নিউজটি পড়া হয়েছে 73

রক্তলাল স্বাধীনতাঃ ফাহাদ আহমেদ

শ্রীরামসি। সিলেটের জগন্নাতপূরের ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের মানুষগুলোও একদম সহজ সরল। এই গ্রামেরই ছেলে রহিম। দুরন্ত এক বালক। সারাদিন গ্রামের মাঠে-ঘাটে হেঁসে খেলে দিন কেটে যায় ওর। কতই আর বয়স হবে ওর এই তেরো কি চৌদ্ধ। গ্রামের সমবয়েসীদের সাথে, রহমান চাচা, জব্বার চাচা, দেবু চাচাদের বাড়ী থেকে ফল পেড়ে খাওয়া, পুকুর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে মাছ ধরা এইসব কর্মকান্ডই ওর নিত্যসঙ্গী। রাতে মায়ের কোলে মাথা রেখে বকুনির সাথে ভাত খাওয়া। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই চারটে খেয়ে সঙ্গীদের সাথে বেরিয়ে গ্রামের মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো। এসব করেই দিন কেটে যাচ্ছিলো ওর। কিন্তু কে জানতো, শান্তির এই গ্রামে একদিন কিছু বেইমানরা অশান্তির বার্তা নিইয়ে আসবে। কে জানতো, যাদের সাথে সবসময় একই প্লেটে খাবার ভাগাভাগী করে খাওয়া হতো তারাই একদিন চোখ বদলাবে।

.

প্রতিদিনের মত আজও রতন, সঞ্জয়দের সাথে বেরিয়েছে খেলাধুলা করতে। কিন্তু আজ কেনো যেনো গ্রামের পরিবেশ ঠিক সুবিধার মনে হচ্ছে না। খালের ওপারে মতি চাচার চায়ের দোকানের সামনে লোকজনের ঝটলা লেগে আছে। কি নিয়ে যেনো ঝামেলা হচ্ছে। সেদিকে এগিয়ে গেলো রহিমরা। খাল পাড়ি দিতেই হট্টগোলের শব্দ আসলো। মতি চাচার দোকানের কাছাকাছি যেতেই শোনা গেলো, ভিড়ের মধ্যভাগ থেকে একজন লোক কি সব হুমকি ধামকি দিয়ে যাচ্ছে উপস্থিত সবাইকে। খানিকটা আগাতেই পরিষ্কার হয়ে দেখা গেলো হুমকিদাতার মুখ। আরে এ যে ওয়াতির চাচা, বাবার সাথে গঞ্জে একই সাথে ব্যাবসা করেন। ভীড়ের কারনে পুরোপুরি শোনা যাচ্ছিলো না কি নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে। কিছুক্ষন কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে দেখা গেলো গ্রামবাসী উত্তেজিত হয়ে উঠলো। একপর্যায়ে একজন মুরুব্বি গোছের মানুষ বলে উঠলেন, এদেরকে গ্রাম থেইকা বাইর কইরা দেও। উত্তেজিত কিছু যুবক ওয়াতির ও তার সাথে থাকা লোকটিকে তাড়িয়ে দিতে লাগলো। রহিম ছোট মানুষ, ও কিছুই বুঝলো না। শুধু কেনো যেনো খারাপ লাগলো।

.

রাতে ঘরে ফিরে খাওয়া-দাওয়া করার পর রহিম তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো ‘আজ মতি চাচার দোকানের সামনে কী হয়েছিলো, ওয়াতির চাচাকে কেনো গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়া হলো?

উত্তরে বাবা বললেন, কিছুনা বাপ। মানুষ গুলো খুব তাড়াতাড়ী বদলে যায়।দেশে আর শান্তি নাই। মুজিব সাহেব যুদ্ধের ঘোষনা দিছেন, উনারে পাকিস্থানীরা ধইরা নিয়া গ্যাছে।পাকিস্থানীগো অনেক অত্যাচার সহ্য করছি, আর না। এইবার আমগো মুক্তি হইবো।আমরা স্বাধীনতা আনমু বাপ।

রহিম আবার বলে, বাবা, স্বাধীনতা কী?

