নিউজটি পড়া হয়েছে 10

অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা চালালে তার বিচার করা হবে : প্রধানমন্ত্রী

সিলনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম ::: উচ্চ আদালতে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করার তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, কেউ অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা চালালে তার বিচার করা হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আর কাউকে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করতে দেয়া হবে না। যদি কেউ সে অপচেষ্টা চালায় তাকে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করায় জনতার আদালতে তার বিচার চেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, কেন বাংলাদেশকে পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করা হবে? তিনি বলেন, ‘আমাকে এ ধরনের হুমকি দিয়ে কোন লাভ হবে না। তিনি বলেন, আমি বলব সবকিছুই সহ্য করা যেতে পারে কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।

প্রধানমন্ত্রী সোমবার বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শহীদদের স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভায় ভাষণে একথা বলেন।

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে এ বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এ হামলার লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে নির্মূল করা। এ হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত এবং ৫শ’ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে অনেকে চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে। অল্পের জন্য শেখ হাসিনা সেদিন বেঁচে গেলেও সমাবেশ স্থলে ট্রাকের কাছে গ্রেনেড বিস্ফোরণে তাঁর কানের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের সামনে অস্থায়ী স্মৃতিতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করে ২১ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের সিনিয়র নেতা এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় হতাহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ১৫ আগস্টের অন্যান্য শহীদ, চার জাতীয় নেতা এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।সমাবেশে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমন্ডলির সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি আলহাজ নজিবুল বাশার মাইজভান্ডারী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, জেএসডি’র কার্যকরী সভাপতি মইনুদ্দিন খান বাদল, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দীলিপ বড়ুয়া, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ মবাহাউদ্দিন নাছিম এবং বিশিষ্ট লেখক ইমদাদুলহক মিলনও বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি উচ্চ আদালত থেকে নানা ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক কথাবার্তা এবং হুমকি ধমকি। আমার মাঝে মাঝে অবাক লাগে যাদের আমরা নিজেরাই নিয়োগ দিয়েছি, রাষ্ট্রপতিই নিয়োগ দিয়েছেন এবং নিয়োগ পাওয়ার পরে হঠাৎ তাদের বক্তব্য শুনে এবং সংসদ সম্পর্কে যে সমস্ত কথা বলা হচ্ছে, সংসদ সদস্য যারা তাদেরকে ‘ক্রিমিনাল’ বলা হচ্ছে। সেখানে ব্যবসায়ী আছে সেটাও বলা হচ্ছে। কেন ব্যবসা করাটা কি অপরাধ, প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন ব্যবসায়ী মামলা করলে কি উচ্চ আদালত তাদের পক্ষে রায় দেয় না। রায়তো দেয়, বিচার তো তারাও পায়। এভাবে সংসদকে হেয় করা এবং সংসদকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করা, এটা অর্থটা কি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অনেক সংগ্রাম করে, অনেক রক্ত দিয়ে এদেশে গণতান্ত্রিত ধারা নিয়ে এসেছি। যেখানে ’৭৫ এর পর ১৯টা ক্যু হয়েছে বাংলাদেশে। সামরিক বাহিনীর হাজার হাজার অফিসার-সৈনিকদের হত্যা করা হয়েছে। আমাদের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। দিনের পর দিন খুন করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত যেখানে একটা হত্যাকান্ড লেগেই থাকতো। আমরা সেই অবস্থা থেকে একটা সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে এসেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রধান বিচারপতির রায়ে সংসদ সম্পর্কে বক্তব্য সংসদ সদস্য সম্পর্কে বক্তব্য এমনকি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও নিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা, এটা কোন ধরনের কথা। আমাদের সংবিধান আছে। যে সংবিধান ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি। সংবিধানের কোন কোন অনুচ্ছেদ যেটা মূল সংবিধানে ছিল- সেটাও ওনার পছন্দ নয়। পছন্দ হচ্ছে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা ঐ জিয়াউর রহমানের অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল।

তিনি বলেন, হাইকোর্টেরই যেখানে রায় রয়েছে যে জিয়ার ক্ষমতা অবৈধ, সেই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল’ অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে যে সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করে দিয়ে গেছেন জিয়াউর রহমান সেটাই ওনার (প্রধান বিচারপতি) পছন্দ। কিন্তুু গণপরিষদ যে সংবিধানের ধারা করে দিয়েছেন সেই ধারা ওনার পছন্দ নয়। সেখানে উনি চাচ্ছেন মার্শাল ল’র সময় যেটা করে গেছে সেটা।

এ প্রসঙ্গে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার তদন্তের দায়িত্বে নিয়োজিত বিচারপতি জয়নাল আবেদীনের প্রসংগ উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, জয়নাল আবেদীন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার যে তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছেন- সম্পূর্ণ ভূয়া মিথ্যা তথ্য দিয়ে, মনগড়া তথ্য দিয়ে, বলতে গেলে বিএনপি সরকারের ফরমায়েসী তদন্ত রিপোর্ট তিনি দিয়ে গেছেন। তিনি যে দুর্নীতি করেছিলেন সেই দুর্নীতির তদন্ত দুদক যখন করতে গেছে- দুদকের পক্ষ থেকে কিছু তথ্য চাওয়া হয় আর সেখানে প্রধান বিচারপতি চিঠি দিয়ে দিলেন এই জয়নাল আবেদীনের দুর্নীতির তদন্ত করা যাবে না।

