নিউজটি পড়া হয়েছে 24

পদ্মা সেতুর ৩৭ ও ৩৮ নং পিলারে ক্যাপ বসানো হবে সেপ্টেম্বরে।

সিলনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম ::: স্বপ্নের পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের জাজিরা (দক্ষিণ) প্রান্তের ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারে ক্যাপ বসানো হবে সেপ্টেম্বর মাসেই। তাছাড়া শিগগির উঠবে এই দুটি পিলারের মধ্যেকার স্প্যান। ছয় মিটার উচ্চতার ক্যাপ বসানো হবে ১১ মিটার উচ্চতার পিলারের ওপরে। অর্থাৎ নদীর পানির লেভেল থেকে চারতলা ভবনের সমান ১৭ মিটার উঁচুতে গাড়ি চলাচলের জন্য বসবে সেতুর ছাদ। শনিবার প্রকল্পের নথি ও কর্মকর্তাদের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রানুযায়ী, পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ এ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। কর্তৃপক্ষ শুরুতে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা থেকে অগ্রগতি ৫-৬ শতাংশ কম। পিলারের ওপর ইস্পাতের মূল কাঠামো স্থাপনও কিছুটা পিছিয়ে গেছে। নদীর তলদেশের মাটিতে কিছু সমস্যার কারণে এমনটি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতবছর ডিসেম্বর মাসেই নির্মাণাধীন পদ্মা বহুমুখী সেতুর জাজিরা প্রান্তে দুটি পিলারের মধ্যে একটি ইস্পাতের কাঠামো (স্প্যান) বসানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। নকশা অনুসারে ইস্পাতের এই কাঠামোর ভেতর দিয়েই হবে রেলপথ। আর ওপর দিয়ে থাকবে যানবাহন চলাচলের পথ। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সেই ইস্পাতের কাঠামো তৈরির কাজ চলছে জাজিরায়। শিগগিরই তা বসানোর কাজ শুরু হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো প্রথমে বসানো হবে দক্ষিণ প্রান্তে। ফলে জাজিরার দিক থেকে সেতুটি দৃশ্যমান হবে।

সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে সেতু বিভাগ। সেই পরিকল্পনায় চার বছরে অর্থাৎ ২০১৮ সালের নভেম্বরের মধ্যে মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে। মাওয়ায় প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে এসে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিবার ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরার মধ্যে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে চলছে। পদ্মার দুই পাড়ের ডাঙার অংশ ধরলে দৈর্ঘ্য হবে ৯ কিলোমিটারের বেশি।

তিন দফা সংশোধনের পর পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। সাধারণত তিনবারের বেশি প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধনের সুযোগ নেই। তবে পদ্মা সেতু প্রকল্পে প্রয়োজন হলে আরও সংশোধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতি সংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল সেতুর ৩৭ শতাংশ ও নদীশাসনের কাজ ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর বাইরে দুই পাড়ের সংযোগ সড়ক, টোল প্লাজা, সহায়ক অবকাঠামো ও পুনর্বাসনের কাজ প্রায় শেষ। সব মিলিয়ে প্রকল্পের কাজ ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে সেতুটি চালু করতে হলে আগামী প্রায় দেড় বছরে সম্পন্ন করতে হবে ৫৮.৫ শতাংশ কাজ। সেতু বিভাগের দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকার আগামী নির্বাচনের আগেই সেতুটি চালু করতে চায়। সেভাবেই এখন কাজ চলছে। কিন্তু পদ্মা নদীর গঠন এবং এর আচরণ নানা অনিশ্চয়তায় ভরা। ফলে মূল সেতু বাস্তবায়ন ও নদীশাসনের কাজ বেশ জটিল। পদে পদে চ্যালেঞ্জ আসছে। এরপরও সময় মতো কাজ শেষ করার ব্যাপারে আশাবাদী কর্মকর্তারা।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে এখন প্রায় তিন হাজার লোক কাজ করছেন। তবে কর্মীর সংখ্যা বাড়ে-কমে। শুকনো মৌসুমে বেশি লোক কাজ করে। আবার বর্ষায় কিছুটা কমে যায়। বর্তমানে কর্মরতদের মধ্যে আট শতাধিক বিদেশি রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই চীনা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশের নাগরিক আছেন। তাদের বেশিরভাগ পরামর্শক হিসেবে রয়েছেন। সেতু প্রকল্পে এখন পর্যন্ত সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার উপরে ব্যয় হয়েছে।

এখন যেসব কাজ হচ্ছে : প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদী ও ডাঙা মিলিয়ে ১৭টি স্থানে বড় বড় ক্রেন ও অন্য যন্ত্র বসিয়ে কাজ চলছে। এই স্থানগুলোতে পিলার উঠবে। ১ থেকে ৪২ পর্যন্ত নম্বর দিয়ে প্রতিটি পিলারের স্থান চিহ্নিত করা আছে। ১৭টি পিলারের স্থানে কোথাও চলছে পাইল বসানোর কাজ; কোথাও পাইলের ওপরে বসানোর ক্যাপ নির্মাণকাজ হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারী সব কাঠামো নির্মাণ শেষে মাঠ থেকে উঠিয়ে পিলারের ওপর বসানোর জন্য চার হাজার টন ক্ষমতার একটি ক্রেন এসেছে গত বছরের অক্টোবরে। কাজ দেরি হওয়ার কারণে সাদা রঙের এই ক্রেন মাঝনদীতে অলস বসিয়ে রাখা হয়েছিল বেশ কিছু দিন।

প্রকল্পের কাজে কিছুটা বিলম্ব ঘটায় এখন একটির বদলে একসঙ্গে পাঁচটি স্প্যান বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পর্যন্ত পিলারের ওপর এসব স্প্যান বসানো হবে। এর সবকটিই জাজিরা প্রান্তে অবস্থিত। দ্বিতল পদ্মা সেতুর নিচের অংশে রেললাইন বসাতে হবে। এর জন্য আলাদা প্রকল্প আছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের। আর ইস্পাতের কাঠামোর উপরের অংশে যান চলাচলের উপযোগী পথ তৈরি করতে দুই মিটার পুরো তিন হাজার কংক্রিটের সø্যাব বসানো হবে। এর উপর দেওয়া হবে বিটুমিনের স্তর।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে বিপুল ওজনের ইস্পাতের কাঠামো মাওয়া প্রান্তে রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে স্থাপনের জন্য ক্রেনে করে জাজিরায় নিয়ে যাওয়ার সময় ঝড়ের কবলে পড়বে কিনা, সেই শঙ্কা কাজ করছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। এ জন্য জাপান থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার আধুনিক যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি ২৪ ঘণ্টা আগেই আবহাওয়ার অবস্থা জানাবে।

কর্মকর্তারা জানান, পদ্মা সেতুর মোট ২৪০টি পিলারের মধ্যে ১২৬টির পাইল নকশায় উল্লেখ করা গভীরতায় বসালেই চলবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

প্রকল্পের মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ তদারক করছে কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। তাদের ওপরে রয়েছে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল। ১১ সদস্যের এই প্যানেলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও কলম্বিয়ার সেতু বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর নকশায় উল্লেখ করা গভীরতার চেয়ে গভীরতা আট মিটার বাড়িয়ে ৬২টি পাইল ১২৮ মিটার পর্যন্ত বসানো হয়েছে। আর কোনো পাইলের গভীরতা বাড়ানো প্রয়োজন কিনা, তা জানার জন্য আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে বলে সূত্র জানিয়েছে। সূত্র: আমাদের সময়

ফেসবুক মন্তব্য
Share Button