(রহিমের প্রশ্ন শুনে হাসেন রহিমের বাবা) বাপ, স্বাধীনতা মানে হইলো “একটি বাংলাদেশ আমাগো হইবো। আমরা ভালোভাবে বাচতে পারবো। স্বাধীনতা মানে একটি পতাকা, স্বাধীনতা মানে আমাদের নিজস্ব পরিচয়”।

তাহলে বাবা আমিও যুদ্ধে যামু।

হ বাপ। যাবি তুই যুদ্ধে, রক্তলাল স্বাধীনতা নিয়ে ফিরে আসবি। এখন ঘুমা।

অবুঝ রহিম পুরোপুরী বুঝে উঠতে পারেনি এখনো যুদ্ধ মানে কী, কিভাবে যুদ্ধ করবে।

.

গভীর রাত। হঠাৎ করে চিৎকার চেচামেচি শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেলো রহিমের। ঘুম দেখে উঠে দেখে মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, দরজা খোলা।

মা, বাবা কই? বাইরে এত চিল্লাচিল্লি কিসের?

মা ভয়ার্ত মূখে বলেন, বাপ আমগো গ্রামে মনে হয় মিলিটারি ঢুকসে। তর বাপ ঐদিকে গ্যাছে।

এমন সময় দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকে রহিমের বাপ। রহিমের মা একগ্লাস পানি দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে বাইরে?

বউ, ওয়াতির পাকিস্থানী মিলিটারিদের সাথে হাত মিলাইছে। গতকাল গ্রামের মানুষদের বলছিলো গ্রামবাসী যেনো শান্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। গ্রামের মানুষ ওর কথায় রাজী হয় নাই। ওরে সবাইলে মিলে গ্রাম থেকে বের করে দিছিলো। এখন সে গ্রামে মিলিটারি নিয়া ঢুকসে। সবাইকে গুলী করে মারতেছে, ঘরবাড়ীতে আগুন দিচ্ছে। এদিকেই আসতেছে ওরা। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নাও। এক্ষুনি পালাতে হবে। বলেই ঘরের দরজা লাগিয়ে দেয় রহিমের বাপ।

এমন সময় বাইরে দরজায় ধাক্কাধাক্কির শব্দ শোনা গেলো। রহিমের বাপ আঙুলের ইশারায় ওদেরকে চুপ থাকতে বলে। দরজায় ধাক্কাধাক্কাইর শব্দ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে দরজাটা ভেঙ্গে ফেলবে। নিরুপায় হয়ে রহিমের বাপ দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলে দিতেই একটি গুলির আওয়াজ। রহিমের বাবা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো, রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘর।

এরই মধ্য কয়েকজন মিলিটারি ঘরে প্রবেশ করলো। রহিম আর তার মা কে ধরে টেনেহিচড়ে বাইরে বের করলো। বাইরে বের করার পর ছোট্ট রহিমের বুকে একজন মিলিটারি লাথি মারলো। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ওর। এমন সময় আরো একজন মিলিটারি ওর দিকে বন্দুক তাক করলো। বন্দুকের দিকে তাকিয়ে রহিম দেখলো, নল থেকে একটুকরো আগুনের ফুলকি প্রচন্ড গতিতে ওর দিকে ধেয়ে আসছে। তল পেটে হাত দিলো ও, রক্তে পুরো শরীর ভিজে যাচ্ছে ওর। দুর্বল চোখে তাকালো ও মায়ের দিকে। ওর মাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে মিলিটারিরা, সাথে ওয়াতির চাচা। দূরের আকাশে ফুটে উঠছে ভোরের লাল আভা। টকটকে লাল সূর্য। স্বাধীনতার রক্তলাল সূর্য।

[সিলেটের জগন্নাথপূরের শ্রীরামসি গ্রামবাসীদের উপর পাক-হানাদার ও তাদের দোসরদের চালানো গনহত্যা “শ্রীরামসি ট্রাজেডী” অবলম্বনে]

লেখকঃ ফাহাদ আহমেদ।

স্টাফ রিপোর্টার, সিলনিউজ২৪ডটকম।

ফেসবুক মন্তব্য
Share Button
শেয়ার করুন
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share