শেখ হাসিনা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করবে, তারপরে যদি সে তদন্তে দোষী হতো, তাহলে তো আদালতেই বিচার চাইতে যেত, আদালতে বিচার চাইলে না হয় উনি (প্রধান বিচারপতি) কিছু বলতে পারতেন। কিন্তু তদন্তই করা যাবে না- এইকথাটা প্রধান বিচারপতি হয়ে তিনি কিভাবে বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার মানে একজন দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয় দেওয়া, দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করা এটাতো প্রধান বিচারপতির কাজ নয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটাতো সম্পূর্ণ সংবিধানকে লঙ্ঘণ করা, অবহেলা করা। আমার এখানে প্রশ্ন তিনি (প্রধান বিচারপতি) এ চিঠি লিখতে গেলেন কিভাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি’র আমলে এমন এমন জজ নিয়োগ দেয়া হয়েছিল- কারো দেখা গেল সার্টিফিকেট জাল। কেউ কোন এক কূটনৈতিক মিশনের দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে তুচ্ছ ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে বচসায় লিপ্ত হলেন, তাকেও বিএনপি আমলে জজ করা হয়েছে। ঠিক এভাবে আরো বহু ঘটনা আছে। এমনকি ছাত্রদলের দুইনেতার কাঁধে ভর দিয়ে রায় পড়ে শোনাচ্ছে-এরকম জজও নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, কোর্টের যে ‘স্যাংটিটি’ সেই ‘স্যাংটিটি’ ধ্বংস করা হয়েছে। তাদের সবাইকে রক্ষার জন্যই কি সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল উনি (প্রধান বিচারপতি) চাচ্ছেন। সংসদে একটা আইন করতে গেলে যেভাবে পর্যালোচনা ও যাচাই বাছাই শেষে আইন পাস করা হয়, জজেরা কলমের এক খোঁচায় সেটিকে বাদ করে দেন বলেও বিচারপতিদের সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফাস্ট রিডিং, সেকেন্ড রিডিং তারপর থার্ড রিডিং এবং বিরোধী দলের আপত্তি আমলে নিয়ে যে আইন করা হয় তা বাতিল হয়ে গেল। তিনি বলেন, ‘তার মানে এতগুলো সংসদ সদস্য, এতগুলো অফিসার-সবাই মিলে যেটা নিয়ে কাজ করলো, তাদের যেন কোন জ্ঞান-বুদ্ধি নাই। কেবল তাদেরই (বিচারকদের) জ্ঞান-বুদ্ধি এখানে প্রযুক্ত হলো। সরকার প্রধান বলেন, ‘যে সংশোধনী নিয়ে এত আলোচনা সেই ষোড়শ সংশোধনী ‘সিক্সটিনথ অ্যামেন্ডমেন্ট’ সেখানেওতো আপিল বিভাগের প্রত্যেকটা জজ সাহেব তারা সেখানে তাদের স্বাধীনভাবে মতামত কতটুকু দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন আমি জানি না। সেই সুযোগটাও হয়তো প্রধান বিচারপতি তাদেরকে দেন নাই। যেটা রায়টা পড়লে অনেক কিছু বোঝা যায়। কারণ রায়টা আমরা পড়ছি এবং আরো কিছু বাকী আছে পড়বো এবং তারপরে এনিয়ে সংসদে অবশ্যই আমরা এটার আলোচনা করবো। ভাষার ব্যবহারে ক্রটিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করে জনৈক আন্তর্জাতিক খাতি সম্পন্ন আইনজীবীর এটর্নী জেনারেলের বিরুদ্ধে বিষোধগার করারও তীব্র সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি ড. কামাল হোসেনের নাম উল্লেখ করেই এটর্নী জেনারেলকে অভদ্র ভাষায় গালমন্দের সমালোচনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে বক্তব্য তিনি দিলেন (ড. কামাল হোসেন) আজকে কোর্টেও অবস্থাটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তারা।

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী সরকারের পুলিশ বাহিনীর সহায়তায় কিভাবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, মামলার আলামত নষ্ট এবং তাদের অপারেশন শেষে পালিয়ে যেতে দেয়া হয় যে জন্য সাধারণ জনতার ওপর পুলিশের টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং লাঠি চার্জের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।হাওয়া ভবনের অধিপতি তারেক রহমান এবং জোট সরকারের দুই মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু এবং লুৎফুজ্জামান বাবর কিভাবে জঙ্গিদের দিয়ে ২১ আগস্টের হামলা পরিচালনা করেন এবং ধামাচাপা দিতে জজ মিয়া নাটকের অবতারণা করেন তাঁর বর্ণনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

আইভি রহমানকে দেখতে যাওয়া নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নাটক করা এবং খালেদা জিয়ার সিএমএইচ এ আগমন উপলক্ষে আইভি রহমানের ছেলে-মেয়েদের কয়েকঘন্টা হাসপাতালে আটকে রাখারও বর্ণনা দেন প্রধানমন্ত্রী। বাসস

ফেসবুক মন্তব্য
Share Button