কাশফিয়া আঁখির শিশুতোষ গল্প “অদ্ভূত ভূতের গল্প”

অদ্ভূত ভূতের গল্প
কাশফিয়া আঁখি

গাড়িটা ছুটে চলছে বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে।দু পাশের সারি সারি গাছগুলোকে পেছনে ফেলে গাড়িটা দৌঁড়ে যাচ্ছে প্রাণপন। জানালার দিকে মুখ করে যে ছেলেটা মায়ের কোলে চুপচাপ বসে আছে তার নাম সৌখিন। ক্লাস থ্রী তে এবার ফাইনাল পরিক্ষা দিয়েছে সে। আর পরিক্ষা শেষ হবার ঠিক পর দিনই তার আবদারের কাছে হার মেনেছে বাবা-মা। বিকেলের রোদ কমার আগেই বাবা আর মায়ের সাথে সে ছুটছে নানু বাড়ির পথে।
গাড়িতে উঠার আগে বাবাকে সে ওয়াদা করিয়ে নিয়েছে, এবার স্কুল খোলা র্পযন্ত পুরো ছুটিটা সে নানু বাড়িতে কাটাবে। সেখানের বড়সর আঙিনা, ফসলের খোলা মাঠ,আধপাকা র্নিজন রাস্তা আর গাছে গাছে পাখির কিচির মিচির তাকে ভীষণ রকম আনন্দ দেয়। এছাড়া আরো একজনের টানে সে পাখির মতো ছুটে আসে এখানে।সেই একজনের তার নাম অপু।
অপুর কথা মনে পড়তেই সৌখিনের চোখের সামনে ভেসে উঠলো, হালকা পাতলা গড়নের শ্যামলা মুখের ছেলেটি। ঠোঁটে যার হাসি সবসময় লেগেই থাকে। হাঁটু বরাবর ঢাকা হাফপ্যান্ট আর সাদা সেন্ডু গেঞ্জি তার ১০ মাসের পোশাক। শীতের ২ মাস বড় কষ্টে সৃষ্টে কিছু একটা গায়ে চাপায় সে একান্তই ঠেলায় পরে।
গতবার নানু বাড়ি গিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করে মায়ের সাথে শুয়ে শুয়ে মায়ের শৈশবের গল্প শুনছিলো সে । গল্প শুরু করার আগে মা তাকে প্রমিজ করিয়ে নেয় গল্প শেষ হতেই সে ঘুমিয়ে যাবে লক্ষী ছেলের মতোন।
হঠাৎউঠানের ঐ পাশ থেকে অপুর গলা শুনতেই এক ছুট দিলো সৌখিন।কিসের গল্প শোনা আর কিসের ঘুম সব যাবে এখন চুলোয়।
দৌঁড়ে এসে উঠানে দাঁড়াতেই চোখে পরলো,অপুর হাতে এত্তো বড় একটা লাল ফড়িং। ফড়িং দেখে খুশিতে লাফাতে লাগলো সে।
ফড়িংটা নিজেকে অপুর হাত থেকে মুক্ত করার জন্য শুন্যে পা ছুঁড়তে লাগলো আর চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে পালাবার পথ খুঁজতে লাগলো বারবার।
অপু ফড়িংটা সৌখিনের কাছে এনে বললো, অনেক কষ্ট করে এ ফড়িংটা তোমার জন্য ধরেছি।নাও এবার ব্যাটার মতো এটাকে শক্ত করে ধরো তো।
হাত বাড়িয়ে ফড়িংটা এগিয়ে ধরে সে বললো , নাও পাখা দুটো শক্ত করে চেপে ধরো ।
সৌখিন ফড়িংয়ের পাখাদুটো ধরেছে সবে আর অমনি ফড়িংটা পা আর মুখ দিয়ে জাপটে ধরলো সৌখিনের আঙুল।
ভয়ে চিৎকার করে উঠলো সৌখিন।
হো হো করে হেসে উঠলো অপু। অনেককষ্টে নিজের হাসি থামিয়ে সে বললো দাঁড়াও, আমি ফড়িং এর লেজে সুতো বেঁধে দিই। তারপর তুমি সুতো ধরে রাখবে আর দেখবে ফড়িংটা কত সুুন্দর উড়ে বেড়াচ্ছে।
সৌখিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে কোন কথা বলে নিরবে দেখতে লাগলো পাশের ঘর থেকে অপু সাদা রঙের সুতো এনে কয়েক বারের চেষ্টায় ফড়িংয়ের লেজে সুতোটা বাঁধলো।লেজে সুতো বাধাঁ ফড়িং সে সৌখিনের হাতে তুলে দিলো।
ফড়িংটা উড়ছে সৌখিন সুতো ধরে ধরে তার সাথে দৌঁড়াচ্ছে। সৌখিনের সাথে অপুও দৌঁড়াচ্ছে।
অপু সর্ম্পকে সৌখিনের মায়ের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে।নানু বাড়ির পাশেই তাদের বাড়ি। ক্লাস ফোরে পড়ে সে। সারাদিন পাড়া বেড়ানো দুরন্ত স্বভাবের  ছেলে হলে কী হবে। পড়াশোনায় তার মেধা অতুলনীয়। প্রতি ক্লাসের প্রথম স্থানটা তার জন্যই যেনো র্নিধারিত। অথচ, ক্লাসে একটা দিনও সে হোম ওর্য়াক করে আনে না। প্রথম প্রথম সে হোমওর্য়াক না করে স্কুলে আসার জন্য বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো।এখন আর তাকে হোমওর্য়াক না কারা জন্য শাস্তি পেতে হয় না।
স্যার ম্যাডাম সকলেই এখন জেনে গেছে, ক্লাসে সে পড়া পারুক আর না পারুক পরিক্ষার খাতায় সে ৯৫ নম্বরের কম পায়না কোন বিষয়ে। তার এই অবাক করা রেজাল্ট নিয়ে অনেকের মনে নানান সংশয় দেখা দিয়েছিলো এক সময়। একবার তো এক স্যার কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে তার মায়ের কাছে এসে জানতে চাইলে, তার মা প্রতিউত্তরে বললেন,
অপুতো পড়তেই বসেনা সারাদিনে। ওরে আমি জোর করে ও বই নিয়ে বসাতে পারিনা। সারাটা দিন ও পাড়ার বন্ধুদের সাথে বনে বাদাড়ে টইটই করে ঘুরে বেড়ায়।পরিক্ষা আসার ১২/১৩দিন আগে সে সাঁঝের পর বই খুলে বসে। কার গাছে ফল পাকলো, কোন গাছে পাখির বাসা। কোন বাসায় কয়টা ডিম আর কোন ডিম ফুটে ছানা বেড় হলো এসব নিয়ে মাতামাতি করে করেই অপুর বেলা কেটে যায়। এছাড়াও আরো আছে বড় দিঘীর উপর হেলে পড়া বকুল গাছের উপরের ডালে উঠে সেখান থেকে জলে ঝাঁপ দেয়া। আর র্বষা আসলে তো কোন কথাই নেই। বিলের ধারে শাপলা শালুক আর ছোট ছোট পোনা মাছ ধরে কেটে যায় তার বেলা। কখনো কখনো না বলে অন্যের নৌকা বেয়ে বিলের মাঝে গিয়ে গিয়ে বসে বসে কানা বগিদের মাছ ধরা দেখে। আর অপু নামের এই অদ্ভুত ছেলেটাকে ভীষণ পছন্দ করে সৌখিন। অপুর জন্যই নানু বাড়ি আসতে তার মন আকুপাকু করে সারামাস।
প্রতিবারই সে ঢাকায় ফিরে গেলে সাথে করে নিয়ে যায় এতো এতো গল্প আর অভিজ্ঞতার ঝুলি।
গতবার ঢাকায় ফেরার সময় একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বয়াম সৌখিনের হাতে দিলো অপু। ছোট ছোট ছিদ্র করে তার ভেতর অনেকগুলো জোনাক পোকা সে জমিয়েছিলো সৌখিনের জন্য। সৌখিনের যে জোনাক পোকা খুব পছন্দ এটা ও এড়ায়নি অপুর দৃষ্টি থেকে। বয়ামটা সৌখিনের হাতে দিয়ে সে বললো, জোনাক পোকা দেখলে তুমি খুব খুশি হও কিন্তু তোমাদের ঢাকাতে নাকী জোনাক পোকা নেই।
তাই আমি ওদের ধরে ধরে তোমার জন্য জমিয়েছি। তুমি বাড়ি পৌঁছানোর পরপরই ওদের কে ছেড়ে দিও। দেখবে তখন ওরা গ্রামের মতো করে তোমাদের ঢাকার বাড়িতে ও ছোট ছোট আলোতে ভরিয়ে তুলছে। ঢাকার বাসা বাড়ি সর্ম্পকে অপুর কোন ধারনা নেই। সে কখনো ঢাকায় যায়নি। ঢাকার নিয়ন বাতির আলোতে জোনাকি পোকার আলো যে ম্লাণ সে কথা জানা নেই অপুর।ইট কাঠের তৈরি খাঁচায় মানুষগুলো বেঁচে থাকে দিনের পর দিন ছন্দহীন হয়ে । পিচঢাল পথের সাথে রৌদ্রের মিতালী হয়। এখানে সবুজের নিবির র্স্পশ হাতে গোনা কয়েক জায়গাতে মেলে। পাখির কল কাকলিতে সকালের ঘুম ভাঙেনা এখানে। তবে খুব ভোরে হকারের হাঁক ডাক,আর রিকশা গাড়ির টুটাং শব্দে শহরবাসী জেগে উঠে রোজ। এ সবের সবটাই অজানা অপুর। তবে সৌখিন যখন তাদের বাড়ি ফিরে। পথের ধুলো উড়িয়ে যেতে যেতে এক সময় লাল গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে যায় । তখন সে মনে মনে ভাবে পড়ালেখা করে একদিন সে ও ঢাকা শহরের বাসিন্দা হবে।সৌখিনদের মতো লাল একটা গাড়ি নিয়ে সে বাড়ি আসবে ছুটির দিনগুলোতে।
সেবার বাড়ি এসে রাতের বেলাতেই সৌখিন বয়াম খুলে তাদের ছোট্ট বারান্দায় জোনাকদের ছেড়ে দেয়। বারান্দার টবে ছোট ছোট গাছগুলোতে উড়ে উড়ে বসে নিভু নিভু আলো জ্বেলে যায় বন্দী থাকা ক্লান্ত জোনাকিরা।
ছেড়ে দেবার সময় সৌখিন কল্পনা আঁকে মনের কোনে, জোনাকীরা রোজ রাতে আলোর পিদিম জ্বালাবে তার বারান্দায়।
কিন্তু ২/৩ দিন যেতে না যেতেই কান্না কান্না কন্ঠে সে মায়ের কাছে অভিযোগ তুলে। অপু ভাইয়ার দেয়া একটা জোনাক পোকাও আর নেই বারান্দার কিংবা আশেপাশের কোথাও। আমি একটা ঘন্টা ধরে অন্ধকার বারান্দায় বসে ছিলাম একটা জোনাকপোকারও দেখা পেলমনা। ওরা সব কোথায় গেলো মামনি?
