কাশফিয়া আঁখির ছোট গল্প ‘মুখোশ’

মুখোশ
কাশফিয়া আঁখি

একটা নিউজের কাজ শেষ করে শোবার ঘরে যখন উঁকি দিলাম তখন রাত দেড়টা ছুঁই ছুঁই। মৃদু আলোয় বিছানায় শুয়ে থাকা আমার ছেলে মেয়ে দুটিকে ঘুমন্ত ফুলের মতো দেখাচ্ছে। মেয়েটা আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বুঝতে চায় না। বাসায় এলে মোটেই কাছছাড়া হতে চায় না আমার রাতের বেলাতেও সে আমার গলা ধরে ঘুমাবে। সন্তানেরা যখন পৃথিবীর আলো দেখলো তখন থেকে আমাদের দেহের দূরত্ব বেড়ে গেলো। বিছানার এইপাড়ে আমি আর ঐ পাড়ে চারু। দেহের দুরত্ব বেড়ে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপ নেই কারণ মনের খুব কাছাকাছি আমাদের বসবাস। বিছানায় গা এলিয়ে দেবার বেশ কিছু সময় পর শুনতে পেলাম ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে চারু। এটা গত পনেরো দিন ধরে চলছে। আজকের কথা অংশ বিশেষ যা শুনলাম তা হলো, আমি বাসে আছি। ভোরের দিকেই নেমে যাবো। হুমম, তুমি এত উতলা হইও না তো। দশটার দিকে দেখা হবে আমাদের। তোমার এত ব্যকুলতা উপেক্ষা করি কি করে বল তো। হুম,,নীল শাড়ি পড়েই আসবো। কথাগুলো শুনে স্বামী হিসাবে আমার প্রচন্ড রাগ করার কথা থাকলেও আমি রাগ করতে পারছিনা। হাসি পাচ্ছে খুব। অগ্যতা নিশ্চুপ একগাল হেসে ঘুমের ভেতর ডুব দিলাম। সকালে চারুর ডাকে ঘুম ভাঙলো আমার। চারুর পুরো নাম চারুলতা। আমাদের আট বছর বয়সী সংসার জীবনের প্রাণ সে। চারু ডেকে বললো তাড়াতাড়ি উঠো ছেলেকে স্কুলে রেখে আসো। আমি চোখ মেলে তাকাতেই ওর স্নিগ্ধ মুখ শীতলতা ছড়িয়ে দিলো বুকে। ওর ভেজা চুলগুলো সারা পিঠময় ছড়িয়ে আছে। কি মিষ্টি দেখাচ্ছে ওর মুখটা। একটা প্রশ্ন উঁকি দিয়ে আপনা আপনি মিলিয়ে গেলো আবার। ও আজ এত সকালে গোসল সেরেছে কেন? ওহ্, আজ তো ওর কারোর সাথে দেখা করতে যাবার কথা। বিছানা ছেড়ে ওয়াশ রুমের দিকে চলে গেলাম সোজা চারুর কথার কোন জবাব না দিয়েই। ছেলেকে স্কুলে রেখে টুকটাক বাজার করে যেই না বাসায় ফিরেছি, অমনি দাদীর কোলে থাকা মেয়েটা এসে জাপটে ধরলো আমাকে। মেয়েকে নাস্তা খাইয়ে নিজের খাবার শেষ করে অফিসে বেরুতে বেরুতে সাড়ে নয়টা বেজে গেলো। বাসা থেকে নেমে মোড়ের দোকানে গিয়ে থামলাম। একটা সিগারেট কিনলাম। সাধারণত সিগারেটের নেশা নাই আমার বন্ধুবান্ধদের পাল্লায় পরে একটু আধটু নিই। আজকে কেন জানিনা সিগারেটের ভেতর সুখটানে মশগুল হলাম। বারবার হাত ঘড়িটা দেখছি আর আমাদের বাড়ির রাস্তার দিকে তাকাচ্ছি। নিজেকে আমি ঠান্ডা মাথার মানুষ জানতাম এত বছর ধরে। কিন্তু আজ তা ভুল প্রমানিত হলো। ভীষণ রকম অস্থিরতায় ভুগতে লাগলাম আমি। কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে বললাম, জন্মদিনের ট্রিট দিতে পারিনি সময়ের জন্য আজকে দশটার ভেতর চলে আয় ফ্রি আছি। তারাও অফারটা লুফে নিয়ে বললো, ঠিক পৌঁছে যাবো। যাদের ফোন করেছি তারা কেউ চারুকে চেনেনা। চারু খুব ঘরকোন মেয়ে। বাইরের জগত নিয়ে কোন রকম মাতামাতি নেই তার। আমাকে আর আমাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেই সে সুখ পেত। আমার অস্থিরতা বেড়েই চলছে। ঘড়ির কাটায় যখন দশটা সাত তখন চারু এসে দাঁড়ালো রাস্তায়। একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়লো তাতে। তার আগমনে অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তার সাথে দেখা হোক চাইনা। আমরা চার বন্ধু যখন রেষ্টুরেন্ট এ ঢুকলাম পুরো রেষ্টুরেন্ট ফাঁকা। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক কফি খাচ্ছেন আর ফোনে শেয়ার বাজারের আপডেট ঘাটছেন। চারুর পড়নে নীল শাড়ি, আর তার সাথে দেখা করতে আসা ছেলেটা সাদা শার্ট গায়ে। আমরা চারুর টেবিলকে পেছনে ফেলে সামনে টেবিলে বসতে গিয়েই চোখাচোখি হয় সাদা শার্ট পড়া লোকটার সাথে। আরে,, এটা তো আমার স্কুলে বেলার বন্ধু রায়হান। তার মুখে লাজুক হাসি। কাছে এগিয়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে নিই একে অপরকে। চারুর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল রায়হান, দোস্ত আমার গার্লফ্রেন্ড জেরিন। ঢাকা থেকে এসেছে আমার সাথে দেখা করতে। আমি জেরিন নাম চারুকে বললাম, ভালো আছেন? হাসি হাসি মুখে চারু মাথা ঝাকালো। তার ভেতর কোন ভনিতা নেই। যেন সব কিছু খুব স্বাভাবিক। আমি রায়হানকে বললাম,,তবে যে খুব গলাবাজি করিস। তোকে পটাতে পারে এমন মেয়ে নাই!! আর বলিস না দোস্ত, জেরিনের ভেতর কি আছে জানিনা। মাত্র পনেরো দিনের পরিচয়ে ফিদা হয়ে গেছি। বাহ্ বেশ চালিয়ে যা। আমরা একটা ট্রিট দিতে এসছিলাম। তোদের সমস্যা হলে চলে যাই অন্য কোথাও। আরে পাগল নাকী!! তোরা বস সমস্যা নেই। এমনিতেও জেরিন খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছে। ও আচ্ছা । অল দ্যা বেস্ট দোস্ত। আমাদের খাওয়া শেষ হবার আগেই চারু বেরিয়ে গেছে। রায়হান এসে যোগ দিয়েছে আমাদের সাথে। তারপর রসিয়ে রসিয়ে চারুর সে কি গল্প করছে। আমি চুপচাপ শুনছি তার গল্প। তার গল্প শুনে নিজের ভেতর কোন পতিক্রিয়া দেখছি না। আগামীকাল তারা একটা রিসোর্টে মিট করবে এমনটা রায়হান ঠিক করেছে মনে মনে। যদিও চারুকে সে জানায় নি কিছুই এখনো। রিসোর্টের বন্ধ কামড়ায় জেরিন নামক চারুকে সে পুরোপুরি তার করে নেবে এটাই তার লক্ষ্য। আমি শুধু বললাম,,,শালা বুড়া হইয়া যাইতেছো বিয়ার কথা কইলেই খালি কও মাইয়া মানুষ ঘৃণা করো আর এদিকে ১৫ দিনেই প্রেমে পরো আবার রিসোর্টে রুম ডেটে চলে যাবার স্বপ্ন দেখো। আমার কথায় লজ্জা ধারকাছ দিয়েও গেল না রায়হান বরং,,,ফিসফিসিয়ে বললো, সাধা লক্ষী পায়ে ঠেলতে হয় না দোস্ত। গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু না…. পরের দিন বিকালে রিসোর্টের ২০৪ নং কামড়ায় অধীর হয়ে অপেক্ষায় রায়হান তার জেরিনের জন্য। দরজায় কড়া নাড়লাম আমি। দরজা খুলে আমাকে দেখে খুবই অপ্রস্তুত হয়ে গেলো রায়হান। বাংলার পাঁচের মত মুখ করে বললো, তুই এই সময়ে এখানে। হুমমম ,, এলাম আমার বাচ্চা দুটোকে নিয়ে। রিসোর্টের কিডর্স জোনটা আমার বাচ্চাদের অনেক পছন্দ। প্রায়ই নিয়ে আসি। তাই ভাবলাম তোকে নক দিই। রুম নম্বর পেলি কই? সে ম্যানেজ করা কোন ব্যপার! তোর জেরিন আসে নাই? না,, এখনো তো এলো না। ফোনটাও সুইচ অফ দেখাচ্ছে। মেজাজটা বিগড়ে আছে দোস্ত। আমরা ভেতরে এসে একটু বসি? না রে দোস্ত জেরিন যে কোন সময় চলে আসলে পরে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। আর কোন ভনিতা না করে সোজাসাপটা বললাম, জেরিন এসেছে তো! কই? এই যে আমার পিছনে দেখ। এবার দরজার সামনে এসে উঁকি দিল রায়হান। রক্তশূণ্য দেখাচ্ছে তার মুখ। পাথরের মতো চেয়ে আছে চারুর দিকে। চারুর একটি হাতে আমার হাত ধরা অন্য হাতে আমার ছেলে। আর কোন প্রশ্ন করেনি রায়হান। আর কোন উত্তরও দিইনি আমি।

শুধু বললাম,,,আমাদের দেখায় আর আমাদের কল্পনায় অনেক পার্থক্য। তোর এই রূপটা দেখার ছিলো। ভালো থাকিস খুব। আর এক মিনিট সময়ও ব্যয় করিনি সেখানে। চারুর হাতটা ধরে বাসার পথে এগিয়ে গেলাম।
লেখক: কাশফিয়া অাখিঁ
মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি, সিলনিউজ২৪.কম
ফেসবুক মন্তব্য