নিউজটি পড়া হয়েছে 153

মানবাধিকার দিবসে আমাদের প্রত্যাশা।

 

 

মানবাধিকার দিবসে আমাদের প্রত্যাশা

 

জাহাঙ্গীর হোসাইন চৌধুরীঃ  মানবাধিকার শব্দটিকে ভাঙ্গলে দু’টি শব্দ পাওয়া যাবে, একটি মানব ও অন্যটি অধিকার। মানবাধিকার শব্দের মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে মানুষের অধিকারকে। মানবাধিকার মানুষ হিসাবে তার মৌলিক অধিকার গুলোকে বুঝায়, সহজ ভাষায় মানবাধিকার হচ্ছে মানুষের সহজাত অধিকার যা যে কোন মানব সন্তান জন্মলাভের সাথে সাথে অর্জন করে। মূলত যে অধিকার মানুষের জীবনধারণের জন্য, মানুষের যাবতীয় বিকাশের জন্য ও সর্বোপরি মানুষের অন্তরনিহিত প্রতিভা বিকাশের জন্য আবশ্যক তাকে সাধারণ ভাবে মানবাধিকার বলা হয়। জীবনধারণ ও বেঁচে থাকার অধিকার এবং মতামত প্রকাশের অধিকার, অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের অধিকার প্রভৃতি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে মানবাধিকার বলতে পারি।

জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্টা ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০টি ধারা সংবলিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস ঘোষণাপত্র অনুমোদন করে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস পুরানো, যুগে যুগে লঙ্ঘিত হয়েছে মানবাধিকার, তবে ১৯১৪ সাল হতে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলতে থাকে যেখানে প্রায় দেড় কোটি মানুষ নিহত হয়। এরপর ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় যেখানে প্রায় ছয় থেকে আট কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। তখন থেকে মানবাধিকার প্রতিষ্টার জন্য সারা বিশ্বের মানুষ নতুন করে চিন্তা ভাবনা শুরু করল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময় থেকে মিত্রশক্তি মানবাধিকারের কথা চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। ১৯৪১ সালের ১৪ই আগষ্ট আটলান্টিক চার্টার ও ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের গৃহীত ঘোষণায় এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। ১৯৪৫ সালে সান-ফ্রান্সিসকোতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে মানবাধিকারের ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট নীতিমালা ছিল না, যদিও একটি মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি মাসে সাধারণ পরিষদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্জাতিক অধিকারসমূহের বিল প্রণয়ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি হতে এর কাজ শুরু হয়। অতঃপর ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের ৩৮টি দেশের সম্মতিতে সর্বপ্রথম মানবাধিকার সনদ প্রণয়ন করা হয়। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৫০ সালে সাধারণ পরিষদের ৩১৭তম প্লেনারি সভায় ৪৩২ (ভি) প্রস্তাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতি বছর ১০ই ডিসেম্বর যথাযথ মর্যাদায় বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক ও দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনসমূহ সহ অনেক সামাজিক সংগঠন।
মানবাধিকার প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। নাগরিক জীবনের বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য মানবাধিকারের প্রয়োজনীয়তাকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না, পারবে না। মানুষ জন্মগত ভাবেই স্বাধীন। ফরাসী দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাঁক রশো বলেছেন, প্রতিটি মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে। ব্যক্তি সমাজ জীবনে যে সকল সুযোগ সুবিধার দাবিদার হয় এবং যে সকল সুযোগ সুবিধা ছাড়া ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভা বিকাশিত হয় না, তাই হচ্ছে মানবাধিকার। মানুষ জন্মগত ভাবেই এ মর্যাদার অধিকারী।
বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার বিযয়টি সর্বাধিক আলোচিত। জাতিসংঘের ঘোষণায় বলা হয়েছে, মানবাধিকার ভোগের বেলায় জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব যে ধরণের নাগরিকই হোক না কেন, তার রাজনৈতিক মতার্দশ ও পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, সে যে দেশেরই নাগরিক হোক না কেন, অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগের ক্ষেত্রে কোন তারতম্য বা পার্থক্য করা হবে না। প্রতিটি রাষ্ট্রের নাগরিক যাতে অধিকার ও স্বাধীনতা সমমর্যাদার সাথে ভোগ করতে পারে তার জন্যেই জাতিসংঘ মানবাধিকারের ঘোষণা করে।
মানবাধিকার সনদে এসব ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও আজ বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে। মিয়ানমারে বছরের পর বছর রোহিঙ্গা মুসলমারদের উপর অবর্ণনীয়ন নির্যাতন চলছে। রোহিঙ্গারা আজ তাদের আদি নিবাসে বহিরাগত। মানবাধিকার সনদে ১৫ অনুচ্ছেদে বর্নিত জাতীয়তা সংক্রান্ত ঘোষণার প্রতি বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দেশটির সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব পুর্নবহাল করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দেশটির সরকার। কয়েক লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশে পালিয়ে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আবার অনেকেই দেশটির সামরিক জান্তার হাত হতে হয়েছে চরম নির্যাতনের শিকার। ১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনিরা নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রে উদ্বাস্তু হিসাবে বসবাস করছে। আর যারা ভুমি কামড়ে পড়ে আছে তারা ইসরাইলি বর্বরতার শিকার হয়ে সর্বদা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বসবাস করছে।
অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও অসংখ্য মানুষ মানবাধিকার ভোগ করতে পারছে না, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। একটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার দিকে নজর রাখলেই চলে। খুন, গুম, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, লুটপাট, দুর্নীতি, দলীয়করণ, বাল্য বিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন, বাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া ও ভাংচুরের মতো ঘটনার খবর মিডিয়াগুলোতে প্রতিদিনই আসছে। বিনা বিচারে সাজা ভোগ করছে অসংখ্য মানুষ, নিরপরাধ মানুষেরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকদের হাতে নিরীহ মানুষেরা যেমন নির্যাতিত হচ্ছে নিপীড়িত হচ্ছে, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে তেমনি সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ কিংবা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের হাতেও নিরীহ মানুষ প্রাণ দিচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে। এর কোন বিচারও তারা পাচ্ছে না। আশ্রয়হীন অসংখ্য মানুষ অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা সহ জীবনধারণের অন্যান্য মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আইনের অপব্যবহার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নিরীহ জনসাধারণকে নির্যাতন ও হয়রানির মতো ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। বাক স্বাধীনতা হরণ, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের উপর নির্যাতন ও হয়রানির মতো ঘটনা সহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য দায়িত্ব সর্বোপরি মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনই হচ্ছে মানবাধিকার ঘোষণার মূল মন্ত্র। আমাদের দেশের সংবিধানেও মানবাধিকার সংরক্ষণের কথা থাকলেও মানুষ প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের। বিশ্বে যে সকল দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, আর্ন্তজাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন গুলো।

বাংলাদেশে নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষায় আইন রয়েছে, রয়েছে মানবাধিকার কমিশনও। কিন্তু আইনের যথাযথ ব্যবহার, মানবাধিকার কমিশনের উদাসহীনতার কারণে নাগরিকের মানবাধিকার সুরক্ষা হচ্ছে না। মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারকে আরও তৎপর হতে হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, কারণ আইন প্রয়োগের ভিত্তিটা যদি সুদৃঢ় হয় তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অনেকটা হ্রাস পাবে। মনে রাখতে হবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন না করে তাহলে মানবাধিকার রক্ষা ও বাস্তবায়ন হবে না, কারণ মানবাধিকার আইন দ্বারা রক্ষিত হয়। মানবাধিকার রক্ষায় জনসাধারণের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ, তাই মানবাধিকার সর্ম্পকে জনসাধারণকে সচেতন করে তুলতে হবে, মানবাধিকারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সর্ম্পকে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে দেশের অভ্যন্তরে গড়ে উঠা মানবাধিকার সংগঠনগুলিকে আরও তৎপর হতে হবে, আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। মানবাধিকার সর্ম্পকে সৃষ্ট জনসচেতনতাই সরকারকে বাধ্য করবে মানবাধিকার রক্ষা ও বাস্তবায়ন করতে। আমাদের মনে রাখা উচিৎ ব্যক্তি হিসাবে প্রতিটি মানুষ তার মানব অস্তিত্বের ভিত্তিতে নিশ্চিত ভাবে মানবাধিকার পাওয়ার যোগ্য। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান হলো মানুষের মৌলিক অধিকার এ অধিকারগুলি নিশ্চিত, ন্যায় বিচার, আইনের শাসন বাস্তবায়ন এবং মানুষের জান-মালের সুরক্ষা করতে পারলেই নিশ্চিত হবে মানবাধিকার। পৃথিবীর সকল দেশের প্রতিটি মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হোক, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকুক, এটাই আজকের বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখকঃ সাহিত্য সম্পাদক, হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ ট্রাষ্ট অব বাংলাদেশ, সিলেট বিভাগ।

ফেসবুক মন্তব্য
Share Button
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •