নিউজটি পড়া হয়েছে 166

জীবনযুদ্ধে পরাজিত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা মজমিল মিয়ার স্বপ্নের দেশে স্বীকৃতি নেই : প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ার বেদনা।

বিপ্লব দেব নাথ, জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের গন্ধর্ব্বপুর গ্রামের মরহুম আকরম উল্লাহর ছোট ছেলে যুদ্ধাহত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মজমিল মিয়া মুক্তিযোদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে বিজয়ী হলেও জীবনযুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে (পহেলা সেপ্টেম্বর) রানীগঞ্জ বাজারের গণহত্যার সময় পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রমনের শিকার হয়ে ডান পা হারান। তবে তিনি পঙ্গু ভাতা পেলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নেই কোন স্বীকৃতি কিংবা সুযোগ-সুবিদা ।

সরজমিনে জানা যায়, ১৯৭১ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী রানীগঞ্জ বাজারে গণহত্যা চালায়। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান কয়েকজন, এর মধ্যে একজন মজমিল মিয়া । এদেরকেও পাক সেনারা হত্যার উদ্যেশে বেঁধে এনেছিল হত্যার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এঁদের বুকে বা পেটে গুলি না লেগে পায়ে গুলি লাগায় তাঁরা বেঁচে যান। মুক্তিযোদ্ধা মজমিল মিয়া আজও পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। ঐদিন পাকবাহিনী রশি দিয়ে বাঁধা সারি সারি লোকজনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে তাদের কুশিয়ারা নদীতে ফেলে দেয়। ব্রাশফায়ারের শিকার মোঃ মজমিল মিয়ার পায়ে গুলি লাগায় তিনি বেঁচে যান। বেঁচে থাকা এই মুক্তিযোদ্ধার পা কেটে বাদ দিয়ে এখন মড়ণের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন তিনি । সেই থেকে পঙ্গু মজমিল মিয়া ক্র্যাচে ভর করে ৪৬ টি বছর পেরিয়ে এসেছেন স্বপ্নের স্বাধীন দেশ বাংলাদেশে। কিন্তু তাঁর কপালে জুটেনি মুক্তিযুদ্ধের তকমা। আইনের মারপ্যাঁচে এই ধরনের কত আত্মদান বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে । স্বীকৃতির না পাওয়ার অভাবে জানার বাইরে রয়ে গেছে অনেক রহস্য। তিনি ৩ ছেলে ৫ মেয়ে নিয়ে শরিরে বিভিন্ন রোগ নিয়ে কষ্টে জীবন যাপন করছেন। তিনি জীবনযুদ্ধে একজন পরাজিত সৈনিক।

যুদ্ধাহত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মজমিল মিয়া এ প্রতিবেদককে জানান, ১৯৭১সালের পহেলা সেপ্টেম্বর পাক হানাদার বাহিনী একটি নৌকা রানীগঞ্জ বাজারে অবতরণ করে। পাক বাহিনীর স্থানীয় দুসররা নিরীহ ব্যবসায়ী ও গ্রামের লোকজনদের ধোকা দিয়ে এক জায়গায় জমায়েত করতে থাকে। একে একে প্রায় তিন শতাধিক লোক জড়ো করে। বাজারের গলিতে ১৫ থেকে ২০ টি সাড়িতে দাড় করায়। এক এক করে প্রত্যেক সারিতে ব্রাশ ফায়ার করে বাজারে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। বাজারের সাদা গলিটি মুহুর্তের মধ্যে লাল হয়ে যায়। দোকান ঘরে পাক সেনারা অগ্নি সংযোগ করে এবং মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। ব্রাশ ফায়ার করার পর কিছু লাশ পাক সেনারা নদীতে বাসিয়ে দেয় এবং বাজারের গলিতে প্রায় ১২৬টি লাশ পরে থাকে। এদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন লোক সৌভাগ্যক্রমে বেচে যান। তাদের মধ্যে আমি মজমিল মিয়াও, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কুশিয়ারা নদীর জলে ভাসতে ভাসতে নিকটবর্তী বাগময়না গ্রামের নদীর চরে আটকে যাই। গ্রামের লোকজন লাশ ভেবে আমাকে ডাঙ্গায় তুলে নেয় তারপর দেখা গেল দেহে প্রাণ আছে। সাথে সাথে স্থানীয় ভাবে আমার চিকিংসার ব্যবস্থা করা হয়। অবস্থার অবনতি থাকায় ১৯৭১ সালে কাজল হাওর নামে পরিচিত বর্তমান ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে মোটামুটি সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। সে সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনির প্রধান এম,এ জি ওসমানী সহ অনেক কমান্ডার সেখানে গিয়ে আমাদের দেখে আসেন । আমার সাথে আমি সহ সেখানে অনেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসাধীন ছিলেন । আমার ডান পায়ে ও পায়ের উড়–তে গুলির আঘাত নিয়ে সেই ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। নয় মাস যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হলো অন্যদের মতো আমিও আশায় বুক বাঁধি। সেই সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে ৫০০ টাকার চেক পেয়েছি। রানীগঞ্জ শহিদ স্মৃতি সৌধে পঙ্গু লিষ্টে ২নং সিরিয়ালে আমার নাম রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধের পর আরও অনেক কাগজ রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও সেই আশা যেন হতাশার পাহাড়। মুক্তিযোদ্ধের যুদ্ধাহত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি কিন্তু পায়নি সরকারি অন্য কোন সুযোগ-সুবিধা। বারবার ধর্না দিয়ে আমি এখন ক্লান্ত । রানীগঞ্জ বাজারে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছি । বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জীবনবাজি রেখে আমাদের অনেকেই যুদ্ধ করেছেন। গুলি যখন লেগেছে তখন মরেও যেতে পারতাম। কিন্তু আজ পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। কেউ ফিরেও তাকায় না আমার দিকে। প্রাপ্য সম্মানটাও নেই আমার। আমি এসব কথাগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সংবাদ পত্রের মাধ্যমে জানাতে চাই।

ফেসবুক মন্তব্য
xxx