ছেলেকে কি শান্তনা দেবেন ভেবে পাচ্ছেনা সৌখিনের মা শায়লা।শেষেমেষ সে ছেলের মন ভালো করার জন্য কায়দা করে বললো, ওরা তো গ্রামের বাড়িতে ওদের মায়ের কাছে ফিরে গেছে বাবা। ওরা এ বাসায় বোড়াতে এসেছিলো। বেড়ানো শেষ তাই নিজের বাড়ি ফিরে গেছে । এইযে আমরা যেমন নানু বাড়িতে বেড়াতে গেলে নিজের বাড়ি ফিরে আসি।
কিন্তু মামনি, অপু ভাই যে বলছিলো ওরা সব সময় আমার কাছে থাকবে।
ওদের বাবা মা তো গ্রামে ছিলো তাই ওরা মায়ের কাছে ফিরে গেছে বাবা। মা কে ছাড়া কোথাও বেশিদিন থাকতে কি তোমার ভালোলাগবে?
না মামনি.. ! তোমাকে খুব মিস করবো আমি। আমার খুব মন খারাপ হবে কান্না পাবে।
ঠিক সেই জন্যই ওরা ফিরে গেছে।
এবার সৌখিনের মুখে হাসি ফুটলো, মায়ের গলা দু হাতে জড়িয়ে ধরে সে বললো, এবার নানু বাড়ি গেলে অপু ভাইয়াকে বলবে সে যেন বাবা মা সহ জোনাক পোকাগুলো দেয়।এরপর ওদের কে যেন বাবা মায়ের জন্য গ্রামে ফিরে যেতে না হয়।আমি চাই ওরা আমার বারান্দায় উড়ে বেড়াক রাতভর।
ছেলেকে একবার বলতে গিয়ে থেমে গেলো শায়লা। তারপর মনে মনে সে বললো, বাবা তোমার এই শহর এই জোনাকীর জন্য না। এখানের দূষিত বাতাস, গাছপালাহীন আবাস, সারি সারি উঁচু ভবণ, রাস্তার বুক জুড়ে রাতদিনে সমানে চলা গাড়ির অহেতুকশব্দদূষণ প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযকে বিলীন করে দিচ্ছে। এখানে মানুষ টিকে আছে জীবন ও জিবীকার তাগিদে। এ পরিবেশ ওদের জন্য না
গাড়িটা ছুটে চলছে আপন গন্তব্যে।মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে এতোসব ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পরে সৌখিন। শায়লা ছেলের মাথাটা বুকের সাথে লাগিয়ে রাখে যাতে সে একটু রিলাক্স ভাবে ঘুমাতে পারে।
ঘুমের দেশে তলিয়ে যাওয়া সৌখিনের ¯^প্নের ভেতর অপু এসে তাকে ডাকছিলো।
এই সৌখিন পুকুর পাড়ে এসো আমার সাথে । আমরা নৌকা চালাবো।
সৌখিন জবাব দেয, কিন্তু ভাইয়া আমি তো নৌকায় উঠিনি আগে। সাঁতার ও জানিনা।
আরে বোকা আমি আছি না। ভয় কি তোমার। আমি নৌকা চালাবো আর তুমি গলুইয়ের আরেক পাশে বসে থাকবে চুপটি করে লক্ষী ছেলের মতো। একবার উঠলে পরে বুঝবে নৌকায় চড়তে কত্ত মজা।
আর কোন কথা না বলে অপুর হাত ধরে সৌখিন হাঁটতে লাগলো পুকুর ঘাটের দিকে।
নৌকাটি পুকুরের পাড় ঘেষে দাঁড়ানো। নৌকার একটি মাথা রশি দিয়ে পুকুরের পাড়ে থাকা সেগুন গাছের সাথে বাঁধা। অপুর হাত ধরে যেই সৌখিন নৌকায় একটি পা দিতে যাবে
ওমনি কোথা থেকে তার মামনি এসে তার হাত ধরে হেঁচকা টান দিয়ে তাকে সরিয়ে এনে বললো, এই কই যাও তুমি? তুমি তো সাঁতাড় জানোনা। নৌকা থেকে পরে গেলে তো বিপদ হবে।
এবার কান্না জুড়ে দিলো সৌখিন। না আমি নৌকায় উঠবো। মা মনি আমি নৌকায় উঠবো।
ঘুমের ঘোরে কেঁদে উঠে সৌখিন মা তাকে ঝাঁকি দিয়ে জাগিয়ে তুলে,কি হয়েছে বাবা কাঁদছো কেনো?
ঘুম ভেঙে গেলো সৌখিনের। ঘুম ভাঙা চোখ রগরাতে রগরাতে সে শুধু বললো, অপু ভাইয়া ডাকছিলো।
তারপর মায়ের বুকে মাথা রেখে চুপচাপ বাইরের দিকে চেয়ে রইলো। সন্ধ্যা নামার প্রস্তুতি চলছে পশ্চিমের আকাশে। আর সেই রাঙা আলোতে ডানা মেলে উড়ে উড়ে নীড়ে ফিরছে ক্লান্ত পাখি যুগল।
শীতের আমেজ এখনো পরতে শুরু করেনি। ভোর রাতে দিকে টুপটাপ কিছু কুয়াশা নিশ্চুপ ভিজিয়ে দিযে যায় ঘরের ছাউনি , উঠোন, ঘাসের বুক, সবুজ পাতা শরীর। পৌষ মাসের ২/৩ দিন হতে চললো অথচ শীতের কোন দেখাই নেই এবার।ভোরের দিকে কুয়াশার পাতলা শাড়ি চারপাশের প্রকৃতিকে সামান্য সময়ের জন্য আড়াল করে রাখে।
ভোর হবার কিছু সময়পরই আবার সে শাড়ি ভেদ করে মিষ্টি রোদ খেলতে থাকে উঠোন-বাড়ি, ঘর-দোর জুড়ে। সৌখিনদের লাল গাড়িটা যখন নানু বাড়ির সামনে এসে থামলো তখন মসজিদের মাইকে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে। গাড়ির শব্দ পেয়ে বাড়ি থেকে ছুটে এসেছেন নানুমনি। হাত বাড়িয়ে তাকে কোলে তুলে নিলেন।
নানুমনি সৌখিনের অসম্ভব প্রিয় একজন মানুষ । তার কারণ ও আছে অবশ্য। নানু বাড়িতে থাকাকালীন পুরো সময়টা নানু তাকে নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দেন। আর খাবার খাইয়ে দিতে দিতে তিনি ভূত প্রেতের নানান গল্প বলেন। আর ভূতের গল্প শুনতে দারুণ ভালো বাসে সে।
বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়াতেই নানুর কোল থেকে নেমে সে উঠানের উত্তর কোনে দৌঁড়ে ছুটে গেলো। ওখানে আছে সৌখিনের আদরের একমাত্র লাল্টু। এই লাল্টু হলো ওর ছাগলের নাম। গত বছর মায়ের সাথে বিকেল বেলা বেড়াতে বের হয়েছিলো সে মাঠে। সেখানের লাল্টুকে ঘাস খাওয়াচ্ছিলো নোয়াব আলীর মেয়ে জরিনা। সেই লাল্টুকে সৌখিনের চাই চাই। মা বাধ্য হয়ে তাকে পরের দিনই লাল্টুকে কিনে দেন। যদিও প্রথমে নোয়াব আলীর আপত্তি ছিলো এতো ছোট বাচ্চা সে বিক্রি করবে না। বড় করে বিক্রি করলে সে ভালো দাম পাবে। কিন্তু ছেলের আবদারের কাছে সব পরাজিত হলো। বাড়তি দামে ছাগলটি কিনে দেয় শায়লা। নানুর যতেœ সেই ছোট্ট লাল্টু আজ টগবগে তরুন লাল্টু ।ওর হেলে পড়া কান, মায়া ভরা চোখ দুটি খুব টানে সৌখিন কে। তাই সে দৌঁড়ে কাছে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরলো লাল্টুর আর বললো, কেমন আছো লাল্টু?
ছেলের এমন পাগলামী দেখে ঘরের দোরের সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগলো বাকিরা সবাই।
সন্ধ্যা নামতে না নামতে চারপাশের নিরবতা মনে করিয়ে দেয় রাতে দ্বিপ্রহর চলছে ।অথচ ঘড়ির কাটা বলছে সবে বাজে ৮টা। চারপাশে কেমন এক অদ্ভুত নিরবতা জেঁকে বসেছে। জরোসরো মন খারাপ করা একটা সন্ধ্যা। সকল বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। পড়াশোনা থেকে লম্বা ছুটি। এ সময়টাতে এলাকাতে হৈ হুল্লোর লেগে থাকতো রাত ১০/১১ র্পযন্ত। অথচ আজ যেন অচেনা লাগছে শায়লার চিরচেনা পরিবেশটাকে।সন্ধ্যার নাস্তা র্পব শেষ কওে অনেকক্ষণ ধরে খোলা জানালার সামনে বসে আছে শায়লা। থেমে থেমে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। জানালা পেরিয়ে শায়লার গা ছুঁয়ে যাচ্ছে বারেবারে। আকাশে মস্ত এক চাঁদ ঝুলে আছে।অদূওে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বেশ কিছু তারাও। জোছনার আলেঅ উল্লাস করছে উঠানের এপাশে ওপাশে। থেকে থেকে কুকুর আর শেঁয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। বাড়ির থেকে একটু দূরের পিচঢালা পথের বুক মাড়িয়ে দু একটা ভারী যান বাহন চলে যায় শব্দ করে। এছাড়া কোন শব্দ নেই এখানে। এমন নিরবতার জন্য মুখিয়ে থাকে শায়লা তার রোজকার শহুরে জীবনে ।অথচ, আজ যেনো সব পানসে লাগছে। বুকের ভেতরটা হু হু করছে যেন তারই অজান্তে। মনেহচ্ছে প্রতিবেশী বান্ধবীগুলো থাকলে কত আনন্দে, গাল-গল্পে প্রতিটা মর্হূত কেটে যেতো।সৌখিন নানুর পাশে শুয়ে শুয়ে ভূতের গল্প শুনছিলো। শায়লার পাশেই তার হাজব্যান্ড আধশোয়া হয়ে ফোনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। বেশ কিছু সময় এভাবে কেটে যাওয়ার পর শায়লা ডাকলো, সৌখিনের বাবা চলো একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসি। দেখ, কি সুন্দর জোছনা আজ।আর দেরি না কওে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো শায়লা।
মায়ের কাছে এসে বললো মা, আমরা একটু বাইরে যাচ্ছি। হেঁটে আসি মনটা ভালো লাগছেনা অস্থির অস্থির লাগছে।
মা শোয়া থেকে উঠে বসলেন । বললেন, বাইরে যাস না আজ আর ।
শায়লা জিজ্ঞাসুক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।
মা কাছে এসে বললো শোন একটা কথা আছে। সৌখিন ততক্ষনে বাবার কাছে গিয়ে হাজির সে ও বাইরে বেড়াতে যাবে ।
একটা অস্ফুষ্ট র্আতনাদ করে বিছানার উপর ধপ করে বসে পরলো শায়লা। কাঁপাকাঁপা গলায় বললো, কি বলছো তুমি মা!!
আমার তো কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছেনা। আমাকে আগে জানাও নি কেনো?
মা শায়লার মাথায় হাত রেখে বললেন, সৌখিনের পরিক্ষা চলছিলো তাই তোকে জানাইনি মা।
চোখ দিয়ে টপটপ করেজল পরতে লাগলো শায়লার । বুক ফেঁটে হাউমাউ কান্না আসতে চাইছে তার। নিজের কানকে তার অবিশ্বাস্য ঠেকছে এখন। কি করে এসব হলো? কেনইবা এসব হলো?
মাবূদ! সৌখিনকে কি করে বোঝাবো। সকাল হতে না হতেই সে ছুটবে অপুর কাছে। গতবার যাবার আগে অপু তাকে ফুটবল নিয়ে আসতে বলেছে। অনেক যতœ করে সে অপুর জন্য কেনা বলটাকে বাড়ি র্পযন্ত বয়ে এনেছে। আর কাল সকালে সে যদি শুনে , অপু আর নেই। সে পুকুরের জলে ডুবে মারা গেছে। সে কিছুতেই মানতে পারবেনা। তাকে সামলানো মুশকিল না প্রায় অসম্ভব হয়ে পরবে।
আর এক মর্হূত দেরি না করে মায়ের হাতটা ধরে শায়লা ছুটলো অপুদের বাড়ি।
অপুদের বাড়ি গিয়ে অপুর মাকে নিজের শোবার ঘরে পাওয়া গেলো। ছেলের শোকে শয্যাশায়ী তিনি। শায়লাকে দেখে জড়িয়ে ধরে হাওমাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি।তাকে দেবার মতো নিজের ভেতর কোন শ্বান্তনাবাক্য খুঁজে পেলো না শায়লা। সে নিজেও কাঁদতে লাগলো অঝোরে।
এক সময় কান্না থেমে যায়। বিড়বিড় করে শায়লাকে সে বলতে থাকে কিভাবে সে তার বুকের মানিককে হারিয়েছে।
ও বুবু পরিক্ষা চলছিলো ওর। পরিক্ষা দিয়ে বাড়ি এসে বই আর র্বোড পড়ার টেবিলে রেখে আমারে বললো,মা আমি গোসল করে আসি। তুমি ততক্ষনে ভাত বেড়ে রেডি রাখো।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, নবারের বেটা আগে গোসল সেরে আসেন তারপর ভাত বাড়বো নে। আপনের তো গোসল করতে কমছে কম ১ ঘন্টা সময় লাগে।
ও আমারে বললো, নারে মা আজকে দারুণ ক্ষুধা লাগছে। আমি পুকুরে যাবো আর টুপ করে দুইটা ডুব দিয়ে চলে আসবো। আমি আবারো বললাম, তোমার টুপ করে ডুব আমার জানা আছে আধা ঘন্টার আগে আর ফিরবেনা।
ও বললো তুমি দেখো আমি যাবো আর আসবো।
১ঘন্টা হয়ে যায় ওর তো পাত্তা নাই। আমি ডাকতে গেলাম উঠানের শেষ মাথায় গিয়ে জোরে ওর নাম ধরে ডাকতে লাগলাম। আয় আজকে বাড়ি। আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন। আধাঘন্টা ধরে ভাত বেড়ে বসে বসে পাহারা দিতেছি তুমি তো তাল পাও না।আমি এভাবে বকেই যাচ্ছি ওরে। হঠাৎ দেখি দক্ষিণ পাড়ার আব্বাস আমাদের বাড়ির দিকে দৌঁড়ে আসছে। বাড়ির সামনে আমাকে দেখে সে কান্না করে বললো, ভাবী অপু তো পুকুরে ভাসতেছে। কানে আমি কি শুনছি কিছুই মনেনাই । আমি দিলাম এক দৌঁড়।কারা যেনো কিনারে টেনে তুলছে আমার বাজানরে। ও বুবু আমার হাত কেউ একজন শক্ত করে ধরে বললো, ওরে তুমি ছুঁইয়ো না। পানিতে পরা ছেলেরে মা ছুঁইলে আর বাঁচানো যায়না।কে শুনে কার কথা।আমি সজোড়ে হাত ঝাড়া দিয়ে আমার বাবার কাছে যাই।তার মাথা কোলে নিয়ে ডাকতে থাকি সমানে। নাহ্ সব শেষ কোন সারাশব্দ নাই।
আবারো কান্নায় ভেঙে পরলেন তিনি। কিছু সময় পর আবারো বলতে লাগলেন,এরপর হাসপাতালেও নিয়া যাই ডা: বলে আরো আগেই সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
পুকুরে কার যেনো একটা নৌকা ছিলো। কারা যেনো ওরে নৌকা বাইতে দেখছে।
অপু সাঁতার জানা একটা ছেলে ও কি করে ডুবে মরতে পারে আমার বুঝে আসে না। ভাবী তোমাদের সাথে কারোর কোন শত্রæতা নেই তো।
না তো বুবু তোমার ভাইকে তো তুমি চিনোই। তার মতো সাদাসিদা মানুষ এই গ্রামে আর একটাও নাই।
কার নৌকা ছিলো তুমি জানো কি কিছু। আর কে কেই বা ওরে নৌকা চালাতে দেখেছে?
আমি অতো কিছু বলতে পারবো না। তুমি তোমার ভাইজানের সাথে কথা বলো সে সবকিছু জানে।
আচ্ছা ঠিক আছে আমি পরে একসময় ভাইজানের সাথে কথা বলবো। আমি আছি এবার বেশ কিছু দিন। তবে ভাবী তুমি ভাইজানকে বলিও, আমার কাছে এ মৃত্যুটা স্বাভাবিক লাগছেনা মোটেই।আমার কাছে রহস্যই লাগছে পুরো ব্যপারটা।
শায়লা বাড়ি ফিরে এসে সারারাত ঘুমাতে পারেনি।স্বামীর সবটা শেয়ার করার পরেও বুকটা পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে তার।এর সত্যিটা না জানা র্পযন্ত শান্তি পাবেনা সে কিছুতেই।
সকালের রোদ শৈশব ছেড়ে কৈশরের পথে এগুতে লাগলো। উঠানের পশ্চিম পাশে একটা মোড়ক ডেকে যাচ্ছে কুকুরুক… করে। আর অনেক বেলা করেই ঘুম ভাঙলো সৌখিনের। চোখ মেলতেই সে দেখলো মা তার শিয়রের পাশে বসে আছে। ছেলের ঘুম জড়ানো মুখটি দু হাতে ধরে কপালে চুমো দিতে দিতে বললো, কেমন ঘুম হলো বাবা?
খুব ভালো। নানুমনির কাছে গল্প শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি টের পাইনি।
হুমম.. এবার উঠো । অনেক বেলা হয়ে গেছে।
মামনি অপু ভাইয়া নিশ্চই আমাকে ডাকতে এসেছিলো আর আমি ঘুমে ছিলাম তাই সে না ডেকে চলে গেছে।
অপুর কথা উঠতেই দপ করে নিভে যাওয়া কেরোসিনের কুপির মতো অন্ধকারে ছেয়ে গেলো তার র্ফসা মুখ।
ক্ষনিক সময়ে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বললো, না বাবা অপু তোমাকে ডাকতে আসেনি। তোমার মতো সে ও পরিক্ষা শেষ করে নানু বাড়ি বেড়াতে গেছে।
তাহলে আজই তাকে খবর পাঠাও মামনি। আমি এসেছি এই খবর পেলে সে আর এক মর্হূত সেখানে থাকবেনা ছুটে চলে আসবে তুমি দেখো।
ছেলের কথা শুনে বুকটা মোচড় দিয়ে চোখের কোনে জলচিকচিক করে উঠলো।
চোখের জল লুকাতে সে বসা থেকে রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে বললো তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে রান্না ঘরে এসো। সেখানে তোমার নাস্তা রাখা আছে।
তুমি যাও আমি ৫ মিনিটের ভেতর আসছি মামনি।
হাত মুখ মুছে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই নানু বেতের মোড়াটা এগিয়ে দিয়ে বললো, নানুভাই বসো। দেখো আমি তোমার জন্য ভাঁপা পিঠা বানাচ্ছি।রান্না ঘরের দাওয়ায় বসে একটা একটু করে পিঠার টুকরো মুখে পুড়ছিলো সৌখিন। কিছু সময় পর বাবাকে এদিকে আসতে দেখে দৌড়ে ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, আমি চলে যাচ্ছি বাবা। তুমি কিন্তু কোন রকম দুষ্টুমি করবেনা। মামনির কথা শুনবে।
তুমি চলে যাচ্ছো বাবা। আর আমি ভেবে রেখেছিলাম আজ তোমাকে নিয়ে পুকুরে মাছ ধরবো দিয়ে। অপুর কাছে অনেকগুলো বড়শী আছে বাবা। সে মাছ ধরায় খুব উস্তাদ তুমি আজকের দিনটা থেকে যাও না বাবা।
না বাবা, অফিসে আমাকে একটা জরুরী মিটিং করতে হবে। সবাই আমার জন্য অপেক্ষায় থাকবে।
আচ্ছা তবে যাও। সাবধানে যাবে। মন খারাপ করা সুরে কথাটুকু বললো সে।
যেতে যেতে শায়লাকে বারবার করে তিনি বলে গেলোসৌখিন যেনো পুকুরের কাছে না যায়। তাকে সারাদিন চোখে চোখে রেখো।
আচ্ছা আমি সব সময় চোখে চোখে রাখবো তুমি চিন্তা করো না।
সৌখিন পিঠা খাওয়া শেষ করে মায়ের কাছে এসে বললো, মা লাল্টুর জন্য কেনা ঝুনঝনিটা দাও তো আমি ওর গলায় পরিয়ে দিই। আর অপুর ফুটবলটাও দিও। আমি ওদের বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসবো আর অপুর আম্মুকে বলে আসবো অপুকে যেনো খবর দিয়ে আনায়।
আচ্ছা বিকেলে গিয়ে বলে এসো বাবা।
না বিকেলে গেলে আমি এখন এই সারাটা বেলা খেলবো কার সাথে?
আমি তোমার জন্য খেলার বন্ধু খুঁজে এনে দিই। না , আমার চাইনা কোন খেলার বন্ধু। আমি অপু ভাইয়ার সাথেই খেলবো। তুমি চলো এখনই চলো ওদের বাড়িতে যাবো।আজই আমি অপু ভাইয়াকে খবর দিয়ে আনাবো। তাকে ছাড়া এ বাড়িতে আমার এক মর্হুত আর ভালো লাগছেনা।
শায়লা কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। তার বুকের ভেতর তখন অসংখ্য লাল পিঁপড়া কুট কুট করে কামড়ে যাচ্ছে। আর সে সেই দংশন মুখ বুজে সইতে গিয়ে চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠছে।
মায়ের হাত ধরে একপ্রকার টানতে টানতে অপুদের বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো সৌখিন।
ঘরের খোলা বারান্দায় মনমরা বসেথাকা অপুর মায়ের কোলে ঝাপটে পরলো সে। তারপর বললো, তুমি এখানে আর অপু ভাইকে একা একা তার নানু বাড়ি বেড়াতে পাঠিয়ে দিয়েছো।
ওর কথা শুনে তিনি একবার শায়লার দিতে তাকালেন। শায়লা তখন ওড়নায় ভেজা চোখ মুছছে।
কান্না চেপে রাখতে পারলেন না তিনি। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন সৌখিনকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে।
সৌখিক অবাক হয়ে বোকা বোক চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলে অপুর মায়ের দিকে। বেশ কিছু সময় পর সে বললো, কাঁদছো কেনো মামি মা! ওহ্ বুঝছি,অপু ভাইয়ার জন্য তো!
দেখছো তাকে ছাড়া থাকতে তোমারও কষ্ট হচ্ছে । আজই তাকে ফিরে আসার জন্য খবর দাও প্লিজ। আমি এেেসছি এ খবর পেলে সে দৌঁড়ে ছুটে আসবে।
সৌখিনের কথায় সেখানে উপস্থিত সকলের চোখে জল চলে আসলো।
মায়ের হাত থেকে বলটা নিয়ে সে অপুর মায়ের হাতে দিতে দিতে বললো, আমাতে গতবার সে ফুটবল নিয়ে আসতে বলছে। আমি ফুটবল নিয়ে এসেছি এ খবরটা ও দিও। আমি বিকালে আসবো জানতে তুমি সত্যি সত্যি খবর পাঠিয়েছো কি না।
যেমন ঝড়ের বেগে সে এসেছিলো তেমন ঝড়ের বেগে সে মায়ের হাত ধরে বেড়িয়ে গেলো।
৪/৫ দিন কেটে গেলো। অপুর কথা জানতে চেয়ে চেয়ে ক্লান্ত সৌখিন আর কারোর কাছে জানতে চায়না অপু কবে আসবে?
নিজের ভেতর সে হয়তো নিজের মতো করে উত্তর খুঁজে নিয়েছে। অপুর শুন্যতা তাকে স্থির করে দিয়েছে। ছেলের জন্য চিন্তিত শায়লা। ছেলেকে সময় দেয়ার মতো কাউকে হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগলো শায়লা। অবশেষে ওদের বাড়ি থেকে ৪/৫ বাড়ি পরে খোঁজ পাওয়া গেলো রিতার। তাকে এনে দেয়া হলো সৌখিনের সাথে খেলতে। মেয়েটার বয়স বারো কি তেরো হবে। শ্যামরঙা মায়াবী চেহারার মেয়ে সে। গরীবের ঘরে জন্ম বলে এইটুকু বয়সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে সে মানুষের বাড়িতে কাজ করে।কখনো বা একমুঠো ভাত কখনোবা ১০টি টাকা তার সারাদিনের শ্রমের মুল্য পায়।
ঘরে তার আরো ৬টি বোন আছে। একটি ভাইয়ের মুখ দেখার আশায় আশায় তাদের ৭টি বোনের জন্ম হয়েছে।মেয়েটা হাসি খুশি চঞ্চলা ¯^ভাবের। গল্প করতে জানে খুব। অথচ সৌখিন চুপসে যাচ্ছে দিনকে দিন।লাল্টুকে নিয়ে এখন তার কোন ব্যস্ততা নেই। কাঁঠাল পাতা মুখে তুলে খাইয়ে দেবার তাড়া নেই। চুপচাপ বসে থাকে এখানে সেখানে।তার এখন কোন ছুটাছুটি নাই।রান্না বাটি খেলতে খেলতে অনেক গল্প করে রিতা। আর সে চুপচাপ বসে বসে শোনে।
শায়লা থেমে নেই। সে অপুর মৃত্যু নিয়ে অনেক জনের সাথে কথা বলেছে। যারা যারা অপুকে পুকুরের জলে নৌকা চালাতে দেখেছে, ভেসে থাকতে দেখেছে তাদের সবার সাথে কথা বলা শেষ তার। অপুর পরিবারকে সে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছেনা যে অপু জলে ডুবে মারা যায়নি তাকে জলে ডুবিয়ে মারা হয়েছিলো। এই মৃত্যুর পেছনে কারো হাত আছে। অপুর বামপাশের গালে পাঁচ আঙুলের হাতের ছাপ নীলচে হয়ে ছিলো। তাই গ্রামের সবাই বলাবলি করছে ভূতে থাপ্পর দিয়ে অপুকে জলে ফেলে চুবিয়ে মেরেছে। আতংকে এখন আর কেউ এই পুকুরের ধার কাছে ঘেষেনা। অথচ সরকারি এই পুকুরটা এই এলাকার মানুষের গোসল ও কাপড় ধোয়ার জন্য সব থেকে বেশি পছন্দের ছিলো। বাঁধানো ঘাট ¯^চ্ছ টলটলে জল সবাইকে টানতো। কচুরিপানায় পুকুরের র্অধেকটা ঢাকা গরম কালে এ পুকুরের জল বেশ শীতল হয় তবে শীতের কালে আরো বেশি ঠান্ডা হয় বলে শীতের সময়টাতে এখানে গোসল করতে আসা লোকের সংখ্যা কম। শায়লা অপুর বাবাকে থানায় একটা মামলা করার জন্য অনুরোধ করে। তিনি শায়লাকে বলে, তোর মাথা খারাপ হলো বোন আমার ছেলেরে কে মারতে আসবো বল! এই গ্রামে তো আমার কোন শত্রæ নাই। তাছাড়া প্রতি বছরই গ্রামে কোননা কোন বাচ্চা জলে ডুবে মারা যায়। তুই এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল বোন। ওর হায়াত নাই ,এইভাবে আল্লাহর কলমে ওর মৃত্যু লেখা ছিলো বলেই সে মারা গেছে।
অপুর বাবার কথা সে কিছুতেই মানতে পারলো না। আগের পরিকল্পনা বাতিল করে এখন তাকে নতুন করে ভাবতে বসেছে সে। যেহেতু অপুর পরিবার থেকে সে কোন ভাবে সাহায্য পাবেনা সেহেতেু নতুন পথ বের করে সেই অনুযায়ি এগিয়ে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে কে তার হত্যাকারী।
সময় করে এক সন্ধ্যায় আব্বাসকে সে ডেকে আনালো। তারপর মুখোমুখি হলো সে আব্বাসের।
খুব ভালো করে সে আব্বাসকে দেখলো বেশ কিছু সময়।আব্বাস তাকাতে পারছেনা শায়লার চোখের দিকে। মাথা নিচু করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে বারবার। আব্বাসের কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম নজর এড়ায়নি শায়লার।
নিরবতা ভেঙে শায়লা বললো, ঘামছো কেনো?
কই নাতো বলে , বাম হাতের কব্জি দিয়ে কপালের ঘাম মুছলো সে।
শায়লা এবার তার কাছে জানতে চাইলো, আব্বাস তুমি এই গ্রামে এসেছো কত বছর হলো?
আমি তো বুজান ঐ বাড়িতে আসছি ম্যালা বছর আগে । ১০/১২ বছর তো হইবোই।
তখন তোমার বয়স কত ছিলো?
কত হইবো আর ২২/২৩ এমুন হইবার পারে।
সেই যে গ্রাম ছেড়েছিলে আর ফিরে যাওনি কেনো?
কার কাছে যাইতাম বুজান। একটা মা আছিলো এ গাওত আহনের ২ বছর পর হেতে ও মইরা গেলো। দুইন্নাইতে আমার আর কোন ¯^জন নাই।
মায়ের মারা যাবার খবর শুনে কেন যাওনি তাকে শেষ দেখা দেখতে।
মালিকে ছুটি দেয়নাই বুজান
মিথ্যা কথা বলছো তুমি। তোমার মালিক আমাকে বলেছে, সে তোমাকে যেতে বলেছিলো। তুমি বলেছো, বাড়িতে যেতে যেতে তোমার মায়ের মাটি হয়ে যাবে মায়ের মুখ দেখতে পাবেনা। গিয়ে লাভ কি।
হ বুজান..
তাহলে মিথ্যা বললে কেন?
মনে আছিলোনা ম্যালা দিনের পুরান কথা তো।
আচ্ছা , ভাই বোন কে আছে তোমার?
আমার দুইন্নাইত কেই নাই ।
আবারো মিথ্যা বলছো। তোমার বড় আরো দুটি ভাই একটা বোন আছে।
হ আছে। তয় তাগোরে আমি আমার ¯^জন ভাবি না।
শায়লার বুঝতে বাকি রইলো না। অশিক্ষিত হলে কি হবে এ লোক বেশ ধুরন্দর।
অপু যে নৌকাটা চালাচ্ছিলো সেটা তো তোমার মালিকে নৌকা তাই না?
হ।
তুমি ঐ নৌকাতে করে তাদের গরুর জন্য কচুরি কাটো?
হ বুজান।
কখন কচুরি কাটো তুমি?
সকালের দিকে ।
অপুকে কি তুমি নৌকা চালাতে দেখেছো আগে কখনো?
হ বুবু ও মাঝে মধ্যে ঐ নৌকা চালাই তো না করলে ও হুনতো না ত্যাড়ামি কইরা চালাইতেই থাকতো।
যেদিন সে মারা যায় সেদিন তুমি কি তাকে দুপুর বেলা নৌকা চালাতে দেখেছো?
না দেখি নাই।
কই ছিলে তুমি ও দিন দুপুরে।
আমি বাইত্তে ছিলাম।
অথচ, আমি জানি যে তুমি অপু গোসল করতে আসার একটু পরেই গোসল করতে এই পুকুরে এসেছিলে।
না আমি আহি নাই। আপনে কি কইবার চাইতাছেন খুইল্লা কন তো? আপনে কি অপুর মরন নিয়া আমারে সন্দেহ করতাছেন নি।
না। আমি কেন তোমাকে সন্দেহ করবো। সন্দেহ করা তো পুলিশের কাজ। তবে আমি যা যা জানি শুনলে তুমি চমকে যাবে।
বুজবার পারলাম না আপনের কথার মানে।
তাহলে শোন .. এ গ্রামে তুমি পালিয়ে এেেসছিলে একজন খুনের ফেরারি আসামী হয়ে। সেই ১০/১২ বছর আগে তুমি এলাকার মাঠে খেলতে গিয়া ঝগড়া বাঁধিয়ে বাঁশ দিয়ে একজনের মাথা সজোরে আঘাত করো এবং সেইখানেই তার মৃত্যু হয়। আর তুমি হও পলাতক।
আরো শুনবা… আমার ভাতিজা অপু তারে কোন ভূতে থাপ্পর দিয়ে মারে নাই। ভূত বলতে কিছু নাই। তাদের এমন মানুষের মতো হাত পা ও নাই। গ্রামে সহজ সরল মানুষগুলো এসব কুসংসকারকে মুল্য দেয় অনেক বেশি আর তোমাদের মতো অপরাধীগুলো দিব্রি ঘুড়ে বেড়ায়।
আমি যে অপুরে মারছি তার কি প্রমান দেওনের আছে আপনার ?
প্রমাণ কি তোমাকে দেবো বলো!! প্রমাণ যাবে থানায়।
এবার যেনো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো সে। রাগে গড়গড় করতে করতে বললো, আপনে ক্যা আল্লার ফেরেশতাও প্রমাণ করতে পারবোনা। একটা কাক পক্ষিও দেহে নাই পুকুরপারে হেদিন কি ঘটছিলো।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সকল কিছু দেখেন এবং শুনেন। এভাবে কথা বলবে না।
কমু না কি করুম আপনে তো আমারে ডর দেহাইতেছেন। শোনেন,, আমি ডরাইন্যা পোলা না। আমি পুকুর পাড়ে নাইতে গিয়া দেহি ঐ অপ্পা হমানে আমাগো নাও চালাইতাছে। আমি ওরে নাও চালাইতে মানা করি বেশ কয়েক বার কিন্তু ত্যড়ামি কইড়া ও আরো মাঝ পুকুরে চইল্যা যায়।
আমার মেজাজ বিগড়া যায়। আমি সাঁতড়াইয়া গিয়া নাওয়ে উঠি আর ওরে ঠাডাইয়া ৩/৪ থাবুর দেই মুখে মাথায় ।
এরপর আমি নাও থিক্কা পানিতে ঝাঁপ দিয়া গোসল কইরা পাড়ে গিয়া কাপড় বদলাইতে গিয়া দেখি নাও খালি অপু নাওয়ে নাই। আমি ভাবলাম পানিত ডুব দিসে।আমি বাড়ি চইল্যা আইলাম। তার আধ ঘন্টা মতো সময় পর হুনি পুকুরে ভাসতাছে অপু। এরপরের গল্প তো বেবাক আপনের জানা শোনা বুজান। সব দোষ ভূতের কিন্তু। খবরদার আপনের পুলাডারে কিন্তু পুকুরে ধারে নাইতে যাইতে দিয়েন না। কওন তো যায়না আবার কোন ভূতে তারে ঠাডাইয়া থাবরা দিয়া পানিতে মাইরা রাইখ্যা দেয়। হু হু হু হু হা হা হা.. করে পিশাচের মতো হেসে উঠলো আব্বাস।
রাগে শরীর কাঁপছিলো, নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে শায়লা। আর মনে হচ্ছিলো কোন মানুষ নয় রূপকথার কোন দানব তার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে এমন পৈশাচিক শব্দ করে।
মনে হচ্ছিল দুই হাতে গলা টিপে ওর গলার স্বর বন্ধ করে দিই।ওর হাসির শব্দ শরীরের শিরা উপশিরায় গিয়ে সাইরেন বাজাতে লাগলো।
হাতে থাকা মোবাইলটা দেখিয়ে সে আব্বাসকে বললো, আর কোন মায়ের সন্তানরে কি আমি তোর হাতে মরতে দিমু। এইখানে তোর মরন ফাঁদ।তোর খেল খতম । তারপর লম্বা পা ফেলে ঘরের দিকে চলে গেলো সে।
বিস্ফোরিত চোখে আব্বাস চেয়ে রইলো শায়লার চলে যাওয়া পথের দিকে। নিজের বোকামীর জনৗ নিজের গালে নিজেই থাপরাতে লাগলো মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলো দু হাতে। রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেলো আব্বাসের।
উন্মাদের মতো সে শায়লাদের বাড়ি আশেপাশে ঘুরতে লাগলো যে করেই হোক মোবাইল টা চুরি করতে হবে।সমস্ত প্রমাণ নাশ করতেই হবে।
কুয়াশা আজ জেঁকে বসেছে প্রকৃতি । একটু দূরের কোন কিছু স্পষ্ট দেখা যায় না। ফজরের আজানের একটু আগে আব্বাস আবারো এসে দাঁড়ালো। টিনের বেড়ার ফোঁকড় দিয়ে উঁকি ঝুঁকি দিতে শুরু করলো। সাথে করে নিয়ে আসা সরু কাচিঁর আল দিয়ে শায়লার মাথার কাছের জানালাটা খুলতে চেষ্ট করছে সে বারবার। অনেকবার চেষ্টার পর সফল হলো । শায়লা রাতে তার বরের সাথে কথা বলে শিথানের কাছে ফোন রেখে এপাশ ওপাশ করে করে এক সময় ঘুমিয়ে পরেছিলো। বাঁশের লিকলিকে কঞ্চি দিয়ে সে ফোনটা নিজের কাছে আনার চেষ্টা করতে লাগলো। ফোন কঞ্চি দিয়ে কিছুটা এগিয়ে আনার পর জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে সে ফোনটা ধরার চেষ্টা করতে করতে এক সময় ফোনের নাগাল পেয়ে যায়। আর ঠিক তখনই শায়লার মা জেগে উঠেন ফজরের নামাজ পড়ারজন্য। খোলা জানালার সামনে কেউ একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভয়ে চিৎকার করে উঠলো।চিৎকার শুনে চমকে গিয়ে আব্বাসের হাত থেকে ফোন পরে গেলো আর সে উঠেপরে দিলো দৌঁড়।
মায়ের চিৎকার শুনে ঘুম থেকে ধরফর করে উঠে বসে শায়লা। নিজের ফোন খুঁজতে থাকে সে উদভ্রান্তের মতো।শেষমেষ খাটের নিচ থেকে ফোন পাওয়া গেলো র্পাট টু র্পাট খুলে পরে আছে ফোনটা।
ডিসপ্লে ফেটে গেছে।ব্যাটারি ঢুকিয়ে ফোনটা চালু করতে বারবার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু বিধিবাম । ফোনটা অন হচ্ছেনা।খুব হতাশ হয়ে মনে মনে বললো এতো বাঁধা কেন আসছে। আজকে সকালে তার থানায় যাবার কথা ছিলো।কিন্তু এখন কি হবে?
ফোন ঠিক করে তারপর কাজ শুরু করতে হবে। অনেক দেরি হয়ে যাবে ততক্ষনে। এই এলাকায় ফোন সারায় এমন ভালো দোকান নেই।যেকেত হবে উপজেলা শহরে। সেটাও নেহায়েত দূর কম না। এভাবে সারাটা দিন শায়লার একপ্রকার বিষন্নতা নিয়েই কেটে গেলো।
বিকেল বেলা উঠানের একপাশে মোড়া নিয়ে উদাসমনে বসে ছিলো শায়লা। একবার ভেবেছিলো অপুর বাবা-মা কে ঘটনার সবটা খুলে বলে আসি। আবার পরক্ষণে সে ভাবলো, তারা কেউ আমার মুখের কথা বিশ্বাস করবেনা। আমাকে যা করতে হবে উপযুক্ত প্রমাণ নিয়ে করতে হবে।
বাড়ির পিছনে আম বাগানে মাদুর বিছিয়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা রান্না বাটি খেলছিলো। ওদেও ভেতওে একজন র্কতা একজন গিন্নী সেজেছে। র্কতা বাজার করে এনে দিলো গিন্নী বাজার কাটাকাটি করে চুলায় রান্না বসাচ্ছে। মুগ্ধ চোখে সে দিকে তাকিয়ে আছে শায়লা। বাচ্চাদের রান্নাবাটি খেলায় যোগ দিলো সৌখিন আর রিতাও। সৌখিনকে মাদুরে বসিয়ে রিতার মিছেমিছে রান্না খেলায় হাত লাগালো। কচুরিপনার চওড়া পাতা সাজানো হলো। সবাই সারি সারি বসলো খাবার খেতে। গিন্নী সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। খাবারের মেনু হচ্ছে নারকেলের ছোট ছোট হলুদসাদা ফুলের ভাত,কচুরি পানাকে টুকরো করে ইটের গুড়ো দিয়ো রান্না করা গোশতের তরকারি,বুনো চমেটোর চচ্চরি, নানান রকমের শাক,পান খাওয়ার চুন গুলিয়ে আর সাথে কলা গাছের সাদা অংশ কুচি করে বানানো পায়েশ। বাকিরা সবাই মিছেমিছে খাওয়ার ভান করছে।যেন খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে ওরা।
আহা.. আমাদেরও এমন একটা শৈশব ছিলো। পুতুরে বিয়ে নিয়ে আমরা কত মাতামাতি করেছি। শৈশবের দিনগুলো চিতা বাঘের মতো দ্রুত দৌঁড়ে সময়ের সবুজ বনে হারিয়ে গেলো। আজ সবই স্মৃতি কেবলই স্মৃতি। সবার মতো সৌখিন ও খেতে বসেছে। কিন্তু ওদের মতো করে সে মুখ দিয়ে কচকচ আওয়াজ তুলে খাবার খাবার ভঙ্গি প্রকাশ করতে না পেরে অবাক অবাক চোখ করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। আম বাগানের পিছনে বিস্তৃত ফসলের মাঠ। সেদিকের আল পথ ধরে আব্বাস হেঁটে আম বাগানের দিকেই আসছে। ঘৃনায় মুখে থুঁ থুঁ চলে এলো শায়লার। সে অন্য দিকে মুখটা ঘুরিয়ে নিলো। কিন্তু, কিছু সময় পর দেখলো আব্বাস নিজেই এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
শায়লা চুপচাপ বসে আছে আগেরই মতো। আব্বাস কিছু সময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে বললো, বুবুজান আপনের লগে আমার কথা আছে।
কি কথা বলে ফেলো।
অপুর যা হওনের তা তো হইয়াই গেছে। আপনে বরং এই বিসয়ডা নিয়া আর বাড়াবাড়ি কইরেননা।
বাড়াবাড়ি আমি কখনোই করি না।সন্তান হারালো মা বাবার কতটা কষ্ট হয় সেটা কি তোমার জানা আছে?
না, আমি জানমু কেমনে। আমি তো এহন তরি বিয়াই করবার পারলাম না।
তোমার পাপের শাস্তি তুমি পাবে।
বুজান, কেউ কিন্তু বিনাদোষে ও সাজা পায়।
কি বলতে চাইছো তুমি?
কইতে চাই, আপনের ও একটা পুলা আছে। হেয় কিন্তু সাঁতড় জানে না। আর পুকুরডাও আপনেগো বাড়ি থিক্কা বেশি দূর না।
শায়লার মোটেই বুঝতে কষ্ট হলো না। হুমকি দিতে এসেছিলো সে। কিন্তু ওর হুমকির ভয়ে আমি থেমে যাবো তা কি করে হয়। অপরাধীর কাছে আমি কোনদিনও পরাজিত হবো না।
শায়লা মুখে আর কিছু না বলে , শুধু বললো তোমার কথা শেষ হলে যেতে পারো ।
হ আমি যাইতাছি। তয় বাড়াবাড়ির পরিনতি ভালা হইবো না।রাঙা চোখে কথা গুলো বলে চলে গেলো আব্বাস।
শায়লা সৌখিনকে ডেকে সাথে করে নিয়ে গেলো। হাত মুখ ধুইয়ে নাস্তা খেতে দিয়ে বললো, বাবা তোমাকে যদি কোন অপরিচিত কেউ ডাকে ককনোই তার কাছে যাবে না। বরং ডাকলে সাথে সাথে আমার কাছে চলে আসবে।আমাকে জানাবে।
সুবোধ বালকের মতোই মাথা নাড়ালো সৌখিন পাল্টা কোন প্রশ্ন করলো না।

পরের দিন বিকাল ..
খাবার শেষ করে ছেলেকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে শায়লা। একটা গল্পের বইয়ের কিছু অংশ ছেলেকে পড়ে পড়ে শোনাচ্ছে সে। আর সে গল্প শুনে বিছানায় হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে সৌখিন। ঠিক তখনি রিতা এসে ডাকলো সৌখিন..
রীতিমতো হাঁপাচ্ছে রিতা। একটু দম নিয়ে আবার বলতে লাগলো দেহ আমি তোমার জন্য কি আনছ্।ি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে রিতার হাতে ছোট ছোট দুটি পাখির ছানা।বিছানা ছেড়ে দৌঁড়ে বাইরে চলে এলো সে।
এটা কি পাখি রিতাবু?বু ডাকতে সৌখিনকে রিতা শিখিয়েছে। সৌখিনের মুখে বু ডাকটা অনেক মিষ্টি শোনায়।
এটা টুনটুনি পাখির বাচ্চা। আমাদের রান্না ঘরের পিছনে ছোট্ট লেচুগাছে বাসা বানিয়ে ছিলো ওরা। কি সুন্দর তাই না!
হুমমম .অনেক সুন্দর লাগছে । দেখো ওরা গলা উঁচু করে ঠোঁট হাঁ করে আছে।
হুমম খাবার খেতে চাইছে বোধহয়।
রিতাবু, ওদের চোখ কই?
চোখ ফুটে নাই ভাই।চোখ ফুটতে আরো কয়দিন সময় লাগবো।
ও.. আচ্ছা।ওদের খাবার খেতে দিবে না রিতাবু।
কি খাবার দিই বলো তো।
দাঁড়াও মা মনিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসি। মামনি নিশ্চই জানেন ওদের কে কি খেতে দিতে হয়।
মায়ের কাছে এসে দেখে মা ঘুমাচ্ছে। তাই আর মায়ের কাচা ঘুমটা তার ভাঙাতে ইচ্ছে হলো না ওর। ফিরে গিয়ে বললো চলো রিতাবু আমরা ওদেরকে ভাত খাওয়াই।
ধুর বোকা। ওরা তো ছোট। ওরা তো ভাত খেতে পারবেনা
নারে ভাই। ওদের মা বাবাই ভালো জানে ওরা কি খায়।
তাহলে তুমি ওদের বাবা মায়ের কাছ থেকে এনেছো কেন?ওরা এখন কি খাবে?
আমি তো তোমার জন্য ওদেরকে আনলাম ভাই। তুমি ওদের কে দেখে খুশি হবে সে জন্য।
আমি খুশি হয়েছি রিতাবু। তুমি যাও এবার ওদেরকে ফেরত দিয়া আসো ওর মায়ের কাছে।
তুমি বলছো ভাই! তাতে কি তুমি খুশি হবে?
হ্যাঁ ,তাতে আমি খুশি হবো।ওরা মায়ের যতেœ থাকুক।
ঠিক আছে তুমি তাহলে এখানে বসে থাকো আমি ওদের কে রেখে এখনই আসছি।
আচ্ছা যাও তুমি।
হুমম.. আমি যাবো আর আসবো।
ছানা দুটিকে বুকের কাছে জাপটে ধরে দৌঁড় হাঁটা করে হাঁটতে লাগলো রিতা।
সারা বাড়ি শুনশান। সবাই ঘুমাচ্ছে। পাখির কিচির মিচির ছাড়া আর কোন শব্দ নেই আশেপাশে।
হঠাত ভূতের মতো করে উদয় হলো আব্বাস। তার চোখে মুখে দুষ্ট হাসি।
সৌখিনের কাছে এসে সে বললো,অপু ঐ পুকুর ধারে তোমার লিগা দাঁড়ায় রইছে।
সে তোমারে দেহনের লিগা পাগল হইয়া আছে। তাড়াতাড়ি আসো। সৌখিনের বোঝতে সুবিধা হবার জন্য আব্বাস যথা সম্ভভব শুদ্ধ করে কথা বলার চেষ্টা করছে।
আব্বাসে কথা শুনে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো সে। কি বলছো ,অপু ভাই নানু বাড়ি থেকে এসেছে! আচ্ছা তুমি দাঁড়াও। আমি মামনি কে বলে আসছি। বসা থেকে উঠে ঘরের দিকে মোড় নিতে যায় সৌখিন। আর অমনি আব্বাস ওর ডান হাতটি শক্ত করে ধরে কানের কাছে মুখ এনে বলে, তোমার মা চায়না অপুর সাথে তোমার দেখা হোক। তাইতো তোমাকে মিথ্যা কথা বলে ওর সাথে দেখা করতে দিচ্ছেনা।বেশি দেরি করো না অপু চলে যাবে তাহলে।
আচ্ছা ঠিক আছে চলো তবে অপু ভাইয়ার সাথে দেখা করে এসে তবে মামনিকে বলবো।
সেই ভালো, সেই ভালো। চলো..
সৌখিনের হাত ধরে খুব দ্রুত পায়ে সে পুকুর ধারে চলে এলো।আশেপাশে ভালো করে তাকিয়ে বললো , কই অপু ভাইয়াকে তো কোথাও দেখছিনা।
আমার সাথে আসো দেখতে পাবে। এই বলে সে অপুকে পুকুরের একদম কিনাড়ায় নিয়ে গেলো।
সৌখিন আবার অপুকে খুঁজতে লাগলো এদি ওদিক চেয়ে।
ঠিক সেই অন্যমনস্কতার সুযোগ কাজে লাগালো আব্বাস। ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দিলো সৌখিন কে।
জলের ভেতর হাবুডুব খেতে লাগলো সৌখিন। আর লম্বা পা ফেলে আব্বাস চলে গেলো নিজের বাড়ির দিকে।
টুনটুনির ছানা রেখে বাড়ির উঠান র্পযন্ত আসতেই পিছন থেকে রিতার মা ডাকলো। ওই রিতা বাবুরে একটু ধর তো।খুব কান্না করতাছে। দেখ তো তুই কোলে নিয়া একটু হাঁটাহাঁটি করলে কান্না থামেনি।
মাকে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যায় রিতা। পাছে মা রেগে যায় সেই ভয়ে। বাধ্য মেয়ের মতো মায়ের কোল থেকে বোনকে কোলে নিয়ে পাশের মাঠে শালিকপাখি দেখাতে লাগলো আর নানান কথা বলতে লাগলো। ছোট্ট মেয়েটো বোনের কথায় ডুবে কান্না ভুলে হাসতে লাগলো খলখলিয়ে।
মাইকে আসরের আযান ভেসে আসতেই ঘুম থকে জেগে উঠলেন অপুর নানু। মেয়েকে একা ঘুমাতে দেখে ডাকলেন, ঐ শায়লা নানুভাই কই?
মা ও তো রিতার সাথে দোরের সামনে বসে খেলছে।
কই খেলছে। দোরে কেনো উঠানেও তো সৌখিন নাই রিতা ও নাই।
কি বলো কি তুমি মা! ভয়ে মুখটা শুকিয়ে গেলো শায়লার। এক দৌঁড়ে উঠানে বেড়িয়ে গেলো সে।বাড়ির চারপাশে খুঁজে পাওয়া গেলোনা সৌখিন কে। রিতাদের বাড়িতে গেলো না তো আবার !! বলে সে এক দৌঁড় দিলো ঐ বাড়ির দিকে।
বাড়ির সামনে যেতেই রিতার সাথে দেখা হয়ে গেলো কোলে তার ছোট্ট বোন।
কিরে রিতা সৌখিন কই?
ভাইরে তো আমি দোরের পাশে বসিয়ে রেখে টুনটুনির বাচ্চা দুটো কে তার বাসায় রাখতে এসেছিলাম। ছোট বোন কাঁদছিলো আর তাই মা ওরে কোলে নিতে বললো।
আর এক মর্হূত দেরি না করেভোঁ দৌঁড় দিলো পুকুর ঘাটের দিকে। হতভম্ব হয়ে তার চলে যাওয়া পথের দিতে চেয়ে রইলো রিতা।
ততক্ষণে বেশ কয়েক জনের জটলা জমেছে পুকুর ঘাটে। মাঝ পুকুরে একটা বাচ্চার উঁপুর হওয়া লাশ ভাসছে।
ভয়ে কেউ জলে নামতে চাইছে না।এ জলে খুব খারাপ কিছু আছে।নইলে এভাবে কারো মৃত্যু হতে পারেনা। এ লাশ অপুর নয় তো আবার!! নানান কথা ফিসফাঁস করে উড়ছে চারপাশে।
পুকুরের কিনাড়ায় পৌঁছে শঅয়লা এক মর্হূতও দেরি করলো না।এক ঝাঁপ দিয়ে জলে নেমে গেলো। সাঁতড়ে পৌঁছে গেলো উপুর হয়ে থাকা ছোট্ট দেহটির কাছে । আপন ছেলের মৃত দেহ জল থেকে টেনে তুলতে তুলতে ওর শুধু কানে বাজছিলো আব্বাসে কথাগুলো , পুকুর কিন্তু আপনার বাড়ি থেকে বেশি দূরে না। আপনের পুলা কিন্তু সাঁতাড় জানেনা।
পাড়ের সকলে চিতকার চেচাঁমেচিতে আরো লোকজন জড়ো হলো সেখানে । সৌখিনের লাশ কোলে নিয়ে কেউ একজন ছুটলো হাসপাতালে।সর্বস্ব খুঁইয়ে পথিক যেমন বেসামাল হয়ে পথে ছুটে শায়লাও তেমনি এলোমেলো পায় ভেজা গায়ে ছুটতে লাগলেঅ লোকটির পিছু পিছু ু। না সৌখিন আর নেই এই ধরা ধামে। অনেক আগে সে ওপাড়ের বাসিন্দা হয়ে গেছে।
বাড়ি র্ভতি থই থই মানুষ। আঙিনায় একপাশে শুইয়ে রাখা হয়েছে সৌখিন কে।তারপাশে বিভ্রান্তের মতো হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে শায়লা।তার চোখে জল নেই। মুখে কোন আহাজারি নেই। পাথরের মূর্তির মতো সে চেয়ে আছে অপলক নিথর ছেলের মুখপানে।
সকলের একই কথা পুকুর পাড়ে শয়তান আছে অপুর মতো সৌখিনকেও সে রক্ত চুষে খেয়ে নিয়ে জলে ফেলে দিয়েছে। সে জন্যই তো ওদের দুজনের সারা মুখ ওমন সাদা হয়ে গেছে। এক ফোটা রক্তে লেশ মাত্র নেই চেহারায়। আহা কি পুরা কপাল। মাত্র কয়দিনের ব্যবধানে একই বাড়িতে দুই দুই জন বাচ্চার মৃত্যু। মেনে নিতেও কষ্ট হয় মাবূদ.. সবই তোমার লীলাখেলা। এমন কে র্দীঘশ্বাসের সাথে বিলাপ করছেন অনেকে।
সন্ধ্যা নামতে না নামতেই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাজির হলো সৌখিনে বাবা,চাচা,ফুপু ও দাদী । পুরো বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে।চেনা অচেনা সকলের চোখে জল। কেবল কান্না নেই শায়লার চোখে। সে সেই আগের মতোই স্থবির। কোন অশ্রু নেই শোকের কোন লেশ নেই চেহারায়। কেবল পাথরের মতো মুখ করে বসে আছে সে তখনো। আর দেরি না করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো সৌখিনের লাশ। দাদু বাড়ির পারিবারি কবরস্থানে মাটি হবে তার এটাই স্থির করেছে তার বাবা। ছেলের শিয়রের হাত দিয়ে বসে আছে শায়লা। অন্ধকারের বুক ভেদ করে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। হঠাত শায়লা কথা বলে উঠলো। সৌখিনের বাবা বাড়ি যাবার আগে আমাকে একবার থানায় যেতে হবে। আগের রাতে স্ত্রীর মুখে সবটা শুনে তিনি স্ত্রী কে আশ্বস্ত করেছিলেন। আমি তোমাদের বাড়ি আসি তারপর থানায় যাবো। ও ব্যাটাকে তার প্রাপ্য পাওনা না দেওয়া র্পযন্ত আমিও শান্তি পাবো না। তিনি এখন সহজেই বুঝতে পারলেন নিজের ছেলের এমন মৃত্যুর আসল কারণ কি হতে পারে। কোন কথা না বলে চুপ রইলেন তিনি। শায়লা আবারো বললো থানার রাস্তায় যেতে আর ১০ মিনিট লাগবে। আমার ছেলের মাটি হবার আগে আমি তার ঘাতককে হাজতে দেখতে চাই। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো শায়লা। গগনবিদারী র্আতনাদ যেন পাহারের বুক ছাপিয়ে অঝোওে ঝরণঅ বইতে শুরু করলেঅ হঠাত করে। ছেলে হারানো মায়ের র্আতনাদে ভেঙে চুরে চুরমার হয়ে যাচ্ছে সবার হৃদয় । শায়লার মা মেয়েকে বুকে জাপটে ধরে রইলেন কোন শ্বান্তনা দিলেন না। শোকাতুর মায়ের কাছে এখন পৃথিবীর সকল শ্বান্তনা খড়ের মতো ভেসে যাবে কান্নার স্রোতে।
থানার সামনে গাড়ি থামলো। শায়লা ভিতরে গিয়ে পুলিশ অফিসারকে ডাবল হত্যা মামলা করতে বললেন। এবং পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা করলেন। ফোনের মেমরি র্কাড থেকে আব্বাসের ভয়েস রের্কড শুনালেন পুলিশ অফিসারের ফোনে মেমোরি শিফট করে।হুমকি দেয়ার কথাও জানালেন তিনি।
অফিসার আর এক মর্হুতও দেরি করলেন না র্ফোস নিয়ে তখনই ছুটলেন আব্বাসের ঠিকানা অনুযায়ী। ছেলের লাশ কোলে নিয়ে শায়লা ছুটলেন গ্রামের বাড়িতে। সেই যে জন্মে পর হাসপাতাল থেকে তাকে যেভাবে বুকের সাথে জড়িযে বাড়ি ফিরেছিলো আর আজ সেই ভাবে তাকে কোলে নিয়ে শেষ বিদায়ের বরণ ডালায় সাজিয়ে তার অনন্ত জীবনের বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছে।
আকাশে এক ফালি চাঁদ হাসছিলো তখন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তারারা। ওদের ভেতর উতসবের আমেজ। নতুন একটি তারা আজ তাদেও দলভুক্ত হয়েছে।
সারি সারি গাছের অন্ধকার ঠেলে কখনো কখনো গাড়ির গ্লাস গলে রুপালী জোছনা উছলে পড়েছ সৌখিনের সোনামুখে। মায়ের চোখ অপলক দেখে যাচ্ছে চিরতরে দেখার অধিকার হারানো সন্তানের মায়ামাখা মুখ।

 

Facebook